বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকরা ছাত্রসংগঠনের প্রতিদ্বন্দ্বি নয়

শনিবার, ০৭/১২/২০১৩ @ ৮:০৭ অপরাহ্ণ

:: মাসুদ ফরহান অভি ::

মাসুদ ফরহান অভি

মাসুদ ফরহান অভি

ঘোড়ার ডাকের মাধ্যমে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে সংবাদ প্রেরণের ব্যবস্থা করেছিলেন শেরশাহ। ধারণা করা হয়ে থাকে, সেই থেকে সাংবাদিকতার শুরু। সাংবাদিকতার গাড়ি আর থামেনি। সময় পাল্টানোর সাথে পাল্টেছে শুধু সংবাদ জানানোর কৌশল।

সংবাদমাধ্যম যেখানে নির্বাক, বিচারের বাণী সেখানে কেঁদেছে নিরবে। কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক ও মানবিক অধিকারের রক্ষাকবচ গণমাধ্যম।

হাল আমলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শাসকশ্রেণী ছাত্রসংসদগুলো অকার্যকর করে ছাত্রঅধিকারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার যে অপচেষ্টা চালিয়েছে তাতে বাধা হয়ে দাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাংবাদিকতা। তারা এখন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অধিকার আদায়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে প্রকাশ্যে। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার ঝান্ডাবাহী সাহসী জনশক্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতার বিকাশ যখন প্রবাহমান শাসকশক্তি তখন তা রুখতে ব্যস্ত। যখন যারাই ক্ষমতাসীন হয় তখন তাদের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলোর নিয়মিত হুমকিতে তটস্থ থাকতে হয় সাংবাদিকদের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ও এর ব্যতিক্রম নয়।

ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে মৌলবাদি ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের আধিপত্য থাকায় তাদের নানা অপতৎপরতার সংবাদ প্রকাশিত হলেই সাংবাদিকদের উপর মনস্তাত্তিক চাপ সৃষ্টি করে তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের পাঁচ বছরে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, নিয়োগ বাণিজ্য, দখলদারিত্বসহ ছাত্রলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। এর বাইরে গত পাঁচ বছরে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার দিয়েছে তিনটি লাশ, শতাধিক সংঘর্ষ। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ছাত্রলীগেরই কেউ কেউ।

সংবাদপত্রে ছাত্রলীগের এসব অপকর্মের খবর প্রকাশিত হওয়ায় সাম্প্রতিককালে সাংবাদিকদের উপর ব্যাপক আগ্রাসী হয়ে উঠেছে তারা। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, কোন সংঘর্ষ কিংবা মারামারিতে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে কোন ছাত্রলীগ নেতা তার বক্তব্য পত্রিকায় প্রচার করতে প্রতিনিধিদের উপর অন্যায় আবদার করে। প্রতিনিধি সেই ছাত্রলীগ নেতার আবদার রাখতে না পারলে তাকে বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে মৌলবাদী কিংবা জামায়াত শিবিরের এজেন্ট! নিয়মিত হুমকি দিয়ে মানসিক চাপে রাখা হচ্ছে সেই সাংবাদিককে।

গত ১৯ জুলাই সিএনজি অটোরিক্সা চালকরা ছাত্রলীগের অস্ত্র বহন না করলে তাদের উপর হামলা চালায় চবি ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। এ সংক্রান্ত সংবাদ পত্রিকায় ছাপালে ২০ জুলাই চবি সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় চবি ছাত্রলীগ। সর্বশেষ গত ১৮ নভেম্বর ছাত্রলীগের এক নেতা ভোরের ডাকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আব্দুল হান্নান হাসিবের উপর হামলা চালায়।

২১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার এলাকায় দৈনিক মানবজমিনের চবি প্রতিনিধি আব্দুস সামাদকে লাঞ্ছিত করে চবি ছাত্রলীগের এক নেতা। চবিতে গত পাঁচ বছরে ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় ৩০ জন সাংবাদিক।

কিন্তু কেন এমন হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরাতো আপনাদের প্রতিদ্বন্দ্বি নয়। যে কারণে তাদেরকে আপনাদের মুখোমুখি দাড় করাবেন! ইতিহাস আপনাদের জায়গা দিয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহনকারী হিসেবে আর স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে জলন্ত অগ্নিশিখায়।

আপনারা শিক্ষা শান্তি প্রগতির ধারক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কোন তৎপরতা চালিয়ে থাকেন সাংবাদিকরা তা প্রকাশ করেছে। তেমনি আপনাদের অপকর্মের খবরও প্রকাশ করতে হয়েছে সাংবাদিকদের। এটি সাংবাদিকদের দায়িত্ব। হুমকি, মারধর, নির্যাতন করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণ সাংবাদিকদের নৈতিকতা ও সত্য প্রকাশের শপথ থেকে পিছু হটানোর চেষ্টা করা উচিত হবেনা।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]