সেই ভোট কেন্দ্রের দৃশ্য চোখে ভাসে

রবিবার, ডিসেম্বর ৮, ২০১৩

:: সাইফুদ্দিন তুহিন ::

লেখক।

লেখক।

’৮৮ সালের এরশাদ সরকারের আমলে সংসদ নির্বাচনের কথা। আমি তখন স্কুলের গন্ডি পেরুইনি। ওই সময় সংসদ নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রের ভয়াবহ দৃশ্য এখনো যেন ভুলতে পারছিনা। ভোটের সময় আসলে স্মৃতি যেন দরজায় এসে কড়া নাড়ে।

আমার জন্মস্থান বোয়ালখালী উপজেলার আকুবদন্ডি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত একটি ভোট কেন্দ্র। সকাল বেলায় দেখলাম আর্মড পুলিশের চৌকষ কিছু সদস্য বুকে পিঠে রাইফেল ঝুলিয়ে এগোচ্ছেন রাস্তা দিয়ে। ভোট কেন্দ্রটি বাড়ি থেকে একটু দূরে। মাঝখানে একটি বড় ধানক্ষেত।

বাড়ির পাশে রাস্তার এপারে দাঁড়ালে ওপারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রটি চোখে পড়ে। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে ভোট কেন্দ্র দেখতে রাস্তায় না আসতেই ভয়ে আতংকে শিউরে উঠি। মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ ভেসে আসছে কানে।

তাকিয়ে দেখি ভোট কেন্দ্র থেকেই আসছে গুলির শব্দ। মাঝে মাঝে দেখা যায় বিস্ফোরিত গুলি কিংবা কার্তুজের হালকা ধোঁয়ার কুন্ডলি আকাশের দিকে ছুটছে। হালকা বারুদের গন্ধও নাকে আসছে। উৎকণ্ঠার সাথে পাড়ার বড় ভাইদের কাছে গুলির শব্দের উৎস জানতে চাই।

তারা জানান, ভোট কেন্দ্র দখল করেছে জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীরা। লোকজন যাতে ভোট কেন্দ্রে না ভিড়ে সেজন্য সন্ত্রাসীরা ফাঁকা গুলি করে ভয় দেখাচ্ছে। এরই মাঝে চমকে যাওয়ার মত এক দৃশ্য দেখে আরো ভয় পেয়ে যাই। রাস্তার এক পাশ থেকে হেঁটে আসছেন আর্মড পুলিশের তিন সদস্য। তারা যাবেন গুলির শব্দ ভেসে আসা ভোট কেন্দ্রে। কিন্তু গুলির প্রচন্ড শব্দ শুনে তিন পুলিশই সামনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।

এক পর্যায়ে তিন পুলিশ রাস্তার পাশে দাঁড়ানো লোকজনের পাশে আসলেন। দেখছেন ভোট কেন্দ্রের বাইরের অবস্থা। তিন পুলিশই অসহায়ের মত তাকিয়ে আছেন দূরের ভোট কেন্দ্রের দিকে। একজনের মাথায় ভারি ব্যালট বাক্স। পাশে অস্ত্র হাতে তার দু’সঙ্গি।

একজনের খাকি ইউনিফর্মের শার্টের সাথে লাগানো হাবিলদারের ব্যাজ। থেমে থেমে গুলির শব্দ শুনে তিন পুলিশ সদস্যই আর কেন্দ্রের দিকে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কিছু দূর হেঁটে আমাদের পাশে দাঁড়ালেন তিন পুলিশ। তিনজনের মুখেই ভয়ের ছাপ।

আমার কিশোর বয়সে এই প্রথম দেখলাম সন্ত্রাসীদের কাছে সশস্ত্র পুলিশের অসহায় অবস্থা। কিছুক্ষণ পর গুলির আওয়াজ থামলে তিন পুলিশ সদস্য এগিয়ে যান ভোট কেন্দ্রের দিকে। জাপা সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া ফাঁকা গুলি বর্ষণের কারণে তিন পুলিশ সদস্যই অনেক দেরীতে ব্যালট বাক্স নিয়ে কেন্দ্রে যেতে পেরেছিলেন।

আমি পুলিশ সম্পর্কে জানতাম তারা সন্ত্রাসীদের আতংক। মারামারি কিংবা ডাকাতির ঘটনার পর পুলিশ পৌঁছলে নিরাপত্তা বোধ করতাম অন্তত ক্ষনিকের জন্য। কিন্তু ভোট কেন্দ্র দখল করা জাপার সেই সন্ত্রাসীদের কাছে পুলিশের অসহায়ত্ব দেখে অবাক হয়ে যায়।

সেই থেকে সন্ত্রাসী প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রথম প্রশ্ন জন্মে মনে। এরশাদের আমলে ওই নির্বাচন ছিল একদলীয়। আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এটি ভোটারবিহীন নির্বাচন হিসেবে এখনো আলোচনায় আসে।

তুমুল গণ আন্দোলনে ’৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন হয়। এরপর কেটে গেছে অন্তত ২৩ বছর। ’৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলেও ভোটারবিহীন এক নির্বাচনী দৃশ্য দেখেছেন সাধারণ মানুষ। ওই সময় হয়তো এরশাদ আমলের ভোটারবিহীন নির্বাচনের দৃশ্য লোকজনের চোখে আবার ভেসে ওঠেছিল। ভোটারবিহীন ওই নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার বেশিদিন টেকেনি।

তৎকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ করে সংসদ ভেঙে দেয়। আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আগামী ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের অধীনে নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত। এদিন অনুষ্ঠিত হবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

এই নির্বাচনেও অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছেনা। আমি ভেবে অস্থির হচ্ছি দীর্ঘদিন পর কৈশোরের সেই দৃশ্য আবার চোখে পড়বে। সেই একই দৃশ্য বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে দেখতে হবে তা চিন্তাই করতে পারছিনা। হয়তো জাপার সন্ত্রাসীদের মত ভোট কেন্দ্র দখল করতে মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ ভেসে আসবেনা কানে।

কিন্তু ভোট কেন্দ্রে যে উৎসবের আমেজ থাকবেনা তা এখনই আাঁচ করা যায়। অবশ্য এরই মধ্যে যদি রাজনৈতিক অচলাবস্থা কেটে যায় সব দল নির্বাচনে আসে তবে সেই দৃশ্য আর দেখতে হবেনা। লোকজন চায় ভোটের উৎসব, ভোট কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন। ভোট গ্রহন শেষে পছন্দের প্রার্থীর ভোট সংখ্যা জানতে তীব্র উচ্ছাস।

এরকম একটি নির্বাচনের জন্যই দেশবাসী মুখিয়ে থাকেন। এর ব্যতিক্রম চিত্র শুধু ভোটারদের নয়, দেশে অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা বেড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ।