সাংবাদিকের ‘সনদ’ বনাম সোশ্যাল মিডিয়ার ‘স্বাধীনতা’

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০১৩

পলাশ দত্ত :
পৃথিবীতে অনেক দেশই আছে যেখানে সাংবাদিকতা পেশায় যেতে হলে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ নিতে হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের সনদ নিতে হয় না। যারা সনদের পক্ষে তাদের জন্য এটা খারাপ কথা। আর যারা সনদের বিপক্ষে তাদের জন্য ভালো না হলেও, খারাপ নয়। সনদ নিতে হয়- এমন দেশেও সনদের বিরোধিতাকারী মানুষ আছেন স্বাভাবিকভাবেই। এদের মধ্যে সাংবাদিকতা পেশার মানুষও আছেন।

scaleবাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে এরকম সনদের আবেদন উঠলো এই প্রথম। আবেদনটি তুলেছেন আরিফ জেবতিক। তিনি দীর্ঘ সময় সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্লগারদের একজন। সাংবাদিকদরে জন্য তিনি সনদ চান কেন? কারণ তিনি চান, ‘তথাকথিত সাংবাদিকদের’ কর্মকাণ্ডের দায় থেকে সত্যিকার সাংবাদিক রক্ষা পাক। তার এই চাওয়া যে ভালো তা নিয়ে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। আর সাংবাদিকতা যেহেতু একটি পেশা, তাই এই পেশার লাইসেন্স দেয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান থাকতেই পারে- আরিফের মতে। কেননা চিকিৎসা থেকে শুরু করে আরো নানা পেশা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সনদ ছাড়া শুরু করা যায় না। আরিফের এই কথাও অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
তবে তার ‘সনদধারী সাংবাদিক চাই’ কলামটি পড়তে পড়তে একটি বিষয় মনে পড়ে। মনে পড়ে গত বছরের গোড়ার দিকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি নির্দেশনার কথা বলেছিলেন দেশের প্রধান অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সেসময় তার এ বক্তব্যে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া এসেছিলো সোশ‌্যাল মিডিয়ায়। বিভিন্ন ব্লগে এর প্রতিবাদে ব্লগ এসেছিলো। ফেইসবুকেও নানা বক্র মন্তব্য এসেছিলো এই বিষয়টি নিয়ে। ব্লগার আরিফও এ নিয়ে ব্লগ লিখেছিলেন। আমার ব্লগে তার একটি ব্লগে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, কেন সোশ্যাল মিডিয়া- আরিফের ভাষায় ব্লগ- নিয়ে নীতিমালার দাবি উঠছে। আরিফ বলেছিলেন, “বর্তমান বিশ্বে ব্লগ ও উন্মুক্ত মিডিয়ার শক্তি অনেক। মানুষ দ্রুতই ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষ দিনের একটি অংশ এখন ইন্টারনেটে কাটানো শুরু করছে।” তাই বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কারণে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে বলে মনে করেন আরিফ। ইন্টারনেট “বিকল্প সংবাদ মাধ্যম হিসেবেও সরকারকে ভোগান্তিতে ফেলছে” বলেও মনে করেন তিনি। আর তাই সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের নানা উদ্যোগ দেখতে পান তিনি।

“হুমায়ূনের সন্তানদের ফেসবুক থেকে ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে অবলীলায় ছাপিয়ে দেয়া হচ্ছে” বলে জানাচ্ছেন আরিফ জেবতিক। সেইসব ছবি যদি আপত্তিকর হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই নিন্দার ঘটনা। কিন্তু যদি তা আপত্তিকর ছবি না হয় এবং যথাযথভাবে সেই সূত্র উল্লেখ করে ছাপানো হয় তবে তা নিশ্চয়ই অসাংবাদিকসুলভ কাজ নয়? আর যে-ফেইসবুক থেকে ছবি সংগ্রহ হচ্ছে সেই ফেইসবুকে হুমায়ূন আহমেদ-মেহের আফরোজ শাওনকে নিয়ে আপত্তিকর, রুচিহীন স্ট্যাটাস, পোস্ট কি দিচ্ছে না এর ব্যবহারকারীরা? দিচ্ছে। তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অরাজকতা থামাবে কে? কেউ না। কেননা, আমার দাবি করি সোশ্যাল মিডিয়া হচ্ছে আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত স্থান! এখানে আমরা যা খুশি তাই বলতে পারি! যদিও আমাদের বলা কথাবার্তা পৌছে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের কাছে, তাতে কী যায় আসে? আমার স্বাধীন থাকবো, এবং আমাদের জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি হতে পারে না।

“সাংবাদিকতা একটি স্পর্শকাতর পেশা”- তাই সোশ্যাল মিডিয়ার নীতিমালা বিরোধী ব্লগার আরিফ সাংবাদিকদের জন্য সনদ চান। এই ‘স্পর্শকাতর পেশায়’ যারা আছেন, অর্থাৎ সাংবাদিকরা মানুষের কাছে তথ্য পৌছে দেন। তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য প্রবাহের ক্ষেত্রে ‘স্পর্শকাতরতার’ বিষয়টি মনে থাকছে না আরিফের। যদিও এই সোশ্যাল মিডিয়া যে তথ্য প্রবাহের একটি বিরাট ক্ষেত্র তা তিনি সোশ্যাল মিডিয়া নীতিমালা বিরোধী ব্লগপোস্টে উল্লেখ করতে ভোলেন না: ইন্টারনেট “বিকল্প সংবাদ মাধ্যম হিসেবেও সরকারকে ভোগান্তিতে ফেলছে।” তবে এই ভোগান্তি যে শুধু সরকারেরই হয় তা কিন্তু নয়। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন, কিংবা করেন না, এমন মানুষও এর মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্যের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন, পড়তে পারেন।

আসলে আরিফের লেখাটি পড়েই এতো কথা মনে এলো। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ। মূল কথা হলো: তথ্য নিয়ে যিনিই নাড়াচাড়ার ক্ষেত্রে সবখানেই নীতিমালা থাকা উচিৎ- হোক সেটা সাংবাদিকতা, হোক সোশ্যাল মিডিয়া।