ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা: প্রেক্ষিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বৃহস্পতিবার, ০১/০৮/২০১৩ @ ১২:০৩ অপরাহ্ণ

:: শরীফুজ্জামান ও পলাশ চৌধুরী ::

cu journalistবিশ্ববিদ্যালয়কে সাংবাদিকতা চর্চার ‘উর্বরভূমি’ বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকতা মানেই প্রতিনিয়ত সংবাদ লেখা ও সংবাদ শেখার জায়গা। সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, দক্ষতা, সর্বোপরি নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের জন্য আমরা ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা সংবাদের অক্লান্তকর্মী। কিন্তু মাঝে-মাঝে আমাদের লেখনীকে স্তব্ধ করতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের ওপর আঘাত হানা হয়। তখন আমাদের কলম আরও দ্রুত চলে তথাকথিত সেইসব সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর ওপর দিয়ে, যারা সত্যকে ভয় পায়। নির্ভীক ও সত্য সাংবাদিকতাকে ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ তকমা লাগিয়ে সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। তবুও আমরা ক্ষুদে, সাংবাদিকতার জগতে ‘শিক্ষানবিস’ সাংবাদিকরা ভয়ে পিছপা হই না।

ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করতে হলে আমাদের নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একদিকে রয়েছে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চাপ। অন্যদিকে রয়েছে ছাত্রসংগঠনগুলোর অসহিষ্ণু কার্যকলাপ। বিশেষত, ক্ষমতাসীন সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের বেপরোয়া আচরণে মাঝে-মাঝে বিপন্ন হয়ে পড়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চায় তাদের দুর্বলতা, ত্রুটি, অদক্ষতা আড়াল করতে আর ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন চায় তাদের চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, অস্ত্রের প্রকাশ্য মহড়া দেয়ার মতো ঘটনা দেশের মানুষের কাছে অপ্রকাশিত থাকুক। ফলে এ দুইয়ের মাঝে ভয়-ভীতি, হুমকি-ধামকি প্রভৃতি উপেক্ষা করে আমাদের ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে হয়। এছাড়াও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অপ্রকাশিত হয়রানি, ছাত্রত্ব হারানোর ভয়। ফলে জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলতে হয়, ‘কে আর চায়, হায়! হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?’

সমপ্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মামুনুল হক সমর্থিত পক্ষের সাথে সিএনজি অটোরিকশা চালক ও এলাকাবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের ঘটনার পরদিন এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন ছাত্রলীগের মনঃপুত না হওয়ায় গত ২০ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেয় ছাত্রলীগ। সেই সাথে ওই দিনই ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘হলুদ সাংবাদিকতার’ অভিযোগ করা হয়।

একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তিনটি মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন ভুক্তভোগী। প্রথমত, প্রকাশিত সংবাদ মনঃপুত না হলে প্রথমে ঐ সংবাদপত্রে প্রতিবাদলিপি দেয়া। দ্বিতীয়ত, প্রতিবাদলিপি না ছাপালে ভুক্তভোগী প্রেস কাউন্সিলে মামলা করতে পারেন। তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী যদি মনে করেন ওই প্রতিবেদনের কারণে তার সম্মানহানি হয়েছে তাহলে তিনি আদালতে মানহানির মামলা করতে পারেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ তা না করে সোজা সাংবাদিক সমিতির অফিসে গিয়ে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে মারধর ও পঙ্গু করে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা এর আগে ঘটেনি।

ক্যাম্পাসে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের হাতে গত তিন বছরে অন্তত ১০ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত ও মারধরের শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দেশ প্রতিনিধি রাশেদ খান মেননের ওপর হামলার মধ্যদিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনের শুরু হয়। ২০১১ সালের মার্চে শাটল ট্রেনে ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঞ্ছনার শিকার হন যুগান্তর প্রতিনিধি রানা আব্বাস। ৬ ডিসেম্বর ডেইলি সান প্রতিনিধি নির্ঝর মজুমদারকে শাটল ট্রেন থেকে লাঞ্ছিত করে নামিয়ে দেয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এ ঘটনার কিছুদিন যেতে না যেতেই দৈনিক ডেসটিনির মাসুউদুল আলম ও দৈনিক খবর প্রতিনিধিকে লাঞ্ছিত করে ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা। ২০১২ সালের ৩০ জানুয়ারি নিউ এইজ পত্রিকার সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে লাঞ্ছিত করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। ২ ফেব্রুয়ারি আমার দেশ প্রতিনিধি বেলাল উদ্দিন, কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি শামীম হাসানকে শাটল ট্রেনে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত সিটে বসার অজুহাতে লাঞ্ছিত হতে হয়। ১৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা কথিত ‘ভার্সিটি এক্সপ্রেস’ নামক বগি থেকে নামিয়ে দেয়া হয় সমকাল প্রতিনিধি ফরহান অভিকে। একের পর এক সাংবাদিক লাঞ্ছিত করে পার পেয়ে যাওয়ায় যেন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছাত্রলীগের কর্মীরা। তাই ওই ঘটনার পাঁচদিন পার না হতেই ১৮ এপ্রিল সকাল ৮টায় শাটল ট্রেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় ‘সিক্সটি নাইন’ নামক বগিতে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রিত সিটে বসার অপরাধে লাঞ্ছিত হন সংবাদ প্রতিনিধি রনি দত্ত। চলতি বছরের জুন মাসে ছাত্রলীগ কর্মীদের লাঞ্ছনার শিকার হন সাংবাদিক সমিতির সভাপতি খন্দকার পলাশ ও সদস্য ইফতেখার ফয়সাল।

এসব ঘটনায় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বারংবার ক্ষমা চাওয়া ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের উপর হামলা বা লাঞ্ছনার মত ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটবে না মর্মেও মুচলেকা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। কিন্তু আজও তারা অস্ত্রে ভয় দেখিয়ে যাচ্ছে আমাদের। তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপে সাংবাদিকরা আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ছাত্রলীগের রয়েছে দেশি-বিদেশি হরেক অস্ত্র। আর আমাদের রয়েছে ‘কলম’। যার মাধ্যমে সমাজের সকল অন্যায়, অসঙ্গতি জাতির বিবেকের কাছে উপস্থাপন করি। সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায় যেখানে ক্ষমতাসীন দলের সাংসদকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেখানে সাংবাদিকদের প্রাণের প্রতিষ্ঠানে তালা লাগনোর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ব্যবস্থা করা হবে এটাই আমাদের কাম্য।

 লেখকদ্বয় : শরীফুজ্জামান, সহ-সভাপতি ও পলাশ চৌধুরী, সদস্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি
সৌজন্যে- ইত্তেফাক।