সাংবাদিকতা : হুমকির মুখে মানমর্যাদা-পেশাদারি

সোমবার, ১৮/০২/২০১৩ @ ৩:৪৪ অপরাহ্ণ

কাজী আলিম-উজ-জামান:
yellow jounnalismরাজধানীর বিজয়নগরে মোটরের খুচরা যন্ত্রাংশের একটি দোকানে গিয়েছিলাম, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। পেশাগত পরিচয় ও দু-একটি কথাবার্তার পর দোকানি ভদ্রলোক আমার কাছে একটি আবদার করে বসলেন, ‘ভাই, আমাকে একটি কার্ড করে দেওয়া যায়?’
ভদ্রলোকের এ কথায় খুব একটা অবাক হইনি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পরিচিত, অল্প পরিচিতের মধ্যে অনেকেই কার্ড চেয়েছেন।
মোটর যন্ত্রাংশের দোকানের ওই ভদ্রলোককে বললাম, ‘ভাই, আপনি একজন ব্যবসায়ী। সাংবাদিকতার কার্ড দিয়ে আপনি কী করবেন?’ আপনি তো সাংবাদিকতা, রিপোর্টিং বা লেখালেখি করবেন না। তিনি বললেন, ‘থাকলে একটু সুবিধা হয়। কেউ ডিস্টার্ব করে না।’ কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা পরিষ্কার বোঝা গিয়েছিল, সাংবাদিকতার কার্ড বা পরিচয়পত্র জোগাড় করতে তিনি মরিয়া।
এভাবেই সারা দেশে বাড়ছে ‘সাংবাদিক’-এর সংখ্যা। ঢাকা শহরে সাংবাদিক কতজন, কত হাজার তার কোনো হিসাব বোধ করি কারও কাছে নেই। সারা দেশে সাংবাদিক কত হাজার, তারও হিসাব নেই। অসংখ্য সাংবাদিক আছেন, যাঁদের কোনো কাজ নেই। তাঁরা এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান, বসে থাকেন। তাঁদের ‘বেকার’ বলব না, কিন্তু কাজ করার আগ্রহ তাঁদের মধ্যে খুব কম। সাংবাদিকতার কার্ডটিই তাঁদের একমাত্র সম্বল। এই কার্ড ব্যবহার করেই তাঁরা খেয়ে-পরে বেঁচে আছেন। সব অনুষ্ঠানে তাঁদের অনাবশ্যক উপস্থিতি আয়োজকদের পীড়িত করে। সার্বিকভাবে এতে ক্ষুণ্ন হয় সাংবাদিকতা পেশার মানমর্যাদা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পেশাদারি।

২.
আমাদের দেশে সাংবাদিকতায় ঢোকা কঠিন নয়। ইচ্ছে হলেই সাংবাদিক হওয়া যায়। সাংবাদিকতার কার্ড পাওয়া যায়। বলা ভালো, কার্ড কিনতে পাওয়া যায়। কারণ, খবরের কাগজের তো আর অভাব নেই। নামসর্বস্ব দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাষিক—কত শত ছাপা পত্রিকা। কয়েক শ অনলাইন পত্রিকা। এতগুলো রেডিও-টিভি চ্যানেল। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কোনো প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন নেই। লেখালেখির অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন নেই। দুনিয়ার সব গুরুত্বপূর্ণ পেশাতেই আগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাগে। আর সাংবাদিকতায় অনেকেই আগে ‘সাংবাদিক’ হন, তারপর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এর কারণ হচ্ছে, কে সাংবাদিক হতে পারবেন, আর কে পারবেন না, সে বিষয়ে নীতিমালা নেই।
সাংবাদিকতা একটি মহান, শ্রেষ্ঠ পেশা। বাংলাদেশের মতো একটি নড়বড়ে গণতন্ত্রের দেশে সাংবাদিকতা তথা গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এ দেশের আমলাতন্ত্র দুর্নীতিপরায়ণ। রাজনীতিবিদেরা গড়পড়তায় অসাধু-ঠকবাজ। কিন্তু জনগণের বড় অংশটির মধ্যে সততার ঘাটতি নেই। তার পরও স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়েও এই দেশটি আর্থসামাজিকভাবে ততটা এগোতে পারেনি, যতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল। জনগণের ক্ষমতায়নে সাংবাদিকদের ভূমিকা রয়েছে। দেশের বড় বড় দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, অপরাধ ঢেকে রাখার অপচেষ্টা সাংবাদিকেরাই ফাঁস করেছেন। সাংবাদিকদের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে। কিন্তু দক্ষতার অভাবে, পেশাদারির সংকটে সেই প্রত্যাশা অনেকাংশেই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
এই তথাকথিত কার্ডসর্বস্ব সাংবাদিকেরা, আমজনতার কাছে যাঁরা ‘বটতলার সাংবাদিক’, ‘হাতুড়ে সাংবাদিক’, ‘সাংঘাতিক’সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত, সুমহান সাংবাদিকতা পেশার ওপর কালিমা লেপন করছেন। সৎ-সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতা পেশার ওপর একটা বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই বিষফোড়াটা অবিলম্বে অপসারণ করা দরকার।
৩.
আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, সাংবাদিকতা পেশাটাকে এত সহজভাবে না দেখা। প্রত্যেক সাংবাদিকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। অন্তত নতুন যাঁরা এই পেশায় আসতে চান, তাঁদের এটা থাকতেই হবে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ার ব্যবস্থা আছে। গত এক-দেড় দশকে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়া যাচ্ছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ম্যাস কমিউনিকেশন বা নিমকো, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ বা পিআইবিতে সাংবাদিকতার ওপর ডিপ্লোমাসহ বিভিন্ন কোর্স চালু আছে। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকতার ওপর বুনিয়াদি কোর্স করাচ্ছে। এসব কোর্সের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার ওপর একটা মৌলিক ধারণা এবং পেশাগত দায়িত্ববোধের চেতনা তো কিছুটা হলেও তৈরি হয়। একেবারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার চেয়ে মোটের ওপর কিছুটা থাকা তো ভালো। যাঁরা অন্য বিষয়ে বিস্তর লেখাপড়া করেছেন, কিন্তু সাংবাদিকতা পেশায় আসতে চান, তাঁদেরও যেকোনো একটি কোর্স করে এলে মন্দ কী?
আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, তা হলো, সনদ ছাড়া কেউ সাংবাদিকতা পেশায় আসতে পারবেন না। সাংবাদিকতায় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, কি সরকারি, কি বেসরকারি, এমনকি প্রচারসংখ্যায় পিছিয়ে থাকা খবরের কাগজও সনদ ছাড়া নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেবে না। এতে যে সুবিধাটা হবে, তা হলো, হুটহাট কেউ এই পেশায় প্রবেশ করতে পারবেন না। সাংবাদিকতায় শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত লোকদের আসার সুযোগ তৈরি হবে।
সাংবাদিকতার মান বজায় রাখা বা উন্নতি করার জন্য আরেকটি কাজ করা যায়, তা হলো, বর্তমানে যাঁরা কর্মরত আছেন, যাঁদের সাংবাদিকতায় কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সনদ নেই, তাঁদের পর্যায়ক্রমে কোর্স করানো। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পিআইবি যদি নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসে, তা হলে সবচেয়ে ভালো হয়।
আরেকটা প্রস্তাব আছে, তা হলো, সনদধারী ও কর্মরত প্রত্যেক সাংবাদিকের নাম-পরিচয় পিআইডির (প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট) তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা। বর্তমানে পিআইডির কাছে কিছু সাংবাদিকের নাম, পদবি ও মুঠোফোন নম্বর সংরক্ষিত আছে। এই গাইড বছরে একবার প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এই গাইডের বাইরে রয়েছেন আরও হাজারো সাংবাদিক।
কোর্স শেষ করার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণদের নামের তালিকা পিআইডিতে পাঠাবে। পিআইডি কর্তৃপক্ষ সেই তালিকা ডিজিটালি সংরক্ষণ করবে। প্রত্যেকের একটা পরিচিতি নম্বর থাকবে। এই নাম ও পরিচিতি নম্বর পিআইডির ওয়েবসাইটে দেওয়া থাকবে। এতে যে সুবিধাটা হবে, তা হলো, সনদ নেই এমন কারও নাম নতুন করে এই তথ্যভান্ডারে যুক্ত হবে না।

৪.
মতিঝিল হয়ে মুগদাপাড়ায় যাব। রিকশায় ভাগাভাগি করে গেলে ১০ টাকা। সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলো। তিনি পেশায় সাংবাদিক, ক্রাইম রিপোর্টার। ‘আমার কাজ হলো সারা ঢাকা শহর ঘুইরা ঘুইরা রিপোর্ট করা।’ বললেন তিনি। বলার সময় চাবিটা আঙুলে পেঁচিয়ে হাত ঘুরিয়ে তাঁর কাজের ব্যাপ্তিটা দেখালেন। তাঁর সঙ্গে আমার আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে। কিন্তু তিনি যে পত্রিকার নাম বলেছেন, সেই পত্রিকার চেহারাও কোনো দিন দেখিনি। পড়া হয়নি তাঁর কোনো প্রতিবেদনও। তাঁকে ভুয়া সাংবাদিক বলব না, কিন্তু প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে পেশাগত উন্নতির কোনো চেষ্টা তাঁর মধ্যে নেই, এটা স্পষ্ট।
দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তিশালী গণমাধ্যম খুব প্রয়োজনীয়। আর শক্তিশালী গণমাধ্যমের জন্য দরকার প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী। শিক্ষিত, সচেতন সাংবাদিকেরা পারবেন গুণমান আর পেশাদারি বজায় রাখতে, এই মুহূর্তে যেটার ঘাটতি খুব বেশি।
 কাজী আলিম-উজ-জামান: সাংবাদিক।
[email protected]

সর্বশেষ