রাজনৈতিক বিবেচনায় প্লট প্রাপ্তি ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৩

:: আরিফুর রহমান ::

Ariful Islamআমি তখন প্রথম আলোর রাজনৈতিক প্রতিবেদক। বিএনপির হাঁড়ির খবর বের করাটা আমার প্রধান কাজ। ক্ষমতাসীন বিএনপির তাবড় প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে অনায়াসে সখ্য গড়ে তুলেছি ততদিনে। মান্নান ভূঁইয়া থেকে তরিকুল ইসলাম। আর সাদেক হোসেন খোকা থেকে মির্জা আব্বাস। সবাই খুব ভালো করে চেনেন আমাকে, ভালো জানেন। এতটাই, যে দলের নেতাকে অপেক্ষায় রাখা যাবে কিন্তু আরিফুর রহমান দেখা করতে চাইলে যেন ওয়েটিং রুমে বসতে না হয়। এমন নির্দেশও দু’একজন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতা তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের দিয়ে রেখেছিলেন। প্রতিদিন কোন না কোনো বড় নেতা, মন্ত্রীর সাথে আড্ডা হয়। গল্পোচ্ছলে বের করে আনি ভেতরের নানা খবর। সরকারের ভেতরে কোথায় কি হচ্ছে সহজে জেনে যাই। বিএনপির ভেতরে কি চলছে, এসব তথ্যও অনায়াসে পেয়ে যাই। প্রায় প্রতিদিনই সরকার ও বিএনপির দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিশেষ বিশেষ খবর ছাপা হতে থাকে প্রথম আলোর প্রথম পাতায়। বিএনপির অনেকেই অখুশি হন। কারণ ওইসব খবরে সরকার আর দলের নেতিবাচক দিকটাই উঠে আসতে থাকে। তবে দু’একজন নীতিনির্ধারক খুশিও হন। কারণ তাঁরা চাইছিলেন সরকার ও দল কার্যত বিপথে যেন না যায়। বরং এসব খবরে যেন সতর্ক হয়।

ওই সময়কার প্রেক্ষাপট আমার জন্যে এমন ছিল যে অনায়াসেই দু’একজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের মন্ত্রীর আনুকূল্য নিয়ে একটি সরকারি প্লট পেতে পারতাম। উত্তরা কিংবা পূর্বাচলে। আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু অন্তত পেয়েছেন। তৎকালীন পূর্ত মন্ত্রী মির্জা আব্বাস মোটামুটি সাংবাদিক বান্ধব। ঠিক করলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে যারা বিএনপি বিট করেন তারা যেন প্লট প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত না হন। প্রথম আলো সবচেয়ে বড় কাগজ। সেই কাগজের বিএনপি বিটের রিপোর্টার আরিফুর রহমানকে চায়ের দাওয়াত দেওয়া হলো। মাধ্যম, আরেকজন সাংবাদিক। যিনি এখন নিয়মিত টকশো করেন। উপলক্ষ্য জানতে চাইলে বন্ধুবর বললেন, মন্ত্রী জানতে চান আমি উত্তরা না পূর্বাচল কোনটা প্রেফার করছি। বললাম, কোনটাই না। অবাক হয়ে সাংবাদিক বন্ধু তির্যক সুরে বললেন, ফাইজলামি রাখেন। পূর্ত মন্ত্রীর সঙ্গে চা খেতে হবে এবং তাঁকে প্লটের আবেদনের কথা জানাতে হবে। বাকি কাজ করবেন শহীদ ভাই। শহীদ আলম, তখন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (উন্নয়ন)। পরে রাজউকের চেয়ারম্যান ও পূর্ত সচিব হয়েছিলেন। শুভাকাঙ্খী সাংবাদিক বন্ধু বিভিন্ন সময় পীড়াপীড়ি করেছেন। প্লটের আবেদনতো করিইনি, পুরো মেয়াদে আর পূর্ত মন্ত্রীর ছায়া মাড়াইনি।

প্রিয় সম্পাদক মতিউর রহমান ওই সময় প্রথম আলোর সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেছিলেন, সরকারি কোনো আনুকূল্য নেওয়া যাবে না। এমনকি সরকারি প্লটও নয়। সম্পাদকের কথা আমার কাছে শিরোধার্য। আমি আবেদন করিনি। অনেক পরে জানলাম প্রথম আলোতেই আমার কয়েকজন সহকর্মী আবেদন করে লটারিতে প্লট পেয়েছেন। মতি ভাই অবশ্য তখন আর আপত্তি করেননি। যারা নিয়মানুযায়ী প্লট পেলেন আমরাও তাদের অভিনন্দন জানিয়েছিলাম।

বর্তমান সরকারের একেবারে শুরুর দিকে উত্তরা ও পূর্বাচলে রাজউক বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্লট দেয়। ঢাকা শহরে জমি বা ফ্ল্যাট থাকলে উত্তরায় প্লট নেওয়া যাবে না। এই শর্ত ছিল। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এমনকি জামায়াতে ইসলামীর একাধিক সংসদ সদস্যও মিথ্যা হলফনামা দিয়ে প্লট নিয়েছেন। প্রথম আলোতে এনিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছি। অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির কথা তুলে ধরে একাধিক ফলোআপ প্রতিবেদনও করেছি। ওই সময়ে আমরা প্রথম আলোর অনেক সাংবাদিকও আবেদন করি। এর মধ্যে লটারিতে সম্ভবত দু’জন প্লট পান। একজন পূর্বাচলে আরেকজন উত্তরায়। কিন্তু লটারিতে না পেয়ে সরকারের বিশেষ আনুকূল্যে প্রথম আলোর অরাজনৈতিক বিটের রিপোর্টারও পূর্বাচলে প্লট নিয়েছেন। শুনেছি দোর্দন্ডপ্রতাপ এক প্রতিমন্ত্রী এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। ওই প্রতিমন্ত্রীর নেতিবাচক ভাবমূর্তি সর্বত্র আলোচিত। আমার প্রিয় সম্পাদক মতিউর রহমানকে জানিয়ে রাখা জরুরি লটারিতে প্লট না পেয়ে রাজনৈতিক কানেকশন ব্যবহারের চেষ্টা করিনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আনুকূল্য পেতে এই মন্ত্রী, ওই মন্ত্রী আর আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিক নেতাদের পিছু পিছু দৌড়াইনি। এনিয়ে ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধুরাও এখনো বলেন। বলেন, তোমার যে যোগাযোগ তা কাজে লাগিয়ে তো অন্তত একটি প্লট নিতে পারো। ভবিষ্যতে অনেক কাজে লাগবে। মন্ত্রিসভার অত্যন্ত প্রভাবশালী এক সদস্য আমার আত্মীয় বলে এই ধারণা তারা করেন। আবার আমলাতন্ত্রের ভেতরে যারা প্রভাবশালী বলে খ্যাত তাঁদের সঙ্গে পেশাগত কারণে ঘনিষ্ঠতা এবং আওয়ামী লীগের অনেক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে জানাশোনার কারণেও শুভাকাঙ্খীরা এরকম পরামর্শ দেন। আমি শুনি। এরপর বলি, তাই যদি করবো তাহলে আর প্রতিবাদী হলাম কেন? প্রথম আলোতেই তো অনায়াসে পুরো পেশাগত জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম। পারতাম বাংলাদেশ প্রতিদিন কিংবা আমাদের সময়েও দীর্ঘদিন থাকতে। ইচ্ছে হয়নি। বিস্ময়কর হলো, পদে পদে আপসকামীদের কেউ কেউ চুপচাপ থেকে নিজের আখের গোছাচ্ছে। আর পেশায় সহজভাবে সত্য কথা লেখা ও বলিয়েদের চরিত্র হননের চেষ্টা করছে নানা কৌশলে।

প্রথম আলোর সচিবালয় বিটের এক সময়কার দাপুটে রিপোর্টার শ্যামল সরকার এখন ইত্তেফাকে। দুইটি বাস নিয়ে রাজধানীতে তাঁর পরিবহণ ব্যবসা পরিচালনার জন্যে বিভিন্ন সময় নানা নেতিবাচক মন্তব্য তাঁকে হজম করতে হয়েছে অফিসের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে। আবার প্রথম আলোরই শিক্ষা বিটের রিপোর্টার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকাশনা ব্যবসা, বেসরকারি শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্টের প্রকাশনা ব্যবসার সঙ্গে বিভিন্ন সময় জড়িত থেকে অফিসের কর্তাব্যক্তিদের কাছে সমাদৃত হয়েছেন। সংসদ ও জাতীয় পার্টির অনেক হাঁড়ির খবর অনায়াসে তুলে আনতেন আশিস সৈকত (এখন ইত্তেফাকে)। তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানে এইচ এম এরশাদ গিয়েছিলেন। কেন এরশাদ গেলেন? এজন্য অনেক কটু কথা বলা হয় আশিস দা’কে। বলা হয়, এরশাদের মতো স্বৈরাচারের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক চলেনা। অথচ তারা কখনো বলেননি, কেন এরশাদের চেয়েও শতগুণ দুষ্ট তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের সঙ্গে কেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা হতো? এই ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি জাতীয় পার্টি বিট করে কেন এইচ এম এরশাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা অন্যায় হবে? আওয়ামী লীগের অন্দরমহলে দারুণ যোগাযোগ ছিল প্রণব সাহার। এখন এটিএন নিউজের আউটপুট এডিটর। এক সময় প্রথম আলোর চিফ রিপোর্টারও ছিলেন। চিফ রিপোর্টারের পদ ছাড়ার পরে ‘আউট স্পোকেন’ প্রণব দা’কে আবার সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করে বিশেষ প্রতিনিধি পরে নগর সম্পাদক হতে হয়েছিল। ঠান্ডা মাথায় চিফ রিপোর্টারের ঝক্কি অনায়াসে সামলাতেন প্রভাষ আমিন। দারুণ সদালাপী, খুব ভালো লেখার হাত। রিপোর্টারের বিপক্ষে যায় এমন তথ্য সাধারণত দিতেন না কর্তা ব্যক্তিকে। সেই প্রভাষ আমিনও এক সময় প্রথম আলো ছেড়ে এনটিভিতে যোগ দেন। আপাদমস্তক ভদ্রলোক আমীরুল ইসলাম টোকন ভাই ছিলেন প্রথম আলোর শুরুর দিকের চিফ রিপোর্টার। জ্বালানি বিটের খুব ভাল রিপোর্টার ছিলেন। অতৃপ্তি নিয়েই প্রথম আলো ছেড়েছেন টোকন ভাই। শওগাত আলী সাগর প্রথম আলোর অর্থনীতি বিটের প্রধান ছিলেন। সাগর ভাই খুব ভালো লিখতেন, বলতেনও ভালো। ভালো যোগাযোগ ছিল সব মহলে। প্রথম আলো ছেড়ে সাগর ভাই কানাডায় থিতু হয়েছেন। খালেদ মুহিউদ্দীন, গোলাম কিবরিয়া, জাহিদ হোসেনও প্রথম আলোর খুব ভালো রিপোর্টার ছিলেন। খালেদ প্রথম আলো ছেড়ে যান বিডি নিউজে। কিবরিয়া, জাহিদ গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করে এমন একটি এনজিওতে যোগ দেন। তিনজনই অবশ্য এখন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কাজ করছেন। প্রথম আলোর আরেক রাজনৈতিক রিপোর্টার ওয়াসেক বিল্লাহ জামায়াতে ইসলামী বিটে ভিন্নতা এনেছিলেন। তিনিও প্রথম আলো ছেড়েছেন। তালিকটা অনেক লম্বা।

২০১০ সালের মার্চে আমি প্রথম আলো ছেড়ে তখন প্রকাশিতব্য বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ যোগ দেই। আচমকাই। আসলে প্রথম আলোতে ততদিনে পুরনোদের প্রয়োজন কমে এসেছে। এটাকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। আওয়ামী লীগের পুরনোরা সংস্কারপন্থী ছিলেন। প্রথম আলোর পুরনোরা ছিলেন কাগজ অন্ত:প্রাণ। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এক বৈঠকে বিশেষ প্রতিনিধিদের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা উঠেছিল। নেতিবাচকভাবে বলা হয়েছিল, বিশেষ প্রতিনিধিরা কাজ করছেনা। যেভাবে বলা হয়েছিল মোটেও তা ভালো লাগার মতো ছিল না। সবাই চুপচাপ ছিলেন। পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলাম আমি একা। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আমরা কয়েকজন বিশেষ প্রতিনিধি যেভাবে পত্রিকাকে সাপোর্ট দিয়েছি সেই তথ্য তুলে ধরেছিলাম। উপস্থিত অনেকের মনের কথা বললেও কেউ দায়িত্ব নিয়ে অপছন্দ হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাননি।

প্রথম আলোতে থাকবো না, এই সিদ্ধান্ত নিতে অনেক কষ্ট হয়েছে মনে। তবু ছাড়তে দ্বিধা করিনি। সাতদিনের মধ্যে প্রকাশিতব্য বাংলাদেশ প্রতিদিনে উপসম্পাদক হিসেবে যোগ দেই।

২০০০ সাল থেকে সারা দেশ ঘুরে বহু গডফাদারের মুখোশ উন্মোচন করেছি। লক্ষীপুরের আবু তাহের কিংবা ফেনীর জয়নাল হাজারী। ভয় পাইনি, পিছিয়ে যাইনি। আত্মসমর্পণও করিনি। ২০০১ সালে ফেনীতে ইউএনবির তৎকালীন প্রতিনিধি টিপু সুলতান জয়নাল হাজারীর পেটোয়া বাহিনীর হাতে মার খাওয়ার পরে ভয়ে ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা সেখানে যেতে চাননি। আমি ঠিকই তো গিয়েছিলাম। একাধিক প্রতিবেদনও করেছিলাম। একথা আজ না বললেই নয়, ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে যখন টিপু সুলতান কাতরাচ্ছেন তখন তাঁকে যেন সম্পাদক মতিউর রহমান দেখতে যান বারংবার সেই অনুরোধ তো আমিই করেছিলাম। টিপুকে নিয়ে যে মতি ভাইয়ের লেখা দরকার মালিবাগের কারিতাসে একটি অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ফেরার পথে সম্পাদকের গাড়িতে বসে এই অনুরোধও তো আমারই ছিল। এরপর বাকিটা তো ইতিহাস।

যতদূর সম্ভব লেখনীতে, সকল কর্মকাণ্ডে নিরপেক্ষতা বজায় রাখছি। স্বল্পবাক হয়ে নিরপেক্ষতার ভান করে তদবিরে প্লট প্রাপ্তিকেই জীবনের সব বলে মনে করিনা। বরং স্পষ্টবাক হয়েই থাকতে চাই পুরো পেশাগত জীবন। জানি, অনেক কষ্ট। অনেক শত্রুতা তৈরি হবে। অনেকেই দেখে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু জীবন তো একটাই। মৃত্যুই তো অনিবার্য। পদে পদে আপস করে বাঁচতে হবে কেন? বুক চিতিয়ে লড়বো।

লেখক: আরিফুর রহমান, সম্পাদক, ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম।

সৌজন্যে: ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম।