কেন রুদ্ধ হচ্ছে মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার?

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৩

মীর আব্দুল আলীম:
19 mediaএকজন সাংবাদিক দেশে ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিত হবেন ; সাংবাদিকতায় এটি স্বতঃসিদ্ধ । কিন্তু কী হচ্ছে দেশে? মহান পেশার আদর্শ উদ্দেশ্য উল্টে ফেলা হচ্ছে ; সৎ সাংবাদিকদের বিতর্কিত করা হচ্ছে; নানা স্বার্থে সংবাদপত্রকে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। কারা করছে এসব? আজ কেন সাংবাদিকতা বাণিজ্যের ভিড়ে সংবাদপত্র এবং প্রকৃত সাংবাদিকরা অপসৃয়মাণ? কেন মর্যাদাসম্পন্ন পেশা, মর্যাদা হারাচ্ছে।
কেন শুদ্ধতার মাঝে ঢুকে পরেছে নাম সর্বস্ব অপসাংবাদিকতা। দুর্নীতি আর ভ-ামি ঢুকে গেছে এ পেশায়। পেশা নয় অসুস্থ ব্যবসা। অশিক্ষিত, কুশিক্ষিতরা অর্থের বিনিময়ে আন্ডরগ্রাউন্ড পত্রিকার পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে মানুষকে ভয়ভীতি; আর সরলতার সুযোগ নিয়ে হরদম প্রতরণা করছে। যা সাংবাদিকতা আর সংবাদপত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। সমস্যাটা এখানেই ; দেশে হরেদরে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ। এই সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ আরোপে প্রকৃত সাংবাদিকদের সাহসী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সাংবাদিক হতে কোনো সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। হুট করেই সাংবাদিক হয়ে যেতে পারে যে কেউ। না, এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাও কোনো বিষয় নয় !
সুশিক্ষিত ও মানসম্পন্ন সাংবাদিক ও কলামিস্ট এদেশে অনেকেই আছেন, যারা তাদের ক্ষুরধার ও বুদ্ধিদীপ্ত লেখনী দ্বারা সমাজের অনেক অসঙ্গতি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলে আমাদের সমাজ সচেতন করে তোলেন প্রায়ই। সেই গুটিকয়েক নমস্য সাংবাদিকের সাথে মিশে গেছে সাংবাদিক নামধারী (লেবাসধারী) কিছু নর্দমার কীট; আসলে এরাই বর্তমানে সংখ্যায় বেশি। এসব অপসাংবাদিকতা ইদানীং সাংঘাতিক রকম বেড়ে গেছে। অপ-সাংবাদিক সৃষ্টি এক ধরনের সাংবাদিকতা নির্যাতন। আমরা চাই, সাংবাদিকতা পেশা যেন আগের সৎ ও নির্ভীক চেহারায় ফিরে আসে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে যারা এসব অপসাংবাদিক তৈরি করছে তারা সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যেই তা করছে। এটা কোনো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রও হতে পারে। এসব ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের প্রতিহত করতে হবে। নইলে বড্ড বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে এ মহান পেশায়। সাংবাদিক নামধারী অপসাংবাদিকদের বিষয়ে কিছু না বলে পারছি না।
সাংবাদিকতা একটি স্পর্শকাতর পেশা। যে কারো হাতে যেভাবে ছুরি কাঁচি তুলে দিয়ে অপারেশনের সার্জন বানিয়ে দেয়া গ্রহণযোগ্য হয় না, একইভাবে যে কারো হাতে পরিচয়পত্র, কলম-ক্যামেরা-বুম তুলে দিয়ে তাকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের দায়িত্ব দেয়াটাও গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। অথচ দেখা যাচ্ছে, লেখাপড়ায় মাধ্যমিকের গ-ি পার হতে পারেনি, এলাকায় টাউট হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা ঢাকাসহ জেলা শহর থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন অখ্যাত-কুখ্যাত পত্রিকার পরিচয় পত্র সংগ্রহ করে সাংবাদিক বনে যায় এবং প্রশাসনে ও রাজনৈতিক মহলে উদ্দেশ্যমূলক খবরদারী করে। আর প্রশাসনে খবরদারীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ওই টাউট সংবাদকর্মীরা সহজ সরল মানুষকে বস্নাকমেইলিং করছে।
পত্রিকা বিক্রেতা থেকে স্বঘোষিত সাংবাদিক হওয়া কিছু টাউট সংবাদকর্মী মোটরসাইকেলে অথবা প্রাইভেট কারে সাংবাদিক বা প্রেস লিখে অবাধে চলাফেরা করছে। সরকারি বেসরকারি দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব টাউট সংবাদকর্মীদের সমীহ করছে, আবার তাদের অপকর্মে সহযোগিতা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। শুধু এখানেই থেমে নেই টাউট হিসেবে চিহ্নিত এসব সংবাদকর্মীরা। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সম্যসাগ্রস্ত মানুষদের সরলতার সুযোগ নিয়ে এ সংবাদকর্মীরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত মানুষদের আরো বিপদে ফেলছে। সময় এসেছে এদের চিহ্নিত করবার। এরা আসলে সমাজ সুব্যবস্থার শত্রু। আসুন, আমরা এদের একে একে চিহ্নিত করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করি আর নিজ নিজ অবস্থানে থেকে এদের প্রতিহত করি। সাংবাদিকতার নিতিমালা প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে কারা নিতিমালা করবেন? নিতিমালা কি হবে? আর এসব সামলাবেই বা কে?
আমি সাংবাদিকদের এজন্য একটি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিধিমালা তৈরির পক্ষে। এ বিষয়টি কেউ সাংবাদিক নিয়ন্ত্রণ ভাববেন না দয়া করে। প্রকৃত সাংবাদিকদের সার্থেই তা করা যেতে পারে।আর সাংবাদিকদেরই এ ব্যাপারে বেশি এগিয়ে আসতে হবে। সব পেশারই লাইসেন্স প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান থাকে। প্রকৌশলী; আইনজীবী এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব বই পড়ে ঝালাপালা হয়ে গেলেও চিকিৎসা কিংবা নিজ নিজ কর্ম শুরু করার আগে আপনাকে সনদ নিতে হবে। এই সনদ গ্রহনের মাধ্যমে আপনি নূ্যনতম নিয়মনীতি ও পেশাগত সততার প্রতি অঙ্গীকার করতে হয়।
আপনি আইন পাস করলেও সরাসরি বিচার কার্যে অংশ নিতে পারবেন না, এজন্য আপনাকে তালিকাভুক্ত ও সনদধারী আইনজীবী হতে হবে। অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে হলেও আপনাকে শুধু হিসাববিজ্ঞান জানলে চলবে না, সংশ্লিষ্ট পেশাগত প্রতিষ্ঠানের সনদ নিতে হবে। এসব সনদের কারণে একজন পেশাজীবী তার নিজের পেশার প্রতি সৎ থাকার অঙ্গীকার করেন। সনদ থাকার কারণে আমরা সাধারণ মানুষরা বুঝতে পারি যে এই চিকিৎসক কি আইনজীবী আসলেই আমাকে সেবা দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন কী না। সেবা প্রদানে গুরুতর কোনো অনৈতিকতা থাকলে আমরা বিচারপ্রার্থী হতে পারি এবং দায়ী ব্যক্তির সনদ বাতিল করে তাকে পেশা থেকে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা আছে। তাই এই ধরনের পেশাদারিত্বের নিবন্ধন ও সনদ একজন মানুষকে নিজ পেশায় দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করে। থাকে জবাবদিহিতাও।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও তা হওয়া দরকার। কারণ সাংবাদিকদের লেখনীর ওপর ভালমন্দ অনেক কিছুই নির্ভরে করে। সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই আসতে হবে। এতে করে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা বাড়বে। বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে যারা সাংবাদিকতা করেন তাদের প্রকৃত তালিকা থাকা প্রয়োজন। দেশজুড়ে এভাবে সংবাদপত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মোটরসাইকেল কিংবা পরিবহনে কারা সংবাদপত্র কিংবা সাংবাদিক লিখতে পারবেন তার নিতিমালা দরকার। কারণ প্রায়ই দেখা যায় সংবাদপত্র সেটে দিয়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার কিংবা মোটরসাইকেলে অপরাধ সংঘটিত করছে দুর্বৃত্তরা। কোথাও কোথাও মাদক সরবরাহের কাজ করা হয় সংবাদপত্র লেখা গাড়ি দিয়ে। এই হচ্ছে আমাদের সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার পরিণতি।
আজকাল মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এ পেশা সম্পর্কে নানা নেতিবাচক মন্তব্য অনেকের কাছে শুনতে হয়। আজকের এ নিবন্ধ ধাঁন্দাবাজ, হলুদ সাংবাদিক এবং অপসাংবাদিককে ঘিরে, যারা সামপ্রতিক কালে এ মহান পেশাকে কলুষিত করে রেখেছেন, অপেশাদার মনোভাব তৈরি করে সাংবাদিকতা-বাণিজ্য চালু করেছেন। এদের রাহুগ্রাস থেকে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। এমনিতেই নিরাপত্তার অভাবে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের নিজেদের স্বার্থ দেখতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি সাংবাদিকরা সব বিভেদ ভুলে এক হবেন; অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার মর্যাদা যেন ভূলণ্ঠিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সাংবাদিকদের বিভক্তি আর অপসাংবাদিকদের অপতৎপরতার সুযোগ নিচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তরা। নিরাপত্তার অভাবে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার। ফিরে আসুক সাংবাদিকতার মর্যাদা; নিরাপদ আর মুক্ত হাতেকলম ধরার পরিবেশ ফিরে পাক সাংবাদিকরা ; রাহুমুক্ত হোক সংবাদপত্র। এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: মীর আব্দুল আলীম: সাংবাদিক ও নিউজ বাংলাদেশ ডটকমের সম্পাদক