গণমাধ্যমকর্মীদের টার্গেট, দায়ি সম্পাদকীয় নীতিমালা

রবিবার, নভেম্বর ৩, ২০১৩

:: মোরশেদ তালুকদার ::

Morshed Talukdarইদানিং হঠাৎ করেই গণমাধ্যমকর্মীদের উপর বিভিন্ন মহলের আক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাবখানা এমন, গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে রাজনৈতিক দলগুলোর হরতালসহ বিভিন্ন সভা-সমাবেশে সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ করা এদের দলীয় কর্মসূচীরই অংশ। তা না হলে প্রায় প্রতিদিন চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হতেন না। বিষয়টি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার কাছে কষ্টের।

তবে কেন জানি মনে হয়, এভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ি। দেশের গত এক বছরের রাজনীতিসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের আলোকে বলা যায়, অনেক আগেই আমরা লক্ষবস্তুতে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। একটু দেরিতে টার্গেট করেছে সে আমাদের ভাগ্য।

এটা কি অস্বীকার করার উপায় আছে, দেশের চলমান সংকটসহ বিভিন্ন আলোচিত মুহূর্তে গণমাধ্যম কর্মীদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। গণমাধ্যম কর্মীরা কি আসলেই নিরপেক্ষ ছিল? পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে এসে আমরা কি মাঝে-মধ্যে একটু হলেও পক্ষপাতিত্ব করছিনা বা করিনি? তা ছাড়া নিজে নিরপেক্ষ থাকতে চাইলেও কর্তৃপক্ষের বাইরে যাওয়ার সুযোগ তো আমাদের নেই। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া গণমাধ্যমগুলো কোন না কোন ভাবে সর্ম্পূণ নিরপেক্ষ থাকতে পারছেন না। ফলশ্রুতিতে, রোষানলের শিকার হচ্ছি আমরা যারা মাঠে থাকি তারা।

গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটা সভা-সমাবেশ ও হরতাল চলাকালে মাঠে গিয়ে যা দেখেছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারীরা নির্দিষ্ট কয়েকটি গণমাধ্যমকর্মীদেরই খোঁজ করেন। আবার এর উল্টোপিঠে দেখেছি, যেসব গণমাধ্যমকর্মীদের খোঁজ করছেন, ওইসব গণমাধ্যমে একটু অতি-উৎসাহী হয়ে ভিন্ন ধরনের সংবাদ প্রচার বা প্রকাশ করতে গিয়ে কিছুটা মিথ্যাচারও করছেন। এর জন্য আামি মাঠে থাকা গণমাধ্যমকর্মীটাকে দায়ি করি না। কর্তৃপক্ষের চাওয়া পূরণ করতে গিয়েই তিনি অমনটি করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল হেফাজতে ইসলামের কর্মকান্ড। রাজধানীর শাপলা চত্বরে কি হয়েছিল তা আমার প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয় নি। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের ওয়াসার মোড়ে তাদের যে অবস্থান কর্মসূচী ছিল তা আমি দেখেছি। সেদিন ওরাও কয়েকটা মিডিয়া কর্মীকে আক্রমণ করেছিলেন। আমারই চোখের সামনে লাঞ্চিত করেছিলেন (আমরা তখন এর প্রতিবাদ করেছিলাম) চট্টগ্রামের প্রভাবশালী একজন টিভি রিপোর্টারকে যিনি একসময় দেশের প্রভাবশালী একটি পত্রিকায় দাফটের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এ সময় হেফাজত কর্মীদের অভিযোগ ছিল, ওই টিভিতে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে হেফাজত কর্মীরা কয়েক জায়গায় ভাঙচুর চালিয়েছে। যদিও তখন পর্যন্ত তারা কোন ভাঙচুর করে নি।

হেফাজতের এ সমাবেশে আরেকটি টিভি চ্যানেলের রিপোর্টারকে খুঁজেছিলেন হেফাজত কর্মীরা, যেই টিভি চ্যানেলে সংবাদ প্রচার হয়েছিল সমাবেশে লোক সমাগম তেমন হয় নি। স্বাভাবিকভাবে এমন মিথ্যাচারের জন্য ওদের হামলার লক্ষ্যে পরিণত হওয়া কি অবাক করার মতো! ওই গণমাধ্যমটির উপর একই অভিযোগ ছিল গত ২৫ অক্টোবর। নগরীর কাজীর দেউড়ী মোড়ে বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের কর্মসূচী চলছিল। সমাবেশ চলাকালে কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল শিবির কর্মী ওই টিভি চ্যানেলটির নাম ধরে খোঁজ করছিল। পরে ওই শিবির কর্মীরা কোন কারণ ছাড়াই অতর্কিতভাবে হামলা করে পেশাগত দায়িত্বপালনকারী সাংবাদিকদের উপর। এতে আহত হন বাংলাভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান নাসির উদ্দিন তোতা, এটিএন বাংলার স্টাফ রিপোর্টার আবুল হাসনাত ও ক্যামেরাম্যান ফরিদউদ্দিন।

এখন প্রশ্ন আসুক, হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু গণমাধ্যম কর্মী তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ আমলে নিচ্ছেন না কেন? কেনই বা তারা অত বিপ্লবী হয়ে উঠছেন। এর কারণ হিসেবে তারা ব্যাখ্যা করেন, আমরা সততা, নিরপেক্ষ এবং দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছি। যদি সততা এবং দায়িত্বশীলতার কথা আসে তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, অন্য গণমাধ্যমকর্মীরা কি নিরপেক্ষ নন? অন্যরা কি অসৎ? অন্য সংবাদকর্মীরা কি দায়িত্বশীল নন?

আসলে বিষয়টা তা নয়। প্রকৃত অর্থে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোর সম্পাদকীয় নীতিমালার জন্যই এমনটি হয়ে থাকে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতিমালা তো আর এক নয়। সুতরাং আমি-আমরা যে সংবাদকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করবো তা হয়তো অন্য গণমাধ্যমে ইতিবাচক হিসেবেই প্রচারিত বা প্রকাশিত হবে। এভাবে ভিন্নতর হতে হতে আমরা আস্থা হারাচ্ছি রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন মহলের। এমনকি একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পেয়ে আমাদের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সাধারণ লোকজনও।

তাই আমি জোর গলায় বলতে পারি, গণমাধ্যম কর্মীদের উপর হামলা ততদিন বন্ধ হবে না যতদিন আমরা অনিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকবো না। আর এ অনিরপক্ষেতা দূর করতে পারে একমাত্র সম্পাদকীয় নীতিমালায়। তাই আমরা যারা প্রতিনিয়ত রাস্তাঘাটে অতর্কিত হামলার শিকার হচ্ছি তাদের এখন একটাই দাবি হওয়া উচিত, প্রতিষ্ঠানের মালিক যেই আদর্শই লালন করুক না কেন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংবাদকর্মীদের উপর যেন ওই আদর্শ ছাপিয়ে দেয়া না হয়।

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম।