‘দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন নাজনীন’

সোমবার, ডিসেম্বর ২, ২০১৩

:: কাজী আবুল মনসুর ::

মায়ের সঙ্গে চন্দ্রমুখী।

মায়ের সঙ্গে চন্দ্রমুখী।

সাংবাদিকতা পেশায় আসার পর থেকে গত ১৮ বছরে অনেক বড় বড় রিপোর্ট করেছি। লীড নিউজের ক্ষেত্রে অনেক বাহবা পেয়েছি। অনেকেই বলেন, এ পেশা চার্মিং। আপসোস করে অনেকে বলেন, ‘ইস যদি সাংবাদিক হতে পারতাম’। তবে সাংবাদিকদের একটি বদনাম আছে, সাংবাদিকরা নাকি শক্ত মনের মানুষ! ঘরে বাইরে এ ধরনের কথা হর-হামেশা শুনতে হয়। আসলে সাংবাদিকদের শক্ত থাকতে হয়। কিন্ত কতটুকু শক্ত, পরিমাপটি হয়তো কেউ করতে পারবে না!

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক জনকন্ঠ’। যে নামের সাথে জড়িয়ে আছে আমার অনেক দিনের স্মৃতি। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর এ প্রিয় পত্রিকায় আমার পদচারণা ছিল। সাংবাদিক মহলের বন্ধুদের মতে, জনকন্ঠে যারা সাংবাদিকতা করছেন বা করেছেন তাঁরা সবাই ঝুঁকি নিতে জানেন। সাহসী রিপোর্ট বলতে জনকন্ঠ বুঝায়। প্রভাবশালী অসাধু ব্যক্তিদের হুমকি-ধমকি বা মামলা-মোকদ্দমার ভয়, কোন কালে জনকন্ঠের সাংবাদিকদের দমাতে পারতো না, যে কোন ঝুঁকি মোকাবেলায় ভেতরের কঠিন মানুষটি সহজে নরম হতো না।

হয়তো সে রকম একজন কঠিন মানুষ সাংবাদিক নাজনীন আক্তার তন্নি। আমার প্রিয় পত্রিকা জনকন্ঠ’র সিনিয়র সাংবাদিক। নাজনীন অবলীলায় লিখে যান সাহসী রিপোর্ট। পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলেই মনে করেন তার সার্থকতা। কিন্ত নাজনীন হয়তো জানতেন না একদিন তিনি নিজেই হবেন ‘পত্রিকার সংবাদ’। সাংবাদিকতায় কঠিন মানুষটার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ‘একজন মা’ যখন বেরিয়ে এলো, তখন সবকিছু হয়ে গেলো এলোমেলো।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কষ্ট নাকি ‘পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ’। যে মা ১০ মাস ১০ দিন নিজের পেটে সন্তানকে পরম মমতায় রেখে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন সে মা’র চেয়ে বড় তো আর কেউ নেই। কিন্ত মৃত্যুগুলো কেন এমন। নাজনীন জম্ম দিয়েছিলেন চাঁদের মতো একটি শিশু। চাঁদ মুখখানি দেখেই তার নাম হয় চন্দ্রমূখী। মা নাজনীন চোখের সামনে চন্দ্রমূখীর বড় হওয়া দেখছিলেন। প্রতি বছর পালন করে আসছিলেন জম্মদিন। গুনতে থাকেন এক, দুই, তিন বছর…। তাঁদের চন্দ্রমূখীতো বড় হচ্ছে। এভাবে কেটে যায় বছর। কিন্ত একদিন চন্দ্রমূখীর শরীরে বাসা বাঁধে ভয়ঙ্কর এক রোগ। সে রোগ আর ভালো হয়নি। সাড়ে চার বছর বয়সে চন্দ্রমূখী নাজনীনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যায়।

২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নাজনীন হারায় চন্দ্রমূখীকে। প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান নেই, চলে গেছে ওপারে। এটি মেনে নিতে পারেননি নাজনীন। তাই বাসায় ফিরে সবার নজর ফাঁকি দিয়ে নিজেই বেঁচে নেন পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পথ। লাফ দেন পাঁচ তলা ভবন থেকে। কিন্ত অলৌকিকভাবে বেঁচে যান নাজনীন।

যে যাওয়ার সে চলে গেছে, অথচ নাজনীন যেতে চেয়েও পারলো না। হয়তো, চন্দ্রমূখী ওপার থেকে মাকে ডেকে বলছে ‘মা তুমি এভাবে মরে যেও না’। জনকন্ঠের নাজনীন মারা যায়নি, কিন্ত জীবনমৃত। পাঁচ তলা থেকে তারে জড়িয়ে নিচে পড়ে নাজনীন হয়ে যায় ‘সংবাদের শিরোনাম’। বড় নিষ্ঠুর আমাদের পথচলা।

“কেমন আছেন নাজনীন এখন” শিরোনামে ২ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক’র মহিলা অঙ্গন পাতায় প্রকাশিত সাংবাদিক ‘মারুফা হোসেনের’ লেখাটির কিছু অংশ আমি পাঠকদের জন্য নিচে তুলে দিলাম…

‘ঢাকা মেডিকেলের পঞ্চাশ নম্বর কেবিনে সিআরপিতে যাওয়ার আগে তাকে দেখতে যাই। ডাক্তার জানান এখানকার চিকিৎসার পালা শেষ হয়েছে। এখন থেরাপির মাধ্যমে স্বাভাবিক চলাফেরায় ফিরে আসার পালা শুরু। সকাল বেলা থেরাপিস্ট এসে প্রতিদিনই ব্যায়ম করান তাকে। যথারীতি আজও এসেছেন। পায়ের আঙ্গুল থেকে শুরু করে পায়ের পাতা গোড়ালি ,হাটু, কোমড় আর পায়ের সংযোগস্থান হয়ে কোমড়, প্রতিটি সংযোগে রক্ত চলাচল আর স্বাভাবিক নড়াচরার কসরত চলে। তারপর আসে হাতের পালা একইভাবে আঙ্গুলের প্রতিটি জোড়া নড়াচড়া করে কব্জি ছেড়ে যখন কনুইএর দিকে থেরাপিস্ট কানিজ ফাতেমা যাচ্ছিলেন তখনই আস্তে করে ঘোঙ্গানির মতো করলেন নাজনীন আক্তার তন্নি। বলে ওঠেন উনি ভাল থেরাপিস্ট হলেও ব্যাথ্যা দেন। কানিজ ফাতেমা হেসে বলেন ব্যাথ্যা না দিলেতো আপনি স্বাভাবিক নড়াচড়া করতে পারবেন না।

নাজনীন একজন সিনিয়র সাংবাদিক। রাজনৈতিক বিট ছিল তার কাজের গন্ডি। গুরুগম্ভির বিষয় খবর পৌঁছে দিতেন, আকস্মাত একদিন নিজেই খবরে শিরোনাম হলেন স্নেহময়ী মা রূপে। অপার তার স্নেহ ছাপিয়ে গেল সব পরিচয়। সাড়ে চার বছরের একমাত্র ছোট্ট মেয়ের অসুখের যন্ত্রনা সমান কষ্ট দিচ্ছিল তার শরীরে। আর যখন মৃত্যু এসে মেয়েকে নিয়ে গেল না ফেরার দেশে তখন যে যন্ত্রনা আর ধরে রাখতে পারেনি তিনি। ছোট্ট ছাদঁমুখো চন্দ্রমূখী বিহীন জীবনযাপনকে বিদায় জানাতে লাফ দেন পাচঁ তলা থেকে। কিন্তু বিধি বাম।

সৃষ্টিকর্তা যাকে বাঁচিঁয়ে রাখেন তাকে কেউ মারতে পারে না, তা আবার প্রমানিত হল নাজনীনের বেলায়। চিকিৎসার পাশাপাশি হাসপাতালেই মা আর শ্বশুড়ি তাকে যত্ন দিয়ে সারিয়ে তুলছেন । কেমন আছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মুখে বলেন, ভালো নেই। আজ কয়েকদিন হল কথা বলতে পারছি। গত সেপ্টেম্বর মাসেরর ১৬ তারিখে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় তার ডান হাত ভেঙে গেছে, মাথায় আর মেরুদন্ডে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। থেরাপি চলছে ২৭দিন যাবত। এখন নিজেও হাত পা সামন্য নড়াচড়া করাতে পারেন। এই সব বর্ণনায়ই বোঝা যায় নতুন করে এগিয়ে যাচ্ছেন জীবনের দিকে।

থেরাপিস্ট বলেন, নিজে নিজে ব্যায়াম করলে তাড়াতাড়ি সেড়ে উঠবেন। তিনি বলেন, আমি যে সেড়ে উঠতে চাই না। প্রশ্ন করলাম, কেন? দেখুন আপনার মা আর শ্বাশুড়ি কি যতœ করছেন আপনাকে সাড়িয়ে তোলার জন্য। নাজনীন বলেন চন্দ্রমুখীর কথা বললা না। ছোট্ট চন্দ্র মুখিটাতো আমার মা, ও কিছু খেতে চায় না শুধু দুধ পছন্দ করে। আর নীল রঙের নেইল পলিশ লাগাতে ভালবাসে। যান হাসপাতালে ও তার হাতে পায়ে নীল নেইলপলিশ ছিল। দ্যাখেন আপনার চন্দ্রমুখীর জন্য কেমন কষ্ট লাগে! আর আপনার মায়ের কাছেওতো আপনিও চন্দ্রমূখি। তারও আপনার জন্য তেমন কষ্ট লাগে।

গল্প করার সময় ডান চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু জল জমছিল। বারবারই টিসু দিয়ে তা মুছছিলেন। টানা চোখ, পাতলা নাক, বাঁকা ভ্রু আর আঁঁকা ঠোটের মাঝে অকৃত্রিম এক সৌন্দর্য নাজনীনের চেহারায়। বললাম আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। একটু অবাক হয়েই বলেন, তাই! এখনও আমি সুন্দর আছি। দুর্ঘটনার পরে আর আয়নায় নিজেকে দেখি নাই। কেন? চুপ থেকেই উত্তর দেন, মন চায়না। তবে সাংবাদিক নাজনীনের হাসপাতালে শুয়েই দেশের সব খবর নিতে মন চায়। যখন যে সহকর্মী , সাংবাদিক বন্ধু আসেন তার সাথেই আলোচনা চলে, কে কোন মন্ত্রণালয়ে আছ্নে, তফসিল কবে? ইত্যাদি ইত্যাদি।

একজন সহকর্মী হিসেবে শুধু এটুকু কামনা করি, ‘নাজনীন আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন’। আপনার চারপাশে থাকা অসংখ্য চন্দ্রমূখীর মাঝে আপনার চন্দ্রমূখীকে খুঁজে পাবেন। কোন ‘সাংবাদিক এভাবে সংবাদ হোক’ তা আমরা আর চাই না।

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।

*** সাংবাদিক যখন সংবাদ!