মফস্বল সাংবাদিকতায় বিভক্তি

মঙ্গলবার, অক্টোবর ৮, ২০১৩

:: শাহেদ ইমরান মিজান ::

mizan picসংবাদমাধ্যমকে একটি দেশের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আর সংবাদমাধ্যমের কারিগর অর্থাৎ সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। চিত্রে চতুর্থ স্তম্ভ হলেও সংবাদপত্র হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল সমন্বয়ক। সংবাদপত্রেই চিত্রিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঠিক দিকনির্দেশনা। স্বল্প সময়ের কর্ম জীবনে কিঞ্চিতসম সাংবাদিকতা চর্চা থেকে এটা আমার উপলদ্ধি। তবে শ্রদ্ধেয় অগ্রজদের ভাষ্য মতে, সাংবাদিকতার সেই গৌরবময় প্রভাব বর্তমানে ম্লান হয়ে পড়েছে। সাংবাদিকতার সামনে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন!

দিনে দিনে নানা কারণে সাংবাদিকতায় বিরাজ করছে নানা অস্থিরতা। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে বিভক্তি। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় শুরু থেকেই ডান-বাম বিভক্তি ছিল। তবে ছিল না যুগপৎ বিভক্তি বা অন্তকোন্দল। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সাংবাদিকতায় বিভক্তি ঢুকে গেছে। আশঙ্কার বিষয়, জাতির বিবেকদের এ বিভক্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে মফস্বলে। এমনিতে নানা সমস্যার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আসছে সাংবাদিকতার প্রাণখ্যাত মফস্বল সাংবাদিকতা।

বিভক্তির বলি হয়ে মফস্বল সাংবাদিকতা আজ কতটা বিপন্ন তা কক্সবাজার জেলার প্রেক্ষাপট দিয়েই চিত্রায়ণ করতে প্রয়াস করছি। প্রেসক্লাব হচ্ছে কর্মরত সাংবাদিকদের আশ্রয়স্থল। বলা যায় শেষ ঠিকানাও। উপজেলা যেহেতু একটি নির্দিষ্ট গন্ডি, সে বিবেচনায় জেলা প্রেসক্লাব ছাড়াও উপজেলায় একটা প্রেসক্লাব থাকবে এটা স্বাভাবিক। প্রেসক্লাবের বাইরে ভিন্ন ভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন থাকতে পারে। তবে একের অধিক প্রেসক্লাব জার্নালিজম আইনে অবৈধ। কিন্তু বর্তমান কক্সবাজার জেলার সব উপজেলার প্রেক্ষাপট এর ভিন্ন। দু’য়েকটি ব্যতিত অন্যসব উপজেলাতেই রয়েছে একের অধিক প্রেসক্লাব। এর আক্ষরিক ভাষা ভিন্ন হলেও প্রেসক্লাব নামটি অনায়সে জুড়ে দেয়া হয়েছে। জবাবদিহিতার কোন বালাই নেই কারও। উদাহরণ হিসাবে দেখানো যায়, পেকুয়া উপজেলাকে। ছোট্ট এ উপজেলায় রয়েছে সর্বোচ্চ তিনটি প্রেসক্লাব। পেকুয়া প্রেসক্লাব, উপজেলা প্রেসক্লাব পেকুয়া ও উপকূলীয় প্রেসক্লাব পেকুয়া। সম্প্রতি অনলাইন সাংবাদিকদের একটি সংগঠনের কমিটি গঠন উপলক্ষে পেকুয়া যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে সুবাদে মফস্বল সাংবাদিকতার নানা দিক জানার পাশাপাশি জানা গেছে, মফস্বল সাংবাদিকতার বিভক্তির কারুণ কাহিনীও।

বিভক্তির পেছনে নানা কারণের মধ্যে মূল কারণ-প্রেসক্লাবের পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ, নবীন-প্রবীণ ইস্যু ও আধিপত্য বিস্তার অন্যতম। এখানে একে অপরকে দোষ চাপালেও বিভক্তির জন্য কমবেশী সবাই দায়ী। কিছুটা আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য পেকুয়ার প্রেসক্লাবে সাংবাদিক রয়েছে মাত্র ১২ জন। কাকতালীয় আরেকটি বিষয় হচ্ছে প্রতি ক্লাবেই রয়েছে ৪জন। আশার আলোর দুয়েকজন মহৎ প্রাণ সংবাদকর্মীও আছে।

মফস্বল সাংবাদিকতায় বিভক্তির ফলে সাংবাদিকদের মধ্যেই ঘটে থাকে নানা অপ্রীতিকর কান্ড। নিজেদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। পাল্টাপাল্টি বাকযুদ্ধ (ঝগড়া!) ও কুৎসা রটনা নিত্য ঘটনা। পাবলিক প্রোগ্রামেও পাল্টাপাল্টি অবস্থান আশ্চর্য্যজনক নয়, তাদের জন্য। জনসম্মুকে জাতির বিবেকদের লঙ্কাকান্ড দেখে কী ভাবে সাধারণ মানুষ? সে দিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই।

অন্যদিকে বিভক্তির কারণে চরম ক্ষতি হচ্ছে দেশ ও মানুষের। যেমন- সাংবাদিকদের এ বিভক্তির সুযোগ লুফে নেয় দুর্নীতিবাজ ও অপরাধী চক্র। তারা অনায়াসে সাংবাদিকদের এক পক্ষকে হাত করে নিতে সক্ষম হয়। দেখা গেল কি, সত্য ঘটনা নিয়ে এক সন্ত্রাসীর বিরুদ্বে নিউজ করলো এক পক্ষের সাংবাদিকরা। পরে ওই অপরাধ সংঘটক সন্ত্রাসীকে মহা সাধু বানিয়ে মিথ্যা নিউজ করলো অন্য পক্ষ। এ ঘটনায় কি বুঝল আমজনতা? একেতো পার পেয়ে গেল ভয়ংকর সন্ত্রাসী অন্যদিকে আড়ালে পড়ে গেল সত্য ঘটনা। কি পেল জাতি?

তেমনিভাবে এ সুযোগ হাতছাড়া করে না সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারি ও জনপ্রতিনিধিরা। তারা দেঁদারছে করছে ‘পুকুর চুরি’। পত্রিকায় নিউজ হয়- ‘ওসির নেতৃত্বে অভিযান: বিপুল গাঁজাসহ আটক ১।’ চেয়ারম্যান কাজ না করেই মেরে দেয় কাবিখা প্রকল্পের সব টাকা। নিউজ হয় ‘চেয়ারম্যানের আন্তরিক প্রচেষ্টায় গ্রামীণ সড়কের মেরামত’। এ হচ্ছে লাভ ক্ষতির হিসাব। সব মিলিয়ে বেড়ে যায় দুর্নীতি, অপশাসন ও সন্ত্রাস। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ সাংবাদিকতার মতো মহান পবিত্র পেশাকে অবজ্ঞা-অবমূল্যায়নের সুযোগ পায়। হেয় প্রতিপন্ন ও অবহেলার পাত্র হয় জাতির বিবেক সাংবাদিক। দেশ-সমাজ এগিয়ে যায় ধ্বংসের অতল গহ্বরের দিকে।

অনায়সে বলা যায়, বর্তমানে মফস্বল সাংবাদিকতা ধ্বংসের শেষ সীমানায় পৌঁছেছে। অনেক গেছে এখন থামানো দরকার। সব ঝড় থামিয়ে ফিরে আনতে হবে গৌরবময় ঐতিহ্য। এ জন্য প্রয়োজন জাতির বিবেকদের ইস্পাত কঠিন ঐক্য। সাংবাদিক নেতাদের উচিত এখনই উদ্যোগ নেওয়া।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, কক্সবাজার।