ওরিয়ানা ফালাচি ও বঙ্গবন্ধু

শুক্রবার, ১৩/১২/২০১৩ @ ১১:৪৯ অপরাহ্ণ

:: কাজী আবুল মনসুর ::

সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি।

‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’ গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি।

‘আমি কলকাতা হয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করেছি। সত্যি বলতে কি, ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী তাদের বেয়োনেট দিয়ে যে যজ্ঞ চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করার পর পৃথিবীতে আমার অন্তিম ইচ্ছা এটাই ছিল যে, এই ঘৃণ্য নগরীতে আমি আর পা ফেলবো না..এ রকম সিদ্ধান্ত আমি নিয়েই ফেলেছিলাম। কিন্ত আমার সম্পাদকের ইচ্ছে যে, আমি শেখ মুজিবের সাক্ষাতকার গ্রহণ করি। ভুট্টো তাকে মুক্তি দেবার পর আমার সম্পাদকের এ সিদ্ধান্ত যতার্থ ছিল। লোকজন মুজিবের কথা বলাবলি করছিল। তিনি কি ধরনের মানুষ? আমার সহকর্মীরা স্বীকৃতি দিলো তিনি মহান ব্যক্তি, সুপারম্যান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দেশকে সমস্যামুক্ত করে গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত করতে পারেন।’

বিখ্যাত ইতালিয়ান সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি এমনটিই উল্লেখ করেন যখন তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাতকার নিতে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত নতুন ঢাকা ডাইজেষ্ট অবলম্বনে ফালাচির সাক্ষাতকারটি তাই পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলাম।

ওরিয়ানা ফালাচি। একজন নারী সাংবাদিক। যিনি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তার কলম দিয়ে। এমন আলোড়ন খুব কম সাংবাদিকই সৃষ্টি করতে পেরেছেন। বিশ্বের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনেতার সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে ফালাচি একাধিকবার শিরোনাম হয়েছেন সংবাদের।

অনেক ক্ষেত্রে প্রাণ নিয়ে তাঁকে পালিয়ে আসতে হয়েছে। একদিকে তাঁকে হত্যা করার জন্য পেছনে ঘাতক, অন্যদিকে সাহসী ফালাচি প্রভাবশালী নেতাদের মুখোশ উন্মোচনে ব্যস্ত, এমন অনেক দিনও গেছে তাঁর জীবনে। ইতালিয়ান এ সাংবাদিক জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯২৯ সালে ২৯ জুন। ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ৭৭ বছর বয়সে বিশ্বের সাংবাদিকদের জন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে মারা যান। কিংবদন্তিতুল্য এই সাংবাদিকের শূন্যতা এখনও পূরন হয়নি।

বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক ইন্দিরা গান্ধী, ইরানের শাহ খোমেনি, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ইয়াসির আরাফাত, দেং জিয়াও পিং, জুলফিকার আলী ভুট্টো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচিকে সাক্ষাতকার দেন। এসব সাক্ষাতকার ব্যাপক আলোচিত হয়। সাক্ষাতকারের সময় তাঁর সাহসী প্রশ্ন যেমন রাষ্ট্রনায়কদের হতবাক করেছে। তেমনি জন্ম দিয়েছে অনেক বিতর্ক ও প্রশ্নের। বিভিন্ন যুদ্ধকালীন সময়ে নেয়া অনেক সাক্ষাতকারে রাষ্ট্রনায়কদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তাঁর অনেক মন্তব্য এমন বাস্তবধর্মী ও ঝাঁঝালো ছিল যে, সাক্ষাতকারের সময় তাঁকে আঘাত করতেও এগিয়ে আসেন অনেকে। কিন্ত কোন কিছুই তাঁকে দমাতে পারতো না।

এবার পড়ুন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর সাক্ষাতকারের কাহিনী….

ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি-ওরিয়ানা ফালাচি রচিত একটি বহুল পঠিত বই। এতে আছে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার।

ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি-ওরিয়ানা ফালাচি রচিত একটি বহুল পঠিত বই।

‘আমার স্মরণ হলো, ১৮ই ডিসেম্বর আমি যখন ঢাকায় ছিলাম, তখন লোকজন বলছিল, মুজিব থাকলে সেই নির্মম, ভয়ঙ্কর ঘটনা কখনোই ঘটতো না। মুজিব প্রত্যাবর্তন করলে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্ত গতকাল মুক্তিবাহিনী কেন আরও ৫০ জন নিরীহ বিহারীকে হত্যা করেছে? টাইম ম্যগাজিন কেন বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে হেডলাইন করেছে..‘মহান ব্যক্তি না বিশৃংখলার নায়ক?

আমি বিস্মিত হয়েছি যে এই ব্যক্তিটি ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে সাংবাদিক অ্যালডো শানতিনিকে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন ‘আমার দেশে আমি সবচেয়ে সাহসী এবং নির্ভীক মানুষ, আমি বাংলার বাঘ, দিকপাল…এখানে যুক্তির কোন স্থান নেই..” আমি বুঝে উঠতে পারি নি, আমার কি ভাবা উচিত।

আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এবং আমার দ্বিধাদন্দ্ব দ্বিগুনেরও অধিক। ঘটনাটা হলো, আমি মুজিবকে দেখেছি। যদিও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। সাক্ষাতকার নেয়ার পূর্বে তাঁকে এক নজর দেখার সুযোগ পেয়েছি। কিন্ত এ কয়েকটা মুহুর্ত আমার চিত্তকে দ্বিধা ও সংশয়ে পূর্ণ করতে যথেষ্ট ছিল। যখন ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরন করি, কার সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছিল? তিনি আর কেউ নন মি. সরকার। আমার শেষবার ঢাকা অবস্থানকালে এই বাঙ্গালী ভদ্রলোক আমার দোভাষী ছিলেন। তাকেঁ দেখলাম রানওয়ের মাঝখানে। আমি ভাবিনি, কেন? সম্ভবত এর চেয়ে ভালো কিছু তার করার ছিল না।

আমাকে দেখামাত্র জানতে চাইলেন যে, আমার জন্য তিনি কিছু করতে পারেন কিনা?। তাকে জানালাম যে, তিনি আমাকে মুজিবের বাড়ীতে নিয়ে যেতে পারেন। তিনি সোজা আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলেন এবং পনের মিনিটের মধ্যে আমরা একটা গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম। গেটে মেশিনগানধারী মুক্তিবাহিনীর কড়া পাহারা। আমরা রান্নাঘরে প্রবেশ করে দেখলাম মুজিবের স্ত্রী খাচ্ছেন। সাথে খাচ্ছে তার ভাগনে ও মামাতো ভাই-বোনেরা। একটা গামলায় ভাত তরকারী মাখিয়ে আঙ্গুল দিয়ে মুখে পুরে দিচ্ছে সবাই। এদেশে খাওয়ার পদ্ধতি এরকমই।

মুজিবের স্ত্রী আমাকে উষ্ম অভ্যর্থনা জানালেন। আমার কাঁধে তার হস্ত স্থাপন করায় আমার জ্যাকেটে কড়াভাবে তার তৈলাক্ত আঙ্গুলের ছাপ পড়ে গেল, যা ড্রাই ক্লিনিং করেও উঠানো যাবে না। এরপর তিনি সমানে কথা বলতে শুরু করলেন। যার একটি শব্দও আমার বোধগম্য হয়নি।

ঠিক তখনি মুজিব এলেন। সহসা তার আবির্ভাব। তার পরনে চোগার মতো এক ধরনের সাদা পোশাক, যাতে আমার কাছে তাকে মনে হলো একজন প্রাচীন রোমান হিসেবে। চোগার কারনে তাকে দীর্ঘ ও ঋজু মনে হচ্ছিল। তার বয়স একান্ন হলেও তিনি সুপুরুষ। ককেশীয় ধরনের সুন্দর চেহারা। চশমা ও গোঁফে সে চেহারা হয়েছে আরো বুদ্ধিদীপ্ত। যে কারো মনে হবে, তিনি বিপুল জনতাকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। কিন্ত আট মাসের বন্দী জীবন এবং যে ভোগান্তির কথা তিনি দাবী করেন তা চেহারা দেখে অল্পই আঁচ করা যায়। পাকিস্তানীরা নিশ্চয়ই তাকে ভালোভাবে খেতে দিয়েছে।

আমি সোজা তার কাছে গিয়ে পরিচয় পেশ করলাম। আমার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলাম। মি. সরকার ভুমিতে পতিত হয়ে মুজিবের পদচুম্বন করলেন এবং ধীরে ধীরে পা, নিতম্ব, উদর বেয়ে কাঁধ পর্যন্ত উঠে তা আঁকড়ে থাকলেন। আমার প্রতি তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছি। অতঃপর মি. সরকার তার পায়ের কাছে হাটু গেড়ে বসে তার পায়ের আঙ্গুলের ডগা চুম্বন করলেন। আঙ্গুলগুলো স্যান্ডেলের সম্মুখভাগ দিয়ে বের হয়ে ছিল।

আমি বাঁধা দিলাম। কারন আমার ধারনা হয়েছিল মি. সরকার এই প্রক্রিয়াটা অব্যাহত রাখলে অসুখে আক্রান্ত হতে পারেন। আমি মুজিবের হাতটা আমার হাতে নিয়ে বললাম, ‘এই নগরীতে আপনি ফিরে এসেছেন দেখে আমি আনন্দিত। যে নগরী আশঙ্কা করেছিল যে আপনি আর কোনদিন ফিরবেন না’। তিনি আমার দিকে থাকালেন একটু উস্মার সাথে। একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, আমার সেক্রেটারীর সাথে কথা বল।’ এরপর মি. সরকারের শরীরটা ডিঙ্গিয়ে খাওয়ার টেবিলে চলে গেলেন। মি. সরকার তখন যেন ফ্লোরের সাথে মিশে আছেন।

আমার দ্বিধা ও সন্দেহের কারন উপলদ্ধি করা সহজ। মুজিবকে আমি জেনে এসেছি একজন গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী হিসেবে। যখন আমি দম নিচ্ছিলাম, একজন যুবক আমার কাছে এসে বললো, সে ভাইস সেক্রেটারী। বিনয়ের সাথে সে প্রতিশ্রুতি দিলো, বিকেল চারটার সময় আমি ‘হোয়াইট হাউজে’ হাজির থাকতে পারলে আমাকে দশ মিনিট সময় দেয়া যেতে পারে। মুজিবের সরকারী বাসভবনের নাম হোয়াইট হাউজ। তার সাথে যারা সাক্ষাত করতে চায় তাদের সাথে সেখানেই তিনি কথা বলেন। বিকেল সাড়ে তিনটায় নগরী ক্লান্ত, নিস্তদ্ধ, ঘুমন্ত-মধ্যাহ্নের বিশ্রাম নিচ্ছে।

রাস্তায় কাঁধে রাইফেল ঝুলানো মুক্তিবাহনী টহল দিচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় আগে। কিন্ত এখনও তাদের হাতে অস্ত্র আছে। তারা রাতদিন টহল দেয়। এলোপাতাড়ি বাতাসে গুলি ছুড়ে এবং মানুষ হত্যা করে। হত্যা না করলে দোকান পাট লুট করে। কেউ তাদের থামাতে পারে না। সম্ভবত তিনি তাদের থামাতে সক্ষম নন। অথবা এই কর্মকান্ডের পরিসমাপ্তি ঘটানোর তার ইচ্ছে নেই। তিনি সন্তষ্ট এজন্য যে, নগরীর প্রাচীর তার পোষ্টার সাইজের ছবিতে একাকার। অদ্ভুত, মুজিবকে আমি আগে যেভাবে জেনেছিলাম, তার সাথে আমার দেখা মুজিবকে মেলাতে পারছি না। ইনি কি কেসয়াস ক্লে?

না, তিনি কেসিয়াস ক্লে হতে পারেন না। যদিও তার সাথে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। তাকে মুসোলিনির মতো মনে হয়। একই মনোভাব এবং অভিন্ন তার প্রকাশ। একইভাবে মনে হবে যেন শক্ত চোয়াল ভেদ করে চিবুকটা বেরিয়ে আছে। এমনকি কন্ঠস্বরও একই রকম। দুজনের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো, মুসোলিনি যে ফ্যাসিষ্ট তা তিনি স্বীকার করেছেন। কিন্ত মুজিব তা লুকিয়ে রেখেছেন-মুক্তি স্বাধীনতা, গনতন্ত্র ও সাম্যের মুখোশের অন্তরালে। আমি যে তার সাক্ষাতকার নিয়েছি-এটা ছিল একটা দুর্বিপাক। তার মানসিক যোগ্যতা সর্ম্পকে আমার সন্দেহ ছিল। তিনি কি উন্মাদ? এমন কি হতে পারে যে, কারাগার এবং মৃত্যু সম্পর্কে ভীতি তার মস্তিস্ককে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে? তার ভারসাম্যহীনতাকে আমি আর কোনভাবে ব্যখ্যা করতে পারি না।

একই সময়ে আমি বলতে চাচ্ছি, কারাগার এবং মৃত্যুর ভয় ইত্যাদি..সম্পর্কে কাহিনীগুলো…আমার কাছে এখনো খুব স্পষ্ট নয়। এটা কি করে হতে পারে যে, তাকে যে রাতে গ্রেফতার করা হলো, সে রাতে সকল পর্যায়ের লোককে হত্যা করা হলো? কি করে সম্ভব যে, এতো কান্ডের মধ্যে তার এবং তার পরিবারের কারো কেশাগ্র বা মাথা স্পর্শ করা হলো না? কি করে এটা হতে পারে যে তাকে কারাগারে একটি প্রকোষ্ঠ থেকে পলায়ন করতে দেয়া হলো, যেটি তার সমাধি সৌধ হতো? তিনি কি গোপনে ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্র করেছিলেন? তার কাছে কিছু একটা রয়েছে যা সত্য নয়। আমি যত তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি, তত মনে হয়েছে, তিনি কিছু একটা লুকোচ্ছেন। এমন কি তার মধ্যে যে সার্বক্ষনিক আক্রমণাত্মক ভাব, সেটাকে আমার মনে হয়েছে আত্মরক্ষার কৌশল বলে।

ঠিক চারটায় আমি হোয়াইট হাউজে ছিলাম। ভাইস সেক্রেটারী আমাকে করিডোরে বসতে বললেন, যেখানে কমপক্ষে ৫০ জন লোকে ঠাসাঠাসি ছিল। তিনি অফিসে প্রবেশ করে মুজিবকে আমার উপস্থিতি সম্পর্কে জানালেন। আমি একটা ভয়ংকর গর্জন শুনলাম এবং নিরীহ লোকটি কম্পিতভাবে পুনরায় আবির্ভুত হয়ে আমাকে প্রতিক্ষা করতে বললেন। আমি প্রতিক্ষা করলাম..এক ঘন্টা, দুই ঘন্টা, তিন ঘন্টা, চার ঘন্টা..রাত আটটা যখন বাজলো, তখনো আমি সেই অপরিসর করিডোরে অপেক্ষমান। রাত সাড়ে আটটায় অলৌকিক ঘটনা ঘটলো..মুজিব আমাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তত। আমাকে প্রবেশ করতে বলা হলো।

আমি বিশাল এক কক্ষে প্রবেশ করলাম। একটি সোফা ও দুটো চেয়ার সে কক্ষে। মুজিব সোফার পুরোটায় নিজেকে বিস্তার করেছেন এবং দু’জন মোটা মন্ত্রী চেয়ার দুটো দখল করে বসে আছেন। কেউ দাঁড়ালো না। কেউ আমাকে অভ্যর্থনা জানালো না। কেউ আমার উপস্থিতি গ্রাহ্য করলো না। মুজিব আমাকে বসতে বলার সৌজন্য প্রদর্শন না করা পর্যন্ত সুদীর্ঘক্ষণ নীরবতা বিরাজ করছিল। আমি সোফার ক্ষুদ্র প্রান্তে বসে টেপ রেকর্ডার খুলে প্রথম প্রশ্ন করার প্রস্ততি নিচ্ছি।

কিন্ত আমার সে সময়ও ছিল না। মুজিব চিৎকার শুরু করলেন..হ্যারি আপ, কুইক, আন্ডারস্ট্যান্ড। নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?…পাকিস্তানিরা ত্রিশ লাখ লোক হত্যা করেছে, ইজ দ্যাট ক্লিয়ার..ইয়েস- থ্রি থ্রি থ্রি (তিনি কি করে এই সংখ্যা স্থির করলেন, আমি কখনো তা বুঝবো না। ভারতীয়রা নিহতের যে সংখ্যা দিয়েছে তা কখনো দশ লক্ষের কোঠা অতিক্রম করেনি।..আমি বললাম মি. প্রাইম মিনিস্টার…।

মুজিব আবার চিৎকার শুরু করলেন ‘ওরা আমার নারীদেরকে তাদের স্বামী ও সন্তানদের সামনে হত্যা করেছে। স্বামীদের হত্যা করেছে তাদের ছেলে ও স্ত্রীর সামনে। মা বাপের সামনে ছেলেকে, দাদা দাদীর সামনে নাতিকে, নাতীর সামনে দাদা দাদীকে, ভাইয়ের সামনে বোনকে, বোনের সামনে ভাইকে, চাচার সামনে চাচীকে, শালার সামনে শালীকে…’

ওরিয়ানা ফালাচি।

কিংবদন্তিতুল্য এই সাংবাদিকের শূন্যতা এখনও পূরন হয়নি।

‘‘ মি. প্রাইম মিনিস্টার…আমি বলতে চাই….‘তোমার কোন কিছু চাওয়ার অধিকার নেই, ইজ দ্যাট রাইট?’ আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো তাকে নরকে প্রেরণ ও প্রস্থান। কিন্ত একটা বিষয় সম্পর্কে আমি আরো বুঝতে পারছিলাম না, মি. প্রাইম মিনিস্টার, গ্রেফতারের সময় কি আপনার উপর নির্যাতন করা হয়েছিল?

‘‘নো, ম্যডাম নো। তারা জানতো, ওতে আমার কিছু হবে না। তারা আমার বৈশিষ্ট্য, আমার শক্তি, আমার সম্মান, আমার মূল্য, বীরত্ব সর্ম্পকে জানতো, আন্ডারস্ট্যান্ড? ”
“তা বুঝলাম। কিন্ত আপনি কি করে বুঝলেন যে তারা আপনাকে ফাঁসিতে ঝুলাবে? ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে..‘নো, নো ডেথ সেনটেন্স।’ এই পর্যায়ে তাকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো এবং তিনি গল্প বলতে শুরু করলেন “আমি এটা জানতাম। কারণ ১৫ ডিসেম্বর ওরা আমাকে কবর দেয়ার জন্য একটা গর্ত খনন করে।”

কোথায় খনন করা হয়েছিল সেটা?
‘আমার সেলের ভিতরে’।
আমাকে কি বুঝে নিতে হবে যে গর্তটা ছিল আপনার সেলের ভিতরে?
‘ইউ মিস আন্ডারস্ট্যান্ড’।
আপনার প্রতি কেমন আচরন করা হয়েছে মি. প্রাইম মিনিস্টার?
‘আমাকে একটা নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল। এমনকি আমাকে সাক্ষাতকারের অনুমতি দেয়া হতো না, সংবাদপত্র পাঠ করতে বা চিঠিপত্র দেয়া হতো না, আন্ডারস্ট্যান্ড”।

তাহলে আপনি কি করেছেন?
আমি অনেক চিন্তা করেছি, বহু পড়াশুনা করেছি।
‘আপনি কি পড়েছেন?
বই এবং অন্যান্য জিনিস।’
তাহলে আপনি কিছু পড়েছেন”
হ্যাঁ, কিছু পড়েছি।
কিন্ত আমার ধারনা হয়েছিল, আপনাকে কোন কিছুই পড়তে দেয় নি
ইউ মিস আন্ডারস্টুড’
তা বটে মি. প্রাইম মিনিস্টার। কিন্ত এটা কি করে হলো যে, শেষ পর্যন্ত ওরা আপনাকে ফাঁসিতে ঝুলালো না..
‘জেলার আমাকে সেল থেকে পালাতে সহায়তা করেছেন এবং তার বাড়ীতে আশ্রয় দিয়েছেন’।

কেন তিনি কি কোন নির্দেশ পেয়েছিলেন?
‘আমি জানি না। তার সাথে আমি কোন কথা বলিনি এবং তিনিও আমার সাথে কিছু বলেননি।’
‘নীরবতা সত্বেও কি আপনারা বন্ধুত্বে পরিনত হয়েছিলেন?
হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আমাকে সাহায্য করতে চান”।
তাহলে আপনি তার সাথে কথা বলেছেন?
হ্যাঁ, আমি তার সাথে কথা বলেছি।’
আমি ভেবেছিলাম আপনি কারও সাথে কথা বলেননি’
ইউ মিস আন্ডারস্টুড”।

তা হবে মি. প্রাইম মিনিস্টার। যে লোকটি আপনার জীবন রক্ষা করলো আপনি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন না?
‘এটা ছিল ভাগ্যে। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি।’

এরপর তিনি ভুট্টো সম্পর্কে কথা বললেন। এসময় তার কথায় কোন স্ববিরোধীতা ছিল না। বেশ সতর্কতার সাথেই বললেন তার সম্পর্কে। আমাকে মুজিব বললেন যে, ২৬ ডিসেম্বর ভুট্টো তাকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য তাকে রাওয়ালপিন্ডি নেয়া। তার ভাষায়, ‘ভুট্টো একজন ভদ্রলোকের মতই ব্যবহার করলেন। তিনি সত্যিই ভদ্রলোক।’

ভুট্টো তাকে বলেছিলেন যে, একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য মুজিব ব্লাক আউট ও যুদ্ধ বিমানের গর্জন থেকে বরাবরই যুদ্ধ সম্পর্কে আঁচ করেছেন। ভুট্টো তার কাছে আরো ব্যাখ্যা করলেন যে, এখন তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং তার কাছে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চান।

আমি তাকে প্রশ্ন করলাম,‘কি প্রস্তাব মি. প্রাইম মিনিস্টার? তিনি উত্তর দিলেন ‘হোয়াই শুড আই টেল ইউ? এটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রাইভেট অ্যাফেয়ার’। আমার কাছে বলার প্রয়োজন নেই মি. প্রাইম মিনিস্টার, আপনি বলবেন ইতিহাসের কাছে’।

মুজিব বললেন, ‘আমিই ইতিহাস। আমি ভুট্টোকে থামিয়ে বললাম, যদি আমাকে মুক্তি দেয়া না হয়, তা হলে আলাপ করবো না। ভুট্টো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উত্তর দিলেন, আপনি মুক্ত, যদিও আপনাকে শীঘ্রই ছেড়ে দিচ্ছি না। আমাকে আরো দুই বা তিনদিন অপেক্ষা করতে হবে।

এরপর ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কে তার পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করলেন। কিন্ত আমি অহংকারের সাথেই জানালাম, দেশবাসীর সাথে আলোচনা না করে আমি কোন পরিকল্পনা করতে পারি না’। এই পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করলাম ‘তাহলে তো কেউ বলতেই পারে যে, আপনাদের আলোচনা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হয়েছিল’

চলবে…

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম