সৈয়দ ফারুক আহমদ

শনিবার, ০৩/০৮/২০১৩ @ ৩:৪৫ পূর্বাহ্ণ

:: প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

faruk-1(৩ আগস্ট ২০১৩)-
কবির ভাষায় – “উদয়ের পথে শুনি কার বানী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”।

ফিরে দেখা- ৩ই আগস্ট ২০০২ ইংরেজী।

দেশ প্রেম মানুষের সহজাত চেতনা। স্বদেশের প্রতি আমৃত্যু থাকে প্রবল আকর্ষণ আর প্রকৃত দেশপ্রেমিক মৃত্যুর পরও মুত্যুজয়ী রুপে সমাদৃত হতে থাকেন। আর বাঙালীর স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্টার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল। যে কোন দেশের জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার বিপন্ন হয় কিছু স্বার্থন্বেষী মহল এবং বিজাতির আক্রমনের দ্বারা। কাল পরিবর্তনে জাতিকে তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রত্যেক যুগে যুগে মহামানবের জন্ম হয়। ঠিক তেমনী অনুরুপ ইতালির গ্যারিবল্ডি, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, রাশিয়ার লেনিন, চীনের মাও সেতুং, তুরস্কের কামাল পাশা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, প্যালেষ্টাইনের ইয়াসির আরাফাত, প্রমূখ জন্ম হয়েছে।

তাদের মতই বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়েছিল। তিনিই স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক ৭ মার্চে আহবান করেছিলেন।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম

বঙ্গবন্ধুর এই জ্বালাময়ী আহবানে তথাকথিত কিছু কুলাঙ্গার ছাড়া সমগ্র বাঙালী তার স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তেমনী সেই সব মুক্তিকামী বাঙ্গালীদের একজন শ্রীমঙ্গলবাসীর জনপ্রিয় নেতা সাংবাদিক সৈয়দ ফারুক আহমদ।

তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তিনি দেশের আধ্যাত্মিক ভূবনের রাজধানী সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ী ঝর্ণার আবাসভূমি বড়লেখা উপজেলার দাসের বাজার ইউনিয়নের লঘাটি গ্রামের শত শত বছরের ঐতিহ্য মন্ডিত খোজার মসজিদের সৈয়দ বাড়ীতে ১৯৫০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা সৈয়দ আহমদ কনু মিয়া ও মাতা ছালেহা বিবি চৌধুরী। তার পিতা সৈয়দ আহমদ কনু মিয়া ১৯৫৩ সালে আওয়ামী মুসলিমলীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। তারপর ১৯৭১ সালে তার নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং তিনি স্থানীয় ভাবে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন সময় চান্দ্রগ্রাম বাজার থেকে পাক বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে বধ্যভূমিতে হত্যা করে। সৈয়দ ফারুক আহমদ বোন-ভাই আট জনের মধ্যে প্রথম সন্তান ছিলেন। কিন্ত বাবার শোক তাকে বিচলিত করতে পারেনি। তবুও দেশ ও জাতির কল্যাণে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি শৈশব কালে খোজার মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা ও সুড়িকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে বড়লেখা পি.সি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

১৯৬২ সালে এই স্কুলে ছাত্র থাকা অবস্থায় আইয়ুব্ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাই শ্রীমঙ্গলে বড় ভাইর বাসায় চলে যান। শ্রীমঙ্গলে ভিক্টোরিয়া স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি ব্যবসা বানিজ্য দেখাশুনাসহ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সে স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে ১৯৬৪ সালে সামরিক আইন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর রণ কৌশলে ২৫ মার্চের কালো রাত্রির জন্ম হয়। ২৭ মার্চ শ্রীমঙ্গলে বিশাল মিছিল ও ২৮ মার্চ মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা কমিটি গঠন করার নেতৃত্ব দেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪নং সেক্টর কুকিরতল সি,আর, দত্তের মাধ্যমে যুদ্ধ কৌশল এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রথম ট্রেনিং ইন্সপেক্টর গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এপ্রিলের শেষ দিকে পাক বাহিনী শ্রীমঙ্গল দখল করলে চলে যান ভারত। তিনি যুদ্ধকালীন সময় সিলেটের গোপালগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার এলাকায় কর্মরত ছিলেন। ১৯৭২ সালে জাসদ রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জাসদের এমপি হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদন্ধিতা করেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে মাত্র ছয় ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

মৌলভীবাজার জেলার জাসদের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে শ্রীমঙ্গল কারাগার থেকে সিলেট জেলে প্রেরণ করা হয়। তখন সে স্থানে বেশি দিন রাখা হয়নি। কুমিল্লা কারাগারে কর্ণেল তাহেরের সাথে তার সাক্ষাত হয়। বিপ্লবী সৈনিকের সাথে একান্ত নিরিবিলি কথোকপথন হয়। কিছু দিন পর দুই জনই দুদিকে বিভিক্ত হয়ে যান। তিনি ১৯৭৮ সালে অঙ্গিকার নামার মধ্যে মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮০ সালে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। সংগ্রামী সৈনিক নেপথ্যে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অবদান রাখেন।

১৯৯০ সালে শ্রীমঙ্গলের দৈনিক খোলা চিঠি পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ও পরবর্তীতে প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এর সাথে সাপ্তাহিক শ্রীমঙ্গলের চিঠি পত্রিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ব্রাকটাকের পরিচালক, সমাজ কল্যাণের প্রতিনিধি পরিষদের পরিচালক এসপিও এসপি, এনজিও সংস্থার কো-অর্ডিনেটর হিসেবে শ্রীমঙ্গল উপজেলার দায়িত্ব গ্রহণ করে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনকালে ২০০২ সালের ৩ আগষ্ট তার ক্ষত বিক্ষত প্রায় দুই মাসের গলিত লাশ শ্রীমঙ্গল পুলিশ উদ্ধার করে। শ্রীমঙ্গলে তার নিজ হাতে গড়া অসংখ্য সংগঠন ও নেতা কর্মী তাকে স্মরণ করে আজও অশ্রুসিক্ত হয়।

শ্রীমঙ্গলের পৌর কমিশনার ও রাজনীতিবিদ চাদ উদ্দিন এবং কমিশনার আহাদ জানান আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে দেখেছি দাদার (সৈয়দ ফারুক আহমদ) যৌবনের তীব্রতা। তিনি আমাদের রাজনীতির গুরু। শ্রীমঙ্গলবাসী তাকে কখনো ভূলবেনা। যার হাতের স্বাক্ষরিত একটি চিরকুট আমাদের আহার যুগিয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধে প্রায় সাতশত মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার ছিলেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার তাকে শ্রীমঙ্গল ডাক বাংলোতে জনসমুখে অসংখ্যা নির্যাতন করে। তবে তার এই করুণ মৃত্যু প্রত্যাশা ছিলনা। এই সংগ্রামী সৈনিক জীবনে ক্ষমতার শীর্ষ স্থান দখল করার পরেও নিজের জন্য বিলাসিতা করেননি।

আগামী প্রজন্ম যারা সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করবে তাদের জন্য ১০টি নীতি লিখেছিলেন। তার নিজ অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ডায়েরীর পাতা থেকে পাঁচটি উল্লেখ করা হল।

যেমন: ১। সাংবাদিকদের রাজনীতি করতে নেই। ইহা করল পেশার ইজ্জত নষ্ট হয়।

২। মদ স্পর্শ করতে নেই। ইহা করলে সমাজের উচু তলার মানুষেরা পাইয়া বসে।

৩। কারো কোন খবর চাপাইয়া দেওয়ার ওয়াদা করতে নেই।

৪। বেশি ও চটকদার খবরের আশায় এখানে-সেখানে যাইতে নেই।

৫। সাংবাদিকতা পেশা কে অন্য পেশা, বৃত্তি বা ব্যবসার মাধ্যম বানাইতে নেই।

কিন্তু এই সংগ্রামী সৈনিকের হত্যার বিচার আজো হয়নি। খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন আমাদের রাষ্ট্র কোথায় । ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দেশের সন্ত্রাসীদের হাতে ১৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সেখানে সৈয়দ ফারুক আহমদ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। যে দেশে এত বছর পর বাঙ্গালী জাতির পিতার বিচার হয়। সেখানে পাঁচ সন্তানের পিতার বিচার কি হবে না? অবশ্যই এসব হত্যার ব্যাপারে দেশের আইন ও পুলিশ প্রশাসনের আর গুরুত্ব সহকারে দায়িত্ব পালন একান্ত প্রয়োজন।

তথ্যসূত্রঃ শ্রীমঙ্গলীকা।