প্রযুক্তি সাংবাদিকতার পথিকৃৎ

শনিবার, ২৩/১১/২০১৩ @ ১০:১৮ অপরাহ্ণ

:: ভূঁইয়া ইনাম ::

najimসাংবাদিকতা করতেন অর্থনীতি বিষয়ে। যখন দেশের মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না, আশির দশকের শেষভাগে সেই সময়ে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি সাংবাদিকতার অগ্রগণ্য একজন ছিলেন নাজিম উদ্দিন।একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সাংবাদিক ১৮ আগস্ট ঢাকায় মারা যান।তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা সেটা ১৯৯১-এর শুরুর দিকের কথা।

নাজিম উদ্দিন মোস্তানের শুক্রাবাদের একতলা বাসায় তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। তিনি তখন ইত্তেফাকে অর্থনীতি বিটের জাঁদরেল রিপোর্টার। এত বড় একজন রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলতে একটুও ভয় করছিল না। তার কারণ ছিল, তাঁর অতি সাধারণ ও মানবিক কথাবার্তা। তিনি অর্থনীতি বিষয়ের পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়েও যাতে নিয়মিত লেখালেখি করেন, এই অনুরোধ করাতে তিনি উৎসাহিত হয়ে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি কম্পিউটার বিষয়েও লেখালেখি করব।’এরও কয়েক বছর আগে ১৯৮৭-৮৮ সালে নাজিম উদ্দিন মোস্তান দৈনিক ইত্তেফাকে কম্পিউটার নিয়ে প্রথম লেখেন একটি বিশেষ ক্রোড়পত্রে।

তার পর থেকে তিনি নিয়মিত কম্পিউটার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে লিখে গেছেন।বাংলাদেশ তো বটেই সারা বিশ্বেই তখন তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার সবে শুরু হচ্ছে।১৯৯১ সালে নাজিম উদ্দিন ও আমি যৌথভাবে কম্পিউটার জগৎ-এর প্রথম প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লিখি ‘জনগণের হাতে কম্পিউটার চাই’ নামে। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে নাজিম উদ্দিন ভাই লেখালেখির রসদ সংগ্রহে সব সময় বিভিন্ন কোম্পানিতে যেতেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সঙ্গী থাকতাম আমি। পরে সেই অতি সংক্ষিপ্ত নোট থেকে পুরো লেখা তৈরি করতেন।

একদিন আমাকে বোঝালেন, কীভাবে এই দ্রুত শর্ট নোট নিতে হয় এবং পরে সেটা থেকে লেখা তৈরি করতে হয়। তাঁর নির্দেশিত সেই পদ্ধতিতে এখনো আমি কাজ করছি। তিনি কমপিউউটার বিচিত্রা প্রকাশে আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছিলেন। কমপিউটার বিচিত্রার প্রথম সংখ্যার জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন।

পরিবার থেকে রাষ্ট্র

নাজিম উদ্দিন কম্পিউটার বিষয়ে লেখালেখি করতে করতেই একদিন জানালেন যে তিনি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করবেন, নাম রাষ্ট্র। উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম, আমার দিক থেকে সব ধরনের সহায়তা করব। রাষ্ট্র প্রকাশ করার জন্য তিনি আনন্দ কম্পিউটারের মোস্তাফা জব্বারের কাছ থেকে একটি অ্যাপল কম্পিউটার আনলেন। তাঁর বড় মেয়ে বর্তমানে বাংলাভিশনে কর্মরত নাজমুন নাহার ধীরে ধীরে আস্তে আস্তে কম্পোজ শেখা শুরু করলেন। পরে মো. ফারুক আহমেদ (বর্তমানে প্রথমা প্রকাশনে কর্মরত) রাষ্ট্রের কম্পোজ-মেকআপ করতেন মিলি ও মনিরকে সঙ্গে নিয়ে। তাঁর এ সময় স্ত্রী নুরজাহান খানম, ছোট মেয়ে বর্তমানে এসএ টিভিতে কর্মরত মৌটুসী নাহার ও ছেলে বর্তমানে আইএসএলে কর্মরত সাব্বির ফয়সাল রাষ্ট্রের সব কাজে হাসিমুখে সহায়তা করেছেন। এভাবেই তাঁর পরিবারের সদস্যদের দিয়ে রাষ্ট্র প্রকাশ করতে থাকেন। সে সময় প্রায় প্রতিদিনই বিকেলে তাঁর বাসায় রাষ্ট্র পত্রিকার লেখা ও বিজ্ঞাপন নিয়ে কথা হতো।প্রতিবার যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ভাবিকে ডেকে বলতেন, ‘এই দেখো, লেনিন আসছে সারা দিন অফিস করে। ওকে খেতে দাও।’

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ১৯৯৩ সালে হোটেল শেরাটনে আয়োজন করে দেশের প্রথম কম্পিউটার মেলা। নাজিম উদ্দিন আমাকে বললেন যে এ মেলা উপলক্ষে রাষ্ট্র বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। সে জন্য মেলার দুই-তিন দিন আগে থেকে ঢাকার অনেক কম্পিউটার কোম্পানিতে গিয়ে তাদের খবরাখবর সংগ্রহ করি। অনেকের সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়। প্রায়ই তিনি বিদেশি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কম্পিউটার বিষয়ে লেখার ফটোকপি ও পণ্যের ব্রোসিওর সংগ্রহ করতেন। সেগুলো থেকে তিনি প্রয়োজন বোধে বিভিন্ন লেখা লিখতেন।

নিয়মিত রাষ্ট্র প্রকাশনার জন্য তিনি অপরিসীম পরিশ্রম করতেন। সারা দিন অফিস করে তারপর রাষ্ট্রের জন্য খবরাখবর সংগ্রহ করে রাতেই তিনি সেগুলো লিখতেন।

মেলার একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। এক কম্পিউটার কোম্পানির সঙ্গে আমি আলাপ করে ঠিক করলাম যে মেলায় রাষ্ট্র পত্রিকার সঙ্গে একটি করে রজনীগন্ধা ফুল দেওয়া হবে। এই ফুল জোগাড় করার জন্য আমি গভীর রাতে গাবতলীতে গিয়ে যশোর থেকে আসা ফুল কিনে আনলাম। পরদিন মেলার উদ্বোধনের পর পর দর্শকদের পত্রিকা আর ফুল দেওয়ায় বেশ সাড়া পড়ে গেল।

অর্থনীতির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির বন্ধন

নাজিম উদ্দিন ভাই তখন ইত্তেফাকের অর্থনৈতিক রিপোর্টার। তিনি পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব তা সবিস্তারে লিখতেন। সে সময় এখনকার মতো তথ্যপ্রযুক্তির এত ব্যবহার ছিল না। ছিল না এত ধরনের মেলা বা সেমিনার। কিন্তু নাজিম উদ্দিন ভাই যেকোনো উপলক্ষ করে প্রায় নিয়মিত তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে লেখালেখি করতেন।

১৯৯৫-৯৬ সালের মধ্যভাগে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এ দেশে আসেন। তাঁদের নিয়েও নাজিম উদ্দিন ভাই বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশ করেন। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদদের ভেতরে দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

এ সময় বাংলাদেশ কম্পিউটার সাংবাদিক সমিতি নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আর এর সভাপতি হিসেবে নির্বাচন করা হয় নাজিম উদ্দিনকেই।

অসুস্থতায়ও মনোবল তুঙ্গে

প্রচণ্ড পরিশ্রমী নাজিম উদ্দিন দেশের যেকোনো বিপদাপদে এগিয়ে যেতেন সব সময়। ১৯৯৮ সালে বন্যার সময় কাজ করতে করতে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর ডান দিক অবশ হয়ে যায়। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। কর্মস্থলে যেতেন একজন সহকারী নিয়ে। তিনি বলতেন আর সহকারী লিখতেন। এভাবেই তিনি তাঁর নিয়মিত কাজ চালিয়ে গেছেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

নাজিম উদ্দিন মোস্তানের পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর জেলার সুকদি গ্রামে। জন্ম ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। বাবা হাফিজউদ্দিন, মা সায়েরা খাতুন। পড়ালেখার শুরু নিজ গ্রামে। প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রাম থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

চট্টগ্রামের দৈনিক সমাচার পত্রিকায় প্রুফ রিডারের চাকরি দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু। তারপর ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে বাংলাবাজারে একটি প্রকাশনা সংস্থায় প্রুফ রিডারের কাজ করেন। এরপর দৈনিক পয়গাম পত্রিকায় সহসম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংবাদ ও ১৯৭৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে সহসম্পাদক পদে কাজ শুরু করেন।

সহজ ভাষায় বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে লেখালেখির জন্য ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স সর্বপ্রথম তাঁকে সম্মানিত করে। প্রযুক্তিবিষয়ক পত্রিকা কারিগর তাঁকে ১৯৯০ সালে সাংবাদিকতায় অবদান রাখায় পদক প্রদান করে। সমাজ কল্যাণ সংঘ তাঁকে পুরস্কৃত করে। তিনি রোটারি ক্লাব অব রমনার পদকও পান।

সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখায় ২০০৩ সালে তিনি লাভ করেন একুশে পদক। একই বছর বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ও বিসিএস কম্পিউটার সিটি তাঁকে আজীবন সম্মাননা জানায়।

ভূঁইয়া ইনাম: প্রতিষ্ঠাতা মাসিক কমপিউটার বিচিত্রা

সৌজন্যে: প্রথম আলো।