ওরিয়ানা ফালাচি ও বঙ্গবন্ধু (বাকী অংশ)

শনিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৩

:: কাজী আবুল মনসুর ::

আগের পর্বের শেষে যেখানে এসে থেমেছিল, সেখান থেকে শুরু. . .

ওরিয়ানা ফালাচি

বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন আলোচিত, সমালোচিত, নিন্দিত কিংবা নন্দিত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি ।

“তা তো বটেই। আমরা পরস্পরকে ভালোভাবে জানি। খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল। কিন্ত তা হয়েছিল আমার জানার আগে যে, পাকিস্তানীরা আমার জনগনের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নিপীড়ন করেছে। আমি জানতাম না যে তারা সন্তানের সামনে পিতাকে, পিতার সামনে পুত্রকে, দাদার সামনে নাতিকে হত্যা করেছে ইত্যাদি।

আমি তাকে থামিয়ে বললাম, আমি জানি, মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি জানি। তিনি গর্জে উঠলেন, তুমি কিছুই জানো না, চাচার সামনে চাচীকে, শালার সামনে ভাইকে হত্যা করেছে। আমি তখন জানতাম না যে, তারা আমার স্থপিত, আইনবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, কিজ্ঞানী, চিকিৎসক, আমার চাকরকে হত্যা করেছে এবং আমার বাড়ী, জমি, সম্পত্তি ধংস করেছে, আমার..

তিনি যখন তার সম্পত্তির অংশে পৌছলেন, তার মধ্যে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যা থেকে তাকে এই প্রশ্নটা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম যে, তিনি সত্যিই সমাজতন্ত্রী কি না? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ…। তার কন্ঠে দ্বিধা। তাকে আবার বললাম যে, সমাজতন্ত্র বলতে তিনি কি বুঝেন? তিনি উত্তর দিলেন ‘সমাজতন্ত্র”। তাতে আমার মনে হলো সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার যথার্থ ধারণা নেই। এরপরই অবতারনা হলো নাটকের।

১৮ ডিসেম্বর হত্যযজ্ঞ সর্ম্পকে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি রেগে ফেটে পড়লেন। নীচের অংশটুকু টেপ থেকে নেয়াঃ

“ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার?
‘ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ম্যাসাকার হয়নি। তুমি মিথ্যা বলছো’।
মি.প্রাইম মিনিস্টার, আমি মিথ্যাবাদি নই। সেখানে আরো সাংবাদিক ও পনের হাজার লোকের সাথে আমি হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেছি। আপনি চাইলে আমি আপনাকে তার ছবিও দেখাবো। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।’
মিথ্যাবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়’।

মি.প্রাইম মিনিস্টার, দয়া করে ‘মিথ্যাবাদি’ শব্দটি আর উচ্চারন করবেন না। তারা মুক্তিবাহিনী। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবদুল কাদের সিদ্দিকী এবং তারা ইউনিফর্ম পরা ছিল। তাহলে হয়তো ওরা রাজাকার ছিল, যারা প্রতিরোধের বিরোধীতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছে।

মি. প্রাইম মিনিস্টার, কেউ প্রমাণ করেনি যে, লোকগুলো রাজাকার ছিল এবং কেউই প্রতিরোধের বিরোধীতা করেনি। তারা ভীত সন্ত্রস্ত ছিল। হাত পা বাঁধা থাকায় তারা নড়াচড়া করতে পারছিল না।’

‘মিথ্যাবাদী’
‘শেষবারের মত বলছি, আমাকে মিথ্যাবাদী বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।’
‘আচ্ছা সে অবস্থায় তুমি কি করতে?’
‘আমি নিশ্চিত হতাম যে, ওরা রাজাকার ও অপরাধী। ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতাম এবং এভাবেই এই ঘৃণ্য হত্যাকান্ড এড়াতাম।’
ওরা ওভাবে করেনি। হয়তো আমার লোকদের কাছে বুলেট ছিল না’।
‘হ্যাঁ, তাদের কাছে বুলেট ছিল। প্রচুর বুলেট ছিল। এখনো তাদের কাছে প্রচুর বুলেট রয়েছে। তা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গুলি ছোড়ে। ওরা গাছে, মেঘে, আকাশে, মানুষের প্রতি গুলি ছোড়ে শুধু আনন্দ করার জন্য।’

এরপর কি ঘটলো.. যে দুই মোটা মন্ত্রী নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন গোটা সাক্ষাতকারের সময়টায়, সহসা তারা জেগে উঠলেন। আমি বুঝতে পারলাম না, মুজিব কি বলে চিৎকার করছেন। কারণ কথাগুলো ছিল বাংলায়। খুনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমি চুপচাপ কেটে পড়লাম।
গোটা নগরী ইতিমধ্যে জেনে গেছে যে, মুজিব ও আমার মধ্যে কি ঘটেছে। শমশের ওয়াদুদ নামে একজন লোক ছাড়া আমার পক্ষে কেউ নেই। লোকটি মুজিবের বড় বোনের ছেলে। এই যুবক নিউইর্য়ক থেকে এসেছে তার মামার কাছে। তার মতে একটা বাসন মোছার ন্যাকড়ার মতে আচরন করা হয়েছে তার সাথে।

সে আরো বললো যে, মুজিব ক্ষমতালোভী এবং নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারনা সম্পন্ন অহংকারী ব্যক্তি। তার মামা খুব মেধাসম্পন্ন নয়। বাইশ বছর বয়সে মুজিব হাইস্কুলের পড়াশুনা শেষ করেছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতির সচিব হিসেবে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এছাড়া তিনি আর কিছুই করেননি। কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে মুজিব একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। ওয়াদুদের মতে, আত্মীয় স্বজনের সাথে খারাপ আচরণের কারণ এটা নয়। আসলে একমাত্র ওয়াদুদের মাকেই মুজিব ভয় করেন। এই দুঃখজনক আচরনের জন্য তিনি পারিবারিকভাবে প্রতিবাদ জানাবেন। সে আরো জানালো যে আমার সাথে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা সে তার মাকে জানাবে, যাতে তিনি এ ব্যাপারে মুজিবের সাথে কথা বলেন। সে আমাকে আরো বললো যে, সরকারী দফতরে গিয়ে এ ব্যাপারে আমার প্রতিবাদ করা উচিত। কারণ প্রেসিডেন্ট খাঁটিঁ ভদ্রলোক।

মুজিব সম্পর্কে সংগৃহিত তথ্যাবলি তার জন্য বিপর্যয়কর। ১৯৭১ এর মার্চে পাকিস্তানীদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ডের কিছুদিন পূর্বে ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকায় এসেছিলেন। ইয়াহিয়া খান যথাশীঘ্র ফিরে যান। কিন্ত ভুট্টো ঢাকায় রয়ে যান। তাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাখা হয় তার অ্যাপাটমেন্ট ছিল ৯১১-৯১৩। কেউ কি ধারণা করতে পারে, কে তার গাইড ছিলেন? লোকটি শেখ মুজিবর রহমান। এখন থেকে তাকে বলা হয় মুজিব। দু’জন বরাবর একত্রে ছিলেন। অবিচ্ছেদ্য। ঠিক দু’জন প্রেমিক-প্রেমিকার মতো। হোটেল অ্যাপাটমেন্টে তারা হুইস্কি অর্ডার দিতেন এবং সব সময় হাসতেন। একদিন তারা নৌকাযোগে পিকনিকেও গেছেন। তারা যদি শক্রুই হবেন, তাহলে এসব হয় কি করে? এরপর ২৫শে মার্চ রাত ১০ টায় মুজিব নিখোঁজ হয়ে গেলেন এবং ট্রাজেডির শুরু হলো।

ইন্টারকন্টিনেন্টালের সর্বোচ্চ তলায় ভুট্টোর ভুমিকা ছিলো নিরোর মত। নগরী যখন জ্বলছিল এবং এলোপাথারী গুলিবর্ষণ চলছিল, ভুট্টো তখন মদপান করছিলেন আর হাসছিলেন। পরদিন সকাল ৭টায় তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। কিন্ত যাওয়ার আগে একটি টেলিফোনে মুজিবের নাম উল্লেখ করেন। তিনি কি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন তার বন্ধুর কোন অমঙ্গল না ঘটে!

এ সত্যটা ঢাকায় সবসময় সুস্পষ্ট ছিল। আমি দেখেছি, যারা এক সময় পাকিস্তানীদের ভয়ে ভীত ছিল, তারা এখন মুজিবকেই ভয় করে। গনতন্ত্র ও স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রচুর কথাবার্তা চলে এদেশে। কিন্ত সবসময় তা বলা হয়, ফিসফিসিয়ে, ভয়ের সঙ্গে লোকজন বলাবলি করে যে, এই সংঘাতে মুজিব খুব সামান্যই হারিয়েছেন। তিনি ধনী ব্যক্তি। অত্যন্ত ধনবান। তার প্রত্যাবর্তনের পরদিন তিনি সাংবাদিকদেরকে হেলিকপ্টার দিয়েছিলেন। কেউ কি জানে, কেন?

যাতে তারা নিজেরা মুজিবের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি অবলোকন করে আসতে পারে। এখনো তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, জাতীয়তাবাদের কথা বলেন। আসলে তিনি ভান করেন। তিনি কি তার জমিজমা, বাড়ী, বিলাসবহুল ভিলা, মার্সিডিজ গাড়ী জাতীয়করণ করবেন? মুখোশ উন্নোচন করে মুজিব স্বীকার করুক, কে তার বন্ধু বৃটিশ এবং আমেরিকানরা। যখন তিনি কোন বৃটিশ বা আমেরিকানের সাথে সাক্ষাত করেন। তা না হলে কারাগার থেকে মুক্তির পর দিল্লী না গিয়ে লন্ডন গেলেন কেন? ‘করাচি ও তেহরানের মধ্যে কোন যোগাযোগ ছিল না’ এটা সত্য নয়। তিনি এথেন্স বা তেহরান যেতে পারতেন এবং সেখান থেকে ভারতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ৫২ মিনিটের পরিবর্তে ২৪ ঘন্টা কাটাতে পারতেন।

ওরিয়ানা ফালাচি

সাংবাদিকতার দীর্ঘ জীবনে বেশ ক’টি বই লিখেছেন ওরিয়ানা ফালাচি, পেয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক পুরষ্কার।

ভুট্টোর সাথে মুজিবের প্রথম সাক্ষাত হয় ১৯৬৫ সালে, যখন তিনি ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তকে অরক্ষিত রাখার কারনে পশ্চিম পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেন। একজন নেতা হিসেবে তার মূল্য ছিল খুবই কম। তার একমাত্র মেধা ছিল মূর্খ লোকদের উত্তেজিত করে তোলার ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন কথামালা ও মিথ্যার যাদুকর….চরম মিথ্যা। কিছুদিন আগে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি বলেছিলেন, ‘করাচীর রাস্তাগুলো সোনা দিয়ে মোড়া। তা দিয়ে হাটলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। অর্থনীতির কিছুই বুঝতেন না তিনি। কৃষি ছিল তার কাছে রহস্যের মতো। রাজনীতি ছিল প্রস্ততবিহীন। কেউ কি জানে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে তিনি কেন বিজয়ী হয়েছিলেন? কারন সব মাওবাদীরা তাকে ভোট দিয়েছিল।

সাইক্লোনে মাওবাদীদের অফিস বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং তাদের নেতা মাওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জনগণকে যদি পুনরায় ভোট দিতে বলা হয়, তাহলে মুজিবের অবস্থা স¤পূর্ণ ভিন্নতর হবে, যদি তিনি বন্দুকের সাহায্যে তার ইচ্ছে চাপিয়ে দিতে না চান। সেজন্য তিনি মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্র সমর্পনের নির্দেশ দিচ্ছেন না এবং আমাদের স্মরন রাখতে হবে যে, রক্তপিপাসু, কসাই, যে ঢাকা স্টেডিয়ামে হত্যযজ্ঞ করেছিল সেই আবদুল কাদের সিদ্দিকী তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা। ভারতীয়রা তাকে গ্রেফতার করেছিল, কিন্ত মুজিব তাকে মুক্ত করেন।
এখন আমরা গণতন্ত্রের কথায় আসতে পারি। একজন মানুষ কি গণতন্ত্রী হতে পারে, যদি সে বিরোধীতা সহ্য করতে না পারে? কেউ যদি তার সাথে একমত না হয়, তিনি তাকে ‘রাজাকার’ বলেন। বিরোধীতার ফল হতে পারে ভিন্নমত পোষণকারীদের কারাগারে প্রেরণ। তার চরিত্র একজন একনায়কের, অসহায় বাঙ্গালীরা উত্তপ্ত পাত্র থেকে গনগনে অগ্নিকুন্ডে পতিত হয়েছে। বাঙ্গালী রমনীদের সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের সম্পর্কে কথা না বলাই উত্তম। তিনি নারীকে পাত্তাই দেন না…।

বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আমাকে আবার মুজিবের সাথে দেখা করতে বললেন। সব ব্যবস্থা পাকা।

প্রেসিডেন্ট যে প্রচেষ্টা করেছিলেন তা খুব একটা সফল হয়নি। তিনি দু’জন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তার নির্দেশ পালন করা হয়। মুজিবের কাছে একটা হুংকার ছাড়া তারা আর কিছুই পায়নি। তবে এবার একটা করিডোরের বদলে একটা কক্ষে অপেক্ষা করার অনুমতি পেলাম। আমি বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। একজন বয় আমার চায়ের কাপ পূর্ণ করে দিচ্ছিল এবং এভাবে আমি আঠারো কাপ চা নিঃশেষ করলাম। উনিশ কাপের সময় আমি চা ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে হেটে বেরিয়ে এলাম। আমাকে অনুসরন করলো মুজিবের সেক্রেটারী ও ভাইস সেক্রেটারী তারা বললো, মুজিব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং আগামীকাল সকাল সাড়ে সাত টায় আমার সাথে দেখা করতে চান।

পরদিন সকাল সাড়ে ৭টায় আমি হাজির হলাম এবং সকাল নয়টায় মার্সিডিজ যোগে মুজিবের আগমন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। একটা কথাও না বলে তিনি অফিসে প্রবেশ করলেন। আমিও অফিসে ঢুকলাম। আমার দিকে ফিরে তিনি উচ্চারণ করলেন ‘গেট আউট”। আমি কক্ষ ত্যাগ করতে উদ্যেত। তিনি বললেন,‘গেট ইন হিয়ার’। আমি ফিরলাম এবং তখনই তিনজন লোক পোস্টার আকৃতির একটি ছবি নিয়ে এলো। দেখে তিনি বললেন ‘চমৎকার’। এরপর তিনি বললেন, এই মহিলা সাংবাদিককে দেখাও। আমি ‘চমৎকার’ শব্দটি উচ্চারন করলাম। এ ছিল এক মারাত্মক ভুল। তিনি বজ্রের মতো ফেটে পড়লেন। তিনি ক্ষিপ্ত। ছবিটি ফ্লোরে ছুড়ে দিয়ে বললেন, এটা চমৎকার নয়’। আমি কিছু না বুঝে নিশ্চুপ থাকলাম।

আমি তার উত্তেজনা হ্রাস করতে সক্ষম হলাম। যেহেতু আমি ভুট্টোর সাথে তার সত্যিকার সম্পর্কটা খুঁজে পেতে চাই, সেজন্য ভুট্টো সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। নামটা বলার মুহুর্তে তিনি জ্বলে উঠলেন এবং বললেন যে শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভবিষ্যত সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে চান। আমি প্রশ্ন করলাম ‘বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সম্ভাবনা আছে কিনা? খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে তিনি বললেন, এ সময়ে, আমার আর কোন আগ্রহ নেই।

এই বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধীকেও বিস্মিত হতে হবে যে, মুজিব কলকাতা করায়ত্ত করতে চায়। আমি বললাম, তার মানে অতীতে আপনার আগ্রহ ছিল এবং ভবিষ্যতে পুনঃবিবেচনা করার সম্ভাবনা আছে’। ধীরে ধীরে তিনি উপলদ্ধি করলেন যে, আমি তাকে একটা ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছি। নিজের ভুল সংশোধন করার বদলে তিনি টেবিল মুষ্টাঘাত করে বলতে শুরু করণে যে, আমি সাংবাদিক নই বরং সরকারী মন্ত্রী। আমি তাকে প্রশ্ন করছি না দোষারোপ করছি। আমাকে এখনই বের হয়ে যেতে হবে এবং পুনরায় আমি যেন এদেশে পা না দেই।

এ পর্যায়ে আমি নিজের উপর সকল নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেললাম এবং আমার মাঝে উত্তেজনার যে স্তুপ গড়ে উঠেছিল তা বিস্ফোরিত হলো। আমি বললাম যে, তার সবকিছু মেকি, ভুয়া। তিনি বাকগ্রস্ত এক উম্মাদ। তার পরিনতি হবে খুবই শোচনীয়। যখন তিনি মুখ ব্যদান করে দাঁড়ালেন আমি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম এবং রাস্তায় প্রথম রিকসাটায় চাপলাম। হোটেলে গিয়ে বিল পরিশোধ করলাম। সুটকেসটা হাতে নিয়ে যখন বেরুতে যাচ্ছি তখন দেখলাম মুক্তিবাহিনী নীচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

তারা একথা বলতে বলতে আমার কাছে এলো যে, আমি দেশের পিতাকে অপমান করেছি এবং সেজন্য আমাকে চরম মূল্য দিতে হবে। তাদের এই গোলযোগের মধ্যে পাচঁজন অষ্ট্রেলিয়ানের সাহায্যে পালাতে সক্ষম হলাম। তারা এয়াপোর্ট থেকে হোটেলে প্রবেশ করছিল। এয়ারপোর্টে দু’জন ভারতীয় কর্মকর্তা আমাকে বিমানে উঠিয়ে নিলেন এবং আমি নিরাপদ হলাম।

(২৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২)

*** সাংবাদিক যখন সংবাদ (পর্ব-৫)

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।