সাংবাদিক যখন সংবাদ!

শনিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৩

:: কাজী আবুল মনসুর ::

তরুণ তেজপাল

তরুণ তেজপাল

তরুণ তেজপাল। ভারতের প্রভাবশালী সাংবাদিক। জন্ম ১৯৬৩ সালে। ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু। কাজ করেছেন ইন্ডিয়া টুডে, দি ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায়। তার ‘ইন্ডিয়া লিংক’ প্রকাশনা সংস্থাটিও বেশ আলোচিত। ভারতের লেখিকা অরুন্ধতি রায়, তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত ‘দি গড অব স্মল থিং’ বইয়ে পেয়েছেন বুকার পুরস্কার। ২০০০ সালে তিনি ‘তেহেলিকা ডট কম ’ অনলাইন সংবাদ সংস্থা শুরু করেন। এরপর ২০০৭ সালে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘তেহেলিকা’ বের করেন।

২০১০ সালে ভারতের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইন্সটিটিউট তরুণ তেজপালকে ‘এ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্সি ইন জার্নালিজম’ পুরস্কারে ভূষিত করেন। তাঁকে ভারতের ৫০ ক্ষমতাধর ব্যক্তির একজন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ভারতের প্রভাবশালী এ সাংবাদিক এখন নিজেই ‘সংবাদ’। তাঁর প্রতিষ্ঠানের এক নারী সাংবাদিককে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ এ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তোলপাড় চলছে সারা ভারতে।

ভারতের পর্যটন কেন্দ্র বলে পরিচিত গোয়া’র একটি পাঁচ তারকা হোটেলে তেহেলিকার এক নারী সাংবাদিককে যৌন নির্যাতন করেছে তরুন তেজপাল। ঘটনাটি কি লিফটে ঘটেছে নাকি হোটেল রুমে ঘটেছে, এ নিয়ে ভিডিও ফুটেজ খোঁজাখুজি চলছে। ঘটনাটি কি ধর্ষণ না গায়ে হাত দিয়ে নিপীড়ন। এমনতর প্রশ্ন ঘুরে ফিরছে মিডিয়ায়। কেউ কেউ বলেছেন এটি ছিল উভয়ের সম্মতিতে ঘনিষ্ঠতা। সেই যা হোক, এখন তেজপালের তেজ নড়বড়ে। বিষয়টি নিয়ে এখন হুলস্থুল চলছে ভারতে। পীড়িত নারী সাংবাদিকের পক্ষে নেমেছে ভারতীয় জনতা পার্টি, আর তেজপালের পক্ষে নৈপথ্যে সমর্থন কংগ্রেসের। সব মিলে মিডিয়ার খবর তেজপাল। টালমাটাল তার প্রতিষ্ঠানও।

তেজপাল স্বীকার করে বলেছেন, ‘নেশার ঘোরে’ ঐ নারী সাংবাদিকের সঙ্গে অবাঞ্চিত আচরণ করেছেন, যা কোনভাবেই যৌন নিগ্রহ ছিল না। তা প্রমাণ করার জন্য তিনি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করার দাবি জানান। কিন্ত লিফটে কোন সিসিটিভি না থাকায় প্রমাণ বের করা মুশকিল হয়ে পড়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। পুলিশের দাবি, সিসিটিভির অন্য একটি ক্যামেরায় অভিযোগকারিনী নারী সাংবাদিককে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে।

তেজপালের বিরুদ্ধে অভিযোগটি উঠার পর দুটি ই-মেইল চালাচালি পুলিশ ও মিডিয়ার হাতে চলে আসে। তেজপাল ঐ দুটি ই-মেইল নারী তরুনী সাংবাদিককে দিয়েছিলো। তার একটিতে তেজপাল লেখেন, তোমার নিশ্চয়ই মনে রয়েছে সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের কথাবার্তা ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল। খানিকটা ফ্লাটিং করতে করতে আমরা কামনা ও যৌনতা নিয়ে কথা বলছিলাম। এ রকম একটা হাসিখুশি পরিবেশে ব্যাপারটা ঘটেছিল। আমি ভাবতেও পারিনি, তুমি বিরক্ত হচ্ছ বা তোমার অমতে ঘটনাটা ঘটেছে। নিগৃহিতা পাল্টা ই-মেইল বার্তায় লিখেছেন, ‘সে দিন আমাদের কথাবার্তায় কোন ইঙ্গিত ছিল না। হ্যাঁ, আপনি যৌনতা আর কামনা সম্পর্কে কথা বলছিলেন, কারণ আমার কাজ নিয়ে কথা বলার চেয়ে আপনি ওসব বলতে ভালোবাসেন। আপনি আমার গায়ে হাত ছোঁয়ানো মাত্র আপনাকে থামতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্ত আপনি কথা কানেই নেননি। বরং পরের রাতেও আমায় যৌন হেনস্থা করেছেন’।

মূলত এই ই-মেইলের বার্তার কারণে ফেসেঁ যান তেজপাল। পুলিশের কাছে এ সংক্রান্ত অভিযোগ আসার পর নড়েচড়ে বসে সবাই। প্রথম দিকে এত বড় একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়নি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। তদুপরি ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিজেপি’র অনেক ‘থলের বিড়াল’ বের করার মূল নায়ক তেজপালের দিকে কংগ্রেস নেতাদের সুনজর ছিল। তাই পুলিশ প্রশাসন প্রথম দিকে বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দেয়নি। তবে এটি ছড়িয়ে পড়ার পর গোয়া পুলিশ চাপের মুখে পড়ে। তাকে গ্রেফতারের জন্য শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। এরই মধ্যে তেজপাল জামিনের জন্য নিম্ন আদালতে আশ্রয় নেন।

মিডিয়া যখন তেজপালকে প্রশ্ন করেন তখনও তেজপাল ছিলেন ভাবলেশহীন। সাংবাদিককে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন তেজপাল তা মেনে নিতে না পেরে বলেন, মিডিয়া অকারণে চিৎকার করছে। আমি তদন্তে সাহায্যই করছি। কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না। তিনি দাবি করেন, সে দিন যা করেছিলেন তা নিছক ঠাট্টা’।

আর অপরদিকে সংবাদকর্মীদের প্রতি এক বিবৃতিতে নিগৃহিতা নারী সাংবাদিক বলেন, এক সময় যখন ধর্ষিতাদের সাক্ষাৎকার নিতে যেতাম, তখন তাদের বলতাম, কথা বলতে। নিগ্রহের কথা চেপে না রাখতে। এখন বুঝতে পারছি মুখ খুললে কিভাবে প্রতি মুহুর্তেই নানা অযৌক্তিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আমি মুখ খোলায় চাকরি হারালাম, আর্থিক নিরাপত্তা হারালাম, যা আমার দরকার। আমার মা আমাকে একার আয়ে বড় করেছেন। তাই আমি মর্মাহত, যখন এ অভিযোগের সঙ্গে রাজনীতির রং দেখেন অনেকে।’

এরপর ঘটনা ঘটতে থাকে দ্রুত। তেজপাল তখন দিল্লীতে। ঐ নারী সাংবাদিক ঘটনার কথা তেহেলিকার কার্যনির্বাহী সম্পাদক সোমা চৌধুরীকেও জানায়। আরও জানায় তেজপালের মেয়েকে। যিনি কিনা তেহেলিকাতেই কর্মরত। তেজপালের পক্ষ থেকে তরুণী সাংবাদিকের বাড়ীতে অনুরোধ জানিয়ে লোক পাঠানো হয়। এত সবকিছুর পরও যখন ঐ নারী সাংবাদিক তার বক্তব্যে অটল, তখন গোয়া পুলিশ সোমা চৌধুরীর ল্যাপটপ, আইপডসহ বেশ কিছু কাগজপত্র জব্দ করে। পদত্যাগ করেন সোমা চৌধুরীও।

২৯ নভেম্বর নিগৃহিতা নারী সাংবাদিক আদালতে প্রদত্ত বিবৃতিতে বলেন, তরুণ তেজপাল আমার সঙ্গে সেদিন যা করেছেন তাকে আইনী ভাষায় ধর্ষণই বলা হয়। আমার শরীর একান্তভাবে আমার, তা আমার চাকরি দাতার খেলার জিনিস নয়। উনি প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে নিজের সম্পদ ও ক্ষমতা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। আমিও আমার মর্যাদা বাঁচানোর চেষ্টা করছি এবং এও বলছি আমার শরীরের উপর অধিকার একমাত্র আমার।’

নারী সাংবাদিকের বিবৃতির পর তরুণ তেজপালকে গ্রেফতারের জন্য হন্য হয়ে মাঠে নামে পুলিশ। দিল্লী ও গোয়া পুলিশ ছুটে যায় তেজপালের বাড়ীতে। তেজপালের স্ত্রী গীতান পুলিশকে জানায় পাঁচ দিন ধরে তরুণের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। পুলিশ তাঁর বেশ কয়েকজন বন্ধুর বাড়ীতেও অভিযান চালায়। কিন্তু পাওয়া যায়নি তেজপালকে। তেজপাল যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারে তার জন্য বর্ডার চেকপোষ্ট রেল স্টেশনসহ সীমান্ত এলাকায় সর্তকতা জারী করা হয়। পুলিশ যখন তাকে হন্য হয়ে খুঁজছিল তখন তেজপাল দিল্লী বিমান বন্দরে। স্ত্রী, বোন মেয়েকে নিয়ে গোয়ার পথে। কিন্ত বিকেলে ডাবোলিন বিমান বন্দরে নামার সাথে সাথে তেজপালকে আটক করে পুলিশ।

এরপর পুলিশ প্রহরায় আদালতে হাজিরা। ব্যাপক তর্ক বিতর্কের পর তেজপালের জামিন একদিনের জন্য মঞ্জুর হয়। ঘটনা থেমে নেই। তেজপালের উপর হামলা করে একটি পক্ষ। এসময় পুলিশের সহায়তা বেঁচে যান তেজপাল। আদালতের বাইরে, রাস্তায় তেজপালের বিচার দাবিতে থেমে নেই মিছিল সমাবেশ।

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম