গণমাধ্যমে আশা-আকাঙ্ক্ষা

বৃহস্পতিবার, ১৪/০২/২০১৩ @ ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ

রাজীব নন্দী:
বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক—সকল প্রকার শোষণমুক্তির স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে দেশব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে এই দেশ স্বাধীন হয়। পাকিস্তানি শাসকের স্থানে ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ও বাঙালি ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সেই থেকে আজ অব্দি জরুরি ক্ষমতা আইন, প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেসন্স আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন—ইত্যাদি নানা আইনের ফাঁক গলে গণমাধ্যমের বিকাশ হয়ে আসছে। ‘বিকশিত’ গণমাধ্যম পার করল একচল্লিশটি বছর।

newsmediaএকচল্লিশ বছরের আমলনামা লিখতে বসেছি। ইত্তেফাকের এই আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে, প্রজন্মের স্বপ্ন ও বাস্তবতা’। বিজয়ের ৪১ বছরে মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুফল, সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার কথা থাকবে এ আয়োজনে। গণমাধ্যম নিয়ে একটি লেখা, যেখানে থাকবে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা, বিকাশ, সমস্যা, সুফল, ব্যর্থতার একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন। আজ বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, বাঙালি জাতির মুক্তি অর্জনের এই গৌরবময় মুহূর্তের অন্যতম অংশীদার সংবাদপত্র। কোটি মানুষের স্বপ্নলালিত দেশটির উন্নতি-অবনতির আমলনামা প্রচার করতে করতে এ দেশের সংবাদপত্রও হয়ে উঠেছে প্রাপ্তবয়স্ক। জাতির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে সংবাদপত্রের ভূমিকা আজও অমলিন। তবে সংবাদপত্র তার নিজের দায়িত্ব পালনে কতটুকু সার্থক, তা বিচারের সাথে সাথে এটাও বিচার করা দরকার—আগামীর বাংলাদেশে আমরা কেমন সংবাদপত্র চাই।

দুনিয়ার ‘সবকিছুকে’ একসাথে পাঠকের সামনে এনে সেই পাঠককে দুনিয়া থেকেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলার এক মোক্ষম প্রাযুক্তিক হাতিয়ার ‘গণমাধ্যম’। গণমাধ্যমের খসখসে কাগুজে সংস্করণ ‘সংবাদপত্র’কে একজন প্রথাবিরোধী সাহসী উচ্চারক হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘বাচাল মুদ্রণযন্ত্রের বাচালতম সন্তান’। সংবাদপত্রের অব্যর্থ মনোভাবকে তিনি বলেছিলেন, ‘দরোজার তলদেশ দিয়ে মনসার প্রতিনিধির মতো আসে সংবাদপত্র: সমকালের সমস্ত বিষ নিয়ে, তার দ্বারা নিজেকে সুচারুরূপে সংক্রমিত করার পর সুস্থ বোধ করে সংবাদ নেশাগ্রস্ত মানুষ’ (বাঙলা সংবাদপত্র ও তার ভাষা; আধার ও আধেয়: হুমায়ুন আজাদ)।

আজ আমার মনে পড়ছে কবিগুরুর সেই উক্তি—’দূরের সহিত নিকটের, অনুপস্থিতের সঙ্গে উপস্থিতের সম্বন্ধ পথটা সমস্ত দেশের মধ্যে অবাধে বিস্তীর্ণ হইলে তবেই তো দেশের অনুভব শক্তিটা ব্যাপ্ত হইয়া উঠিবে। মনের চলাচল যতখানি, মানুষ ততখানি বড়ো। মানুষকে শক্তি দিতে হইলে মানুষকে বিস্তৃত করা চাই।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন কথাটি বলছেন, তার অনেক বছর পর সংবাদপত্র সভ্যতার একটি প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠেছে। আমরা যাবতীয় সংবাদ জানতে সক্ষম হই গণমাধ্যম, বিশেষ করে সংবাদপত্রের মাধ্যমে। তাই সংবাদপত্র আমাদের বর্তমান জীবনের এক অপরিহার্য সঙ্গী।

অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরও বহু ক্ষেত্রে নবীন প্রজন্মের সাংবাদিকেরা থেকে যায় কৃত্রিমতার দাস। যদিও গণমাধ্যমে, বিশেষ করে সংবাদপত্রে ফিচারের মান বেড়েছে বহুগুণ। ফিচার সম্পাদকের অধীনে একাধিক ফিচার সহ-সম্পাদক, পেজ ইনচার্জ কাজ করছেন। আকারে ও প্রকারে সংবাদপত্রের গুণগত ও পরিমাণগত মান দুই বেড়েছে। উচ্চশিক্ষার বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই সাংবাদিকতার সুযোগ মিলছে। পূঁজির বিকাশ হওয়ায় ব্যবসায়ও সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটেছে হাতধরাধরি করে। নগরায়ণের ব্যাপক প্রভাবে পরিবেশ-সাংবাদিকতাও বিকশিত হয়েছে পত্রপুষ্পপল্লবে। সংবাদপত্রের প্রকৌশলগত উন্নতি হয়েছে ঢের। জাতীয় দৈনিকের সংস্করণ এখন চট্টগ্রামের প্রেস থেকে ভোরের আগেই পাঠকের দরবারে হাজিরা দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাধীনতার পর এই দীর্ঘ সময়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বড় পরিবর্তন এসেছে পৃষ্ঠাসজ্জা ও বৈচিত্র্যে। একঘেয়ে সাদাকালো পৃষ্ঠাসজ্জার বদলে স্থান করে নিয়েছে ঝকঝকে আকর্ষণীয় পৃষ্ঠাসজ্জা।

সমাজের আরও দশটি ভোগ্যপণ্যের মতো সাংবাদপত্রকেও এখন বাজারে পাঠকদের সন্তুষ্টির জন্য লড়ে যেতে হয়। সংবাদপত্রকেও যেকোনো পণ্যের মতো বিজ্ঞাপিত হতে হচ্ছে। মিডিয়া যতই মুষ্টিমেয় ধনী ও ক্ষমতাশালীর মালিকানাভুক্ত ও নিয়ন্ত্রণাধীন হোক না কেন, টিকে থাকার তাগিদেই তাকে জনসাধারণের মধ্যে পাঠক খুঁজে নিতে বাধ্য হতে হয়। কারণ পাঠকই শেষ পর্যন্ত তার ‘প্রাণ’! আজ থেকে বিশ বছর আগেও সংবাদপত্রের কাজ ছিল তথ্য জ্ঞাপন। এখন সংবাদপত্রের দায়িত্ব বেড়েছে। সমাজসেবায় প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সংবাদপ্রতিষ্ঠান।

সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার জন্য ব্যবসা করাও বেশ জরুরি। আর সেই ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে দর্শক, শ্রোতা বা পাঠক। তাদের সঙ্গে এক অলিখিত চুক্তিতে সংবাদমাধ্যম জড়িয়ে পড়ে। পাঠক শ্রোতার জানার আগ্রহ থাকতে পারে, তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন সব খবর, সম্ভাব্য সকল বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও সংবাদমাধ্যম দর্শক-পাঠককে জানাবে। কিন্তু সেখানে যদি বিজ্ঞাপন ভাগ বসায় তবে তা হয়ে পড়ে পাঠককে বিক্রি করে দেয়ার নামান্তর। ‘সাংবাদিকতার দ্বিতীয় পাঠ’ গ্রন্থে আমার শিক্ষক আলী আর. রাজী বলেন, ‘এখানে সাংবাদিকতার শুরুই হয়েছে ক্ষমতা চর্চার অংশ হিসেবে। যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা, আর যারা ক্ষমতায় যেতে চান তারা, এই সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে চলেছেন নিজেদের স্বার্থে’। রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে বহুপাক্ষিক বাণিজ্যিক স্বার্থ আর অলিখিত চুক্তি কিংবা উেকাচ গণমাধ্যম গ্রহণ করায় সাংবাদপত্রের পৃষ্ঠা সহায় বিজ্ঞাপন আধিক্য পাঠকচোখকে বিরক্ত করে। স্বাভাবিক পৃষ্ঠাসজ্জায় নান্দনিকতায় ঘাটতি তৈরি করে চলছে।

এখনো আমাদের দেশের অসংখ্য পাঠক খবরের কাগজের মুদ্রিত অক্ষরই বেশি বিশ্বাস করে। ছাপার অক্ষরের এই গুরুত্ব যেমন পাঠক-দর্শককে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে, তেমনি বস্তুনিষ্ঠ তথ্যে পাঠক শিক্ষিতও হয়। কিন্তু এখনকার সাংবাদিকেরা ‘ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ’-তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে পড়ছেন কি না, তা-ও ভাবার বিষয়। বৃহত্ রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের চেয়ে একজন কৃষকের জীবনী কিংবা একজন সত্ মানুষের প্রচারণা সমাজের জন্য অনেক বেশি মঙ্গলজনক—গণমাধ্যমকেও এ কথা বুঝতে হবে।

দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত অবস্থা, সমস্যা-সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের মত ও পথ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের চিত্র তুলে ধরাই প্রকৃত গণমাধ্যমের চরিত্র হওয়া উচিত। কিন্তু এই বাজারযুগে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, পেশিশক্তি, সামপ্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির সাথে আপোস, শাসনকাঠামোর বিশ্বস্ত ভাগীদার আর দ্বি-দলীয় বুর্জোয়া রাজনীতির সাথে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা জুতসই নিয়ন্ত্রণমূলক থাকলে সেই গণমাধ্যম ‘গণমানুষের’ চিন্তা-স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আর রাজনৈতিক চৈতন্য যথাযথ ধারণ করতে ব্যর্থ হবে—এটাই স্বাভাবিক। তৃতীয় বিশ্বের এই বাংলাদেশে দেশ মারী, মড়ক, পাহাড়ধস, বন্যা, খরা, দুর্যোগের বলয়ে বন্দী এই দেশমাতৃকা ভীষণ অসহায়। তাই এখানে সাংবাদিকদের দায়িত্বও প্রচুর। নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর শেষ আশা হিসেবে সংবাদপত্রকে মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, রাজনৈতিক অপশক্তি, সেনা কর্তৃত্ব, সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর পর গণমাধ্যমের আমলনামায় এটাই আমার শেষ আকুতি—সাংবাদিকেরা যেন দলগত স্বার্থচিন্তায় বিভোর থেকে সংবাদ পরিবেশন না করেন। সত্যনিষ্ঠ, নিরাসক্ত, নির্ভীক ও কঠোর সমালোচক-সাংবাদিক যেন স্বাধীনতার স্বপ্নস্বাদ সম্পূর্ণ উপভোগের আশায় লড়াইয়ের ময়দানে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। সংবাদপত্রকে কেন্দ্র করে নানাভাবে, দেশে ও দেশের বাইরে মতবিনিময়ের সুযোগ যেন অব্যাহত থাকে। সত্যের অবিচল প্রতিষ্ঠাযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা সংবাদপত্রের সকল কর্মীই হয়ে উঠুক আপোসহীন সাংবাদিক ও গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবিতার সৈনিক।

লেখক :শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়