সাংবাদিকের ঈদ যেমন…

শনিবার, আগস্ট ১০, ২০১৩

সোহেল রহমান ::

journalist123আমরা যারা সংবাদকর্মী তারা তো সবার কথাই লিখি। ঈদে রাজনীতিক, তারকা, খেলোয়াড় ও ব্যবসায়ীরা কে কোথায় ঈদ করবেন, কীভাবে ঈদ করবেন কিংবা তাদের ঈদের দিনের মজার কোনো স্মৃতি- যেগুলো পাঠকরা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েন। কিন্তু আমার এই এলেবেলে লেখা পড়ার কোনো পাঠক কী আছে?

‘সাংবাদিকদের ঈদ কেমন’ এটা আসলে যারা এ পেশার বাইরে তাদের বোঝানো খুব কঠিন। এটা একমাত্র তারাই উপলব্ধি করতে পারেন যারা সরাসরি গণমাধ্যমের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদিও গত এক-দেড় দশকে দেশে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, মোটা দাগে সাংবাদিকদের জীবনযাত্রার মান আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে, কিন্তু তারপরও অধিকাংশ সাংবাদিকদের ঈদ অনেকটা শ্রমিকদের মতোই। ‘ঈদের আগে সময়মতো বেতন-বোনাস হবে কি না’ এ ধরনের একটা অনিশ্চয়তা থেকে যায় প্রায় সবগুলো ছোট মিডিয়া হাউসে।

ঈদে বেতন-বোনাসের সঙ্গে যে বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সেটি হচ্ছে ‘ছুটি’। এটা মোটামুটি সবারই জানা যে, সাংবাদিকরা সব ছুটি পান না। আবার যেসব ছুটি তারা পেয়ে থাকেন, অনেক সময় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সেই ছুটির দিনেও তাদের কাজ করতে হয়। এ নিয়ে দাম্পত্য জীবনে অশান্তিও কম হয় না। কেবলমাত্র তিনিই অতিরিক্ত ছুটি নিতে পারেন- যিনি ঈদে গ্রামের বাড়ি যাবেন কিংবা যার নিতান্তই প্রয়োজন। সুতরাং ঈদে বেতন-বোনাস এবং ছুটি এ দুইয়ের মহামিলন সাংবাদিকদের জীবনে খুব দুর্লভ।

একটা সময় ছিল যখন দেশে মিডিয়া বলতে একমাত্র ছিল প্রিন্ট মিডিয়া। আর এর সঙ্গে ছিল সবেধন নীলমণি ‘বিটিভি’। আর ছিল সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’ ও ‘ইউএনবি’, যাদের মূল গ্রাহক হচ্ছে পত্রিকাগুলো। যেহেতু ঈদ উপলক্ষে সব পত্রিকাই তিনদিন বন্ধ থাকে তাই এ দু’টি সংবাদ সংস্থার সংবাদকর্মীরাও বড় ধরনের চাপ ছাড়াই ঈদের ছুটি মোটামুটি কাটাতে পারেন।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার যে প্রসার ঘটেছে এতে করে এ দুই ধারার মিডিয়ার মোটামুটি একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিকদের ঈদ করতে হয় অফিসে কিংবা বাইরের কোনো অ্যাসাইনমেন্টে। হয়তো এ কাজের জন্য অফিস তাকে পে করছে কিংবা কেউ হয়তো ছুটির বদলে পরে ছুটি নিচ্ছেন, কিন্তু ঈদের ছুটির আনন্দ ও আমেজটা একেবারেই আলাদা।

এতক্ষণ যা লিখলাম, সেগুলো মোটামুটি সবারই জানা। এগুলো কেবল জীবনের উপরের কাঠামোর কথা। কিন্তু এর বাইরে প্রতিটি সংবাদকর্মীর যে নিজস্ব জীবনযাপন, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত এবং কর্মক্ষেত্রে- সেগুলো তো লিখে শেষ করা যাবে না।

যদি একেবারে নিজের কথা বলি, সচিবালয় বিট করার কারণে ইতোপূর্বে একাধিক অনলাইনে কাজ করলেও ঈদের ছুটিটা সাধারণত আমি পাই। কারণ ঈদের ছুটির পরপরই সচিবালয় থাকে খোলা। এবারই প্রথম ঈদে অফিস করছি। আর এ বিষয়ে অফিস যে আমাকে বাধ্য করেছে তা-ও নয়। আসলে কর্মক্ষেত্রটাও এক ধরনের পরিবার। কাজের তেমন চাপ নেই। যে কয়জন সহকর্মী কাজ করছেন তাদের সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আড্ডা দিয়েই কেটে যাচ্ছে সময়। দুপুরে সবাই মিলে একত্রে খাবার খেলাম অফিসে, রান্না করেছেন আমাদেরই আরেক সহকর্মী জাহাঙ্গীর আলম ভাই (সিনিয়র নিউজরুম এডিটর)। আর তাকে সহযোগিতা করেছেন জুনায়েদ শিশির, কাজল কেয়া, জিনাত জান কবিরসহ অন্যরা।

আমার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে যে কয়জন অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিক ঈদে কাজ করছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলানিউজের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট রহমান মাসুদ, জাস্ট নিউজের তরিকুল সুমন ও নতুনবার্তার হাবিব। এদের মধ্যে রহমান মাসুদ ভাইয়ের সঙ্গে ঈদের সকালে কথা হয়েছে প্রথমে ফেইসবুকে, তারপর তিনি নিজেই ফোন দিয়েছিলেন। যতদূর জানি, এই ঈদের দিনে ভাবী (মিসেস রহমান মাসুদ) বাসায় একাই রয়েছেন। অন্য দু’জনের সঙ্গে কথা হয়েছে ঈদের আগের রাতে। তরিকুল সুমন ভাই জানান, তিনি অফিসে যাবেন না, বাসায় বসেই অফিসের কাজ করবেন। আর হাবিব অফিসে যাবে।

এদিকে আমি সকালে যখন ঘর থেকে বের হই, আমার স্ত্রী তখন আমাকে বলছে, ‘প্রতিবার ঈদের দিনটা ঘরে থাকো, হৈ চৈ করো, ছেলেকে মাঝে-মধ্যে ধমক-টমক দাও, এবার থাকবা না, কেমন জানি লাগতাছে।’ তার এই কথার আড়ালে যে একটা দীর্ঘশ্বাস আছে এটা বোঝা যায়। এদিকে আমার ছোটো ভাই একটা দেশের বাইরে থাকে, সে এবার ঈদ করতে এসেছে দেশে। সকালে ঈদের নামাজের পর সে অনেকটা অবাক কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞেস করলো- ‘তোমার নাকি অফিস আছে?’ জবাবে আমি শুধু বললাম, ‘হ্যাঁ রে, আছে।’

এ লেখাটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু এর বাইরেও আরো দু’য়েকটা কথা না লিখলে এ লেখা সম্পূর্ণ হবে না। আমার সঙ্গে সচিবালয় বিটে কাজ করে দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার রানা মাসুদ। কিছুদিন আগে স্বামী ও শশুর বাড়ির অত্যাচার সইতে না পেরে তার একমাত্র ছোটো বোনটি গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করেছে। দু’টি সন্তানও রয়েছে তার এ বোনটির। গতকাল ফেইসবুকে রানা তার এই বোনটিকে নিয়ে লিখেছে- ‘ঈদ আসছে। হঠাৎ করেই ক্যামন করে মনে পড়ে যায় সে আমাদের সঙ্গে আর নেই। আগে ঈদ এলে মেয়ের জন্য মায়ের কতো আবদার। মিতুকে এটা দিবি..ওটা দিবি…। বউ হয়তো সবকিছু সহজভাবে না-ও দেখতে পারে। তাই না জানিয়েও কত কিছু দিয়েছি। এবার আর তার নাম কেউ উঠায়নি। অন্যবারের মতো মা-ও আবদার ধরেন নি তার একমাত্র মেয়ের জন্য।’

প্রায় একই ধরনের ট্রাজেডি রয়েছে জাস্ট নিউজের তরিকুল সুমন ভাইয়ের পরিবারেও। রানার বোনের ঘটনার কিছুদিন আগে এক দুর্ঘটনায় তার ভাবী মারা যান দু’টি শিশু সন্তান রেখে। তরিকুল ভাই প্রায়ই বলেন, ‘ভাই, বাচ্চা দুইটার মুখের দিকে তাকানো যায় না।’ এছাড়া নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মেঘের কথা তো আমরা সবাই জানি। এ রকম কতজনের কথা আমরা জানি? সাংবাদিকদের জীবনে ঈদ আসলে এরকম-ই।

লেখক: সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বাংলামেইল২৪ডটকম
সৌজন্যে- বাংলামেইল২৪ডটকম