আমার মোস্তান ভাই

বুধবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৩

:: আমীর খসরু ::

mostanনাজিমউদ্দিন মোস্তান- নামের সঙ্গেই ‘মাস্তান’। সুতরাং চেহারাটা তেমনই হবে এমন একটা ধারণা পোষণ করছিলাম মনে মনে। ভুল ধারণা করেছিলাম তাকে, সণ্ডা-গুণ্ডা মার্কা কোনো চেহারার ব্যক্তি হবেন এমনটা ভেবেই। এমনও ধারণা ছিল যে, ভুল করে অথবা অন্য কোনো কারণে হঠাৎ ঢুকে পড়েছেন সাংবাদিকতায়। কিন্তু ভুল ভাঙতে সময় লেগেছিল কয়েক মুহূর্ত মাত্র। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং পূর্ণকালীন সাংবাদিক। পেশায় সাংবাদিক, বসবাস ও শিক্ষাঙ্গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তখন আমি দৈনিক সংবাদের রিপোর্টার, এসাইনমেন্ট কভার করছিলাম। নিরীহ, শান্তশিষ্ট এবং অত্যধিক স্নেহপ্রবণ একজন মানুষ এসে পাশে বসলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কে কে বক্তৃতা ইতোমধ্যে দিয়েছেন। আর এটা তিনি জিজ্ঞাসা করলেন পরম আন্তরিকতায়।

তখন আমি লিকলিকে একেবারেই হালকা-পাতলা। শরীরও ছোটখাটো। তবে মন-মানসিকতায় বাম তুর্কি তরুণ। জানতে চাইলাম, আপনি কে, কোথায় কাজ করেন ইত্যাদি। তখন সাংবাদিকদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। নাজিমউদ্দিন মোস্তানের নাম জানতাম। কিন্তু পরিচয় ছিল না। তবে ভুল ধারণাটুকু মনের মধ্যেই ছিল। জিজ্ঞাসার জবাবে জবাব দিলেন, পরিচয় দিলেন নিরহঙ্কারভাবে- আমি নাজিমউদ্দিন মোস্তান। ইত্তেফাকে কাজ করি। মুহূর্তে আমার সব ভুল ধারণা হাওয়ায় মিশে গেল, পেয়ে গেলাম আমার মোস্তান ভাইকে।

সেই যে সুসম্পর্ক, ছোট ভাই-বড় ভাইয়ের সম্পর্ক। বলতে গেলে এক ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক, তা বজায় ছিল দীর্ঘকাল। শেষ দিন পর্যন্ত এবং এখনো পর্যন্ত মোস্তান ভাই আমার স্মৃতিতে অমলিন এবং জ্বলজ্বলে এক নাম। পরে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনার নামের সঙ্গে ‘মোস্তান’ শব্দটি কেন? তিনি বলেছিলেন, তার বংশ লতিকা, তাদের বংশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে। এই সুসম্পর্ক আরও গভীর এবং অটুট হয়েছিল আশির দশকের শেষে আমি যখন দৈনিক ইত্তেফাকে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেই তখন। পরে আমি কূটনৈতিক সংবাদদাতাও হয়েছিলাম।

মোস্তান ভাইয়ের কাছ থেকে সবসময়ই যে বিষয়টি শিক্ষণীয় ছিল তা ছিল- তার পরিশ্রম, অসীম নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা এবং নীতি-নৈতিকতা। সহকর্মী হিসেবে মোস্তান ভাই আমাকে উদ্বুদ্ধ করতেন মানুষের মঙ্গল সাধন হয় এবং সাধারণ মানুষ উপকৃত হয় এমন রিপোর্ট এবং প্রতিবেদন যেন আমি সব সময় তৈরি করি। একটি ভালো রিপোর্ট নিয়ে এলে তিনি যে কত খুশি হতেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটা হতে পারে আমার প্রতি তার একটা বরাবর পক্ষপাতিত্ব এবং স্নেহপ্রবণ মনের কারণে।

ইত্তেফাকের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের নেতৃত্বে আমরা কাজ করতাম। মোস্তান ভাইকে সব সময়ই দেখতাম তিনি কিছু না কিছু লিখছেন। তিনি অত্যধিক পরিশ্রম করতে পারতেন এবং অনেক ভার সইতে পারতেন বলে তার উপরে কাজের চাপটাও একটু বেশি ছিল। এর মধ্যেও একটি ভালো রিপোর্ট পেলে বা আমার কাছে ভালো মনে হতো এমন রিপোর্ট বার্তা সম্পাদককে দেওয়ার আগে অন্তত একবার মোস্তান ভাইকে দিতাম যেন তিনি ওটা পড়ে দেন। যত কাজই থাকুক না কেন, তিনি এ কাজটুকু করতেন, মাঝে মধ্যে পরামর্শ দিতেন।

একজন সহকর্মীকে এভাবে পরম মমতায় আপন করে নেওয়ার রীতি এখন আর হয়তো পত্রিকা অফিসগুলোতে নেই। এখন সহকর্মী সহকর্মীই থাকেন, ‘ভাই’ হন না কখনই। ওই দিনগুলোতে ঘরের মানুষের চেয়েও সংবাদপত্রের মানুষগুলো যেন বেশি আপন ছিল। নিজের ঘরের চেয়ে অফিসেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। বয়সে অপেক্ষাকৃত ছোট ছিলাম বলে কখনো মুখ গোমরা করে বসে থাকলে তখন সিনিয়ররা এসে জিজ্ঞাসা করতেন- কি রে তোর মুখ শুকনা কেন, কি হয়েছে তোর? এটি যেন প্রশ্ন ছিল না, ছিল আত্দীয়তার চরম বন্ধন। এটা বোধ করি এখন প্রতিটি সংবাদকর্মী এরকম একটি পরিবেশকে মিস করেন। কিন্তু মোস্তান ভাইয়ের একটি বিষয় আমার কাছে জটিল বলে সব সময় মনে হতো।

তিনি অসম্ভব কমপ্লেঙ্ বা জটিল ও দীর্ঘ বাক্য লিখতেন। কমা, দাঁড়ি, হাইফেন দিয়ে দীর্ঘ বাক্য সাজাতেন। কিন্তু যখন লেখাটি শেষ হতো এবং পরের দিন আমিসহ সবাই তা পড়তাম- দেখতাম অপূর্ব সুন্দর একটি রিপোর্ট। দীর্ঘ বাক্য হলেও বিষয়টি যত জটিলই হোক না কেন, মোস্তান ভাই তা সহজভাবে মানুষকে বোঝানোর অদ্ভুত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। খুব বেশি কথা না বললেও যাদের সঙ্গে তিনি মিশতেন, কথা বলতেন তারা সবাই মোস্তান ভাইকে এতটাই পছন্দ করতেন এবং কেন করতেন তা এখনো আমার কাছে রহস্যের বলে মনে হয়। অদ্ভুত এক রহস্য ছিল তার মধ্যে। এই রহস্যটি ছিল মানুষের প্রতি চরম এবং পূর্ণ আস্থা ও তাদের প্রতি অঙ্গীকার থেকেই।

২. মানুষ সম্পর্কে মোস্তান ভাইয়ের ছিল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। এটা ছিল রাষ্ট্র এবং বিদ্যমান সমাজ সম্পর্কেও। তবে মানুষ সম্পর্কে তার বিশ্লেষণ এবং ব্যাখ্যা জেনেছিলাম খুবই ভিন্নভাবে। একদিন ইত্তেফাকের উল্টা দিকে আমরা দুজন দাঁড়িয়েছিলাম শাহবাগে ছফা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করব বলে। আমি বাসে অসম্ভব গাদাগাদি দেখে মোস্তান ভাইকে বললাম, বাসে যাওয়ার দরকার নেই। এত ঠাসাঠাসি করে আমি যেতে পারব না। চলেন রিকশায় যাই। মোস্তান ভাই হঠাৎ করেই বললেন, আচ্ছা মানুষ সম্পর্কে আপনার কি ধারণা? আমি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলাম- মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আমি মানুষের শক্তিতেই বেশি বিশ্বাসী। মোস্তান ভাই এতটাই খুশি হলেন, মনে হলো এমন জবাবটাই তিনি চাচ্ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার জন্য পাশর্্ববর্তী দেশবন্ধুর পরোটা আর মিষ্টি বরাদ্দ হয়ে গেল।

খেতে খেতে মোস্তান ভাই বলতে শুরু করলেন, মানুষই শ্রেষ্ঠ। মানুষের শক্তিতে সব সময় বিশ্বাস রাখবেন। খাওয়া শেষে আবার বললেন, চলেন বাসেই যাই। কারণ বাসে মানুষের কথা শুনতে শুনতে যাই। মোস্তান ভাই এভাবেই মানুষকে দেখেছেন, মানুষের কাছে থাকতে চেয়েছেন এবং থেকেছেন সব সময়। কোনো জনসভা কিংবা সমাবেশ হলে তিনি প্রায়শই সাধারণ মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনতেন এবং মানুষকে জিজ্ঞাসা করতেন ওই বক্তৃতাগুলো তাদের কেমন লাগে, তাদের প্রতিক্রিয়া কি। তিনি কখনো অষ্টম তলা থেকে দেখে সাধারণ মানুষের রিপোর্ট করেননি। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, মানুষের একজন হয়ে সব সময় রিপোর্ট করতেন।

এ কারণেই মোস্তান ভাই ছিলেন মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে পারা একজন সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় নাক উঁচু ভাব তার মধ্যে কখনই ছিল না এবং পরোক্ষভাবে এমন পরামর্শ তিনি আমাকেও বহুবার দিয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, মানুষের রিপোর্ট করতে গেলে তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। দূর থেকে মানুষ চেনা যায় না। ব্যক্তি জীবনে মোস্তান ভাই অসম্ভব সহজ-সরল জীবনযাপন করতেন। বেশভূষাও ছিল তেমনি। ইচ্ছা করলে তিনি তখন গাড়ি-বাড়িসহ অনেক কিছুই করতে পারতেন। কিন্তু তিনি অবৈধ পথ এবং পন্থাকে ঘৃণা করতেন। এই ঘৃণা লোক দেখানো ছিল না। ব্যক্তি জীবনে এটা তিনি পালন করতেন। কারও একজনের অসুখ-বিসুখ হলে তিনি সেখানে দৌড়ে যেতেন, সম্ভাব্য সাহায্য-সহযোগিতা করতেন এবং যারা বিত্তবান তাদের অনুরোধ জানাতেন, ওই অসহায় লোকটিকে সাহায্য করার জন্য। তিনি যে কত মানুষকে এভাবে গোপনে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তিনি যে শুধু মানুষের দুঃখ কষ্টেই এগিয়ে যেতেন তা নয়, মানুষের কোনো সৃষ্টিশীল বা উদ্যমী কাজকে সম্মান করতেন। তাদের অনেকের রিপোর্টই ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে।

মোস্তান ভাই মানুষের সৃষ্টিশীল কাজকে যে ভালোবাসতেন তার একটি প্রমাণ দেওয়া যাক। আমরা যারা ধোলাইখালকে হেলাফেলার দৃষ্টিতে দেখতাম তিনি তা বদলে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি একবার ধোলাইখালের উপরে সিরিজ রিপোর্ট লিখলেন। যাতে উঠে এসেছিল ওই সব পরিশ্রমী এবং উদ্যোগী, উদ্যমী মানুষের কর্মকাণ্ডগুলো। ওই রিপোর্টে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সামান্য সরকারি সহযোগিতা পেলে এই ধোলাইখালের মানুষগুলো অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে। এটা তিনি লেখার জন্য লেখেননি, এটা তিনি বিশ্বাস করতেন। আর এ বিশ্বাসকে তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন মানুষের মধ্যে এই আকাঙ্ক্ষায়, যাতে বাংলাদেশের সৃষ্টিশীল সংগ্রামী মানুষের মেধা ও পরিশ্রমকে কাজে খাটানো যায়। মোস্তান ভাই প্রায়ই বলতেন, বাংলাদেশের এসব মানুষ যদি সামান্য প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেতেন তাহলে তারা রকেটও বানাতে পারতেন। মোস্তান ভাই এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন।

আজকে কম্পিউটারের বাঘা বাঘা লোকজন এসে হম্বিতম্বি করছেন। কিন্তু নাজিমউদ্দিন মোস্তানই প্রথম ব্যক্তি, যিনি কম্পিউটার জিনিসটা কি, এর শক্তিটা কোথায় তা রিপোর্ট করে একে জনপ্রিয় করার প্রথম ধাপটি এগিয়ে দিয়েছিলেন। কম্পিউটারের উপরে কম্পিউটার জগৎ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশনায় তিনি এর মালিক এবং অন্যদের সঙ্গে যে কঠিন পরিশ্রম করেছেন, তা এখন হয়তো অনেকের কাছেই গল্পের মতো মনে হবে। যে নাজিমউদ্দিন মোস্তান কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের একটি যন্ত্র বানাতে চেয়েছিলেন, তার কথা কেউ মনেও করে না। তিনি সব সময়ই বলতেন, এই কম্পিউটার সারা দুনিয়া কাঁপাচ্ছে। বাংলাদেশও একটি সম্ভাবনাময় দেশ। আমি নিশ্চিত একদিন এ দেশের তরুণরাও বিশ্ব কাঁপিয়ে দিতে পারবে এই কম্পিউটারের মাধ্যমে।

৩. মোস্তান ভাই সম্পর্কে লেখার বিষয়ের কোনো শেষ নেই। কিন্তু স্বল্প পরিসরে তার সম্পর্কে লেখা খুবই কঠিন। তবে আর দুই-একটি প্রসঙ্গ টেনেই শেষ করতে চাই। মোস্তান ভাই দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন, প্রথাগত এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধহীন কিংবা মানুষের সৃষ্টিশীলতার কথা বলে না বিদ্যমান এমন সংবাদপত্রের বাইরে তিনি একটি উদ্যোগ নিতে চান। সে অনুযায়ী তিনি সংবাদপত্র প্রকাশের মাল-মসলা অর্থাৎ অর্থকড়ি জোগাড় এবং কিছু জনবলসহ প্রয়োজনীয় কোনো কিছুই ঠিকঠাক না করে নিজের মনোবলের উপর সাহস রেখে বের করলেন- রাষ্ট্র নামের পত্রিকাটি। এ কাগজটির নামকরণের পেছনেও পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থার যে সব অপকাণ্ড, জনগণের বিপক্ষে অবস্থান এবং ক্রমাগত অধিকাংশ মানুষের বিপক্ষে রাষ্ট্রের অবস্থানের কথা মাথায় রেখেই নামটি দিয়েছিলেন। মোস্তান ভাই এ কাগজটিতে মানুষের অসীম শক্তির কাহিনী আর সৃষ্টিশীলতা ও উদ্যমের নানা ঘটনা তুলে ধরতেন। তুলে ধরতেন মানুষের অভাব-অভিযোগের কথা।

মোস্তান ভাই সব সময়ই বলতেন, আমার এই ছোট কাগজটি দিয়ে সমাজের দ-চারজন মানুষেরও যদি উপকার হয় তাহলেই মনে করব আমার প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে। মোস্তান ভাই আট পাতার ব্রডশিটের ওই কাগজটি বের করতেন একা লিখেই। তিনি লেখা চাইতেন কিন্তু অনেকেই লেখা দিতেন না। আবার লেখা দিতেন না বলে মোস্তান ভাইয়ের মধ্যে এক ধরনের জিদ চেপে যেত। এই জিদ থেকেই তিনি একপর্যায়ে পুরো কাগজ একা লিখে বের করার হিমালয়সম যে ভারটি কাঁধে নিয়েছিলেন তাই তার জন্য যথেষ্টেরও অতিরিক্ত ছিল। এর উপরে কাগজ বের করার খরচাপাতি জোগাড় করার বিষয় তো ছিলই।

এক দিন ছফা ভাই অর্থাৎ আহমদ ছফা আমাকে হঠাৎ ডেকে পাঠালেন। আমি গেলাম। ছফা ভাই আমাকে দেখেই বললেন, মোস্তান কাগজটি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, আসেন আমি-আপনি দুজনে এখানে বেশ কিছুটা সময় দেই। ছফা ভাই একপর্যায়ে এমনও প্রস্তাব দিয়ে বসলেন যে, মোস্তান ইত্তেফাকের চাকরি ছেড়ে দেবে, আপনিও দেবেন। আমি তখন ছফা ভাইয়ের কথায় কিছুটা চিন্তা করার পরে কেন যেন রাজি হয়ে যাই। উদ্দেশ্য ছিল মোস্তান ভাই এবং আমি আর মাথার উপরে ছফা ভাই- এ কাগজ ভালো না হয়ে পারে না। কিন্তু আমার অধ্যক্ষ পিতা বললেন, ছফা আমার বয়সে অনেক ছোট হলেও তাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করি। তবে ছফার পক্ষে যা সম্ভব তোর কিংবা মোস্তান সাহেবের পক্ষে তা সম্ভব হবে না। শেষ পর্যন্ত ওই প্রজেক্ট বাদ। কিন্তু ছফা ভাই হাল ছাড়েননি, সব সময় চাইতেন রাষ্ট্র কাগজটি যেন সত্যিকার অর্থেই অনেক মানুষের পঠিত একটি কাগজে পরিণত হয়। মোস্তান ভাই রাষ্ট্রকে এতটাই ভালোবাসতেন এবং ইত্তেফাকের সময়টুকুর বাইরে রাতদিন, নাওয়া-খাওয়া, ঘুম বাদ দিয়ে এর পেছনে এত বেশি সময় দিতেন যে, মন মানলেও শরীর তা মানতে চায়নি। মোস্তান ভাই প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হলেন। তিনি লিখতে পারতেন না। কাজেই রাষ্ট্রটি বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু ছফা ভাই হাল ছাড়েননি। তিনি কাগজটি আবার বের করা যায় কিনা এ নিয়ে আমার সঙ্গেসহ অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছেন। তবে কি কারণে যেন মোস্তান ভাই ওই প্রস্তাবে আর রাজি হচ্ছিলেন না।

লিখতে না পারলেও মোস্তান ভাই ইত্তেফাকের চাকরিতে এরপরও অনেক দিন বহাল ছিলেন। ইত্তেফাক কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে মোস্তান ভাইকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ইচ্ছা করলে অফিসে আসতে পারেন, না এলেও কোনো অসুবিধা নেই। তাকে লিখতে হবে না। কিন্তু মোস্তান ভাইয়ের মতো দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী একজন মানুষ এটা মনে-প্রাণে মেনে নেননি। মোস্তান ভাই একটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে আসতেন। ওই ছেলেটিকে বলতেন আর ছেলেটি লিখত। আর তা-ই ছাপা হতো ইত্তেফাকে। একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কি দরকার এত কষ্ট করার। তার স্পষ্ট জবাব ছিল, অন্তত এরা বলতে পারবে না আমি বসে বসে বেতন নেই।

৪. মোস্তান ভাই গ্রামকে ভালোবাসতেন, গ্রামের মানুষকে ভালোবাসতেন। এক দিন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ঢাকায় স্কুলে পড়ুয়া তার ছেলেকে তিনি গ্রামে পাঠিয়ে দেবেন এবং তিনি দিলেনও। অফিসে এসে শুধু আমাকেই বললেন, ও অন্তত গ্রামটা বুঝুক, গ্রামের মানুষকে বুঝুক, জীবনকে বুঝুক। আমি অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম এই ভেবে, এ কোন পাগলামি মোস্তান ভাই করলেন। কিন্তু এখন মনে হয় আমাদের ইংলিশ স্কুলে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের গ্রামেই পাঠিয়ে দেওয়া উচিত অথবা অন্তত শহরের সাধারণ স্কুলগুলোতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে তারা ডরিমনসহ জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি নেই এমন সব বিষয় বুঝত না, মানুষকে অন্তত বুঝতে পারত, জীবনকে বুঝতে পারত।

৫. মোস্তান ভাই সারা জীবন এতটাই সাধারণ জীবনযাপন করতেন যা আমাদের নিম্নমধ্যবিত্তের নিচের দিকের মানুষগুলোও করে না। কিন্তু এ নিয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন, মানুষকে বোঝার চেষ্টা করতেন। পাঁচ বছর সাংবাদিকতা করে ফ্ল্যাট, বাড়ি-গাড়ির যে চিন্তা বর্তমানে করা হয়, মোস্তান ভাইয়ের মাথায় জীবনেও এমন কুচিন্তা কোনোদিন খেলা করেনি।

৬. মোস্তান ভাই এমন একজন মানুষ ছিলেন যার গুণের কথা, অনুপ্রেরণাদায়ী কর্মকাণ্ডগুলো এক লেখায় লিখে শেষ করা যাবে না। সম্ভবত লিখেও সাংবাদিক মোস্তান বা মানুষ মোস্তানকে বোঝানো সম্ভব হবে না। তার মৃত্যুতে আমি একজন প্রকৃত সহকর্মী, সাথী এবং অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষকেই শুধু হারাইনি, আমি হারিয়েছি আমার মোস্তান ভাইকে। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন মোস্তান ভাই আমার হৃদয়ে স্থায়ী আসনেই থাকবেন।

আমীর খসরু: সম্পাদক, amaderbudhbar.com

সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন