সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগ

শনিবার, আগস্ট ৩, ২০১৩

:: প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

du-journalism(৩ আগস্ট ২০১৩)- প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে বলেছিলেন, তারা যখন প্রথম সাংবাদিকতায় আসেন তখন মেয়ের বাবা পাত্র চাই বিজ্ঞাপনে ছেলের যোগ্যতা লিখে দিতেন। বিজ্ঞাপনে বি. দ্র. দিয়ে লিখে দিতেন, বেকার এবং সাংবাদিক ছাড়া!

পাত্রী দেখতে গেলে মেয়ের অভিভাবকরা পাত্রের পেশা সম্পর্কে প্রশ্ন করে উত্তরটা যদি পেতেন সাংবাদিক, তাহলে জিজ্ঞেস করতেন ছেলে আর কি করে? অর্থাৎ সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে তখনও অস্বীকৃত ছিল।

সময় বদলেছে, পরিবর্তন এসেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির। প্রসার ঘটেছে গণমাধ্যমের। তাই সাংবাদিকতাকে আজ আর পেশা হিসেবেই নয়, বরং অন্যতম সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যারা গণমাধ্যমে কাজ করছেন, তারা নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন।

সাংবাদিকতা যে পড়ার কোনো বিষয় হতে পারে একথা শুনে অনেকে হেসে উড়িয়ে দিতেন একসময়ে। কিন্তু যোগাযোগবিদরা বলছেন, সাংবাদিকতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুধু জরুরিই নয়, বরং তা আবশ্যক। কারণ, সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক এবং তাদের চোখ দিয়েই সাধারণ জনগণ কোনো ঘটনাকে দেখে। তাই প্রকৃত ঘটনার তাৎপর্য বোঝার ক্ষমতা অর্জন করার জন্য সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জরুরি।

বিশিষ্ট যোগাযোগবিদ ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, যে কোনো পেশায়ই পেশাদারিত্ব অর্জন করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাডেমিক শিক্ষা জরুরি। আর সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তা আরো বেশি প্রয়োজন। এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে তারা অন্যান্যদের তুলনায় তাদের পেশাগত দায়িত্বটা অনেক ভালোভাবে বুঝতে পারেন। এর প্রমাণ হিসেবে আমরা দেখি যে, সাংবাদিকতার স্নাতকরা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তাদের স্বীয় মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। তাছাড়া কোনো পেশার গুণগত মান অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনেক বেশি জরুরি।

সাংবাদিকতা শিক্ষার পথিকৃৎ
বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে আজকের অবস্থানে আনার জন্য যে বিভাগটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। গত বছর বিভাগটি এর সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। ২ আগস্ট শুক্রবার পূর্ণ হয়েছে এ বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার ৫১ বছর।

১৯৬২ সালের ২ আগস্ট শুধু ডিপ্লোমা কোর্সের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এ বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে।

এ বিভাগের অনেক শিক্ষার্থীই আজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের মেধা, মনন, যোগ্যতা দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের প্রমাণ রেখে চলেছেন। দেশের সাংবাদিকতা পেশাকে আধুনিক রূপদানের ক্ষেত্রে এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

শুধু সাংবাদিকতাই নয়, দক্ষ যোগাযোগবিদ হিসেবেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করছেন এ বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী। কর্মরত আছেন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

এ বিভাগেরই সাবেক শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষতার সঙ্গে। আরেক সাবেক শিক্ষার্থী আলী রিয়াজ অধ্যাপনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনও এ বিভাগের একজন সাবেক শিক্ষার্থী।

বর্তমানে বিভাগটি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্যতম সেরা বিভাগে পরিণত হয়েছে। পছন্দের বিষয় হিসেবে সাংবাদিকতাকে ওপরের দিকেই রাখছেন শিক্ষার্থীরা।

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের অনেকে সাংবাদিকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখছেন। বর্তমানে বিভাগটি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি সেরা বিভাগে পরিণত হয়েছে। আর এ বিভাগের শিক্ষকরাও বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করে প্রতিনিয়ত বিভাগটির উৎকর্ষ সাধন করে যাচ্ছেন। তাছাড়া আমি বলবো, বর্তমানে সাংবাদিকতায় যে সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে তা এই বিভাগেরই অবদান।

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ঘ ইউনিট থেকে ২৮তম স্থান অর্জন করেন জয়ন্ত রায়। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৪৪তম স্থান দখল করেন প্রিয়াঙ্কা কুণ্ডু।

তাদের বিভাগ পছন্দের প্রথম নামটিই ছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা। এখন পর্যন্ত এ বিভাগের কার্যক্রমে তারা মুগ্ধ।

এভাবে প্রথম সারির মেধাবীরা প্রতি বছরই প্রথম পছন্দ হিসেবে এ বিভাগে এসে ভর্তি হচ্ছেন।

এ দীর্ঘ পথচলায় এ বিভাগের অর্জন কতটুকু। জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ মাধ্যমের খুব দ্রুত প্রসার ঘটছে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী এ বিভাগটি শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার জন্য সদা নিবেদিত প্রাণ। যারা এ বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, আমি বলবো, তাদের জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত এটি। কারণ, সাংবাদিকতায় পড়া মানে সব বিষয়ের ওপর জ্ঞান রাখা। তাছাড়া বর্তমানে এর কর্মক্ষেত্রর পরিধিও ব্যাপক।

ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সফলতার রেশ ধরে দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিভাগটি চালু হয়েছে এবং কোনো কোনোটিতে চালু হওয়া প্রক্রিয়াধীন আছে।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যে হারে গণমাধ্যম রয়েছে, সে তুলনায় সাংবাদিকতার ছাত্র নেই। তাই যতো বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্তরা এ পেশায় আসবেন, ততোই এর উৎকর্ষ সাধন হবে।

সৌজন্যে- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম