বিনা অপরাধে সুজনের জেল খাটার গল্প

মঙ্গলবার, জুলাই ৩০, ২০১৩

:: এম. এম. বাদশাহ ::

M. M. Badsha২০০৮ সালের ৫ ই জুন। সিনিয়র সহকর্মী সৈয়দ আতিক ভাই ফোন করে জানালেন তার এলাকা গাজীপুরের টঙ্গিতে বিনা অপরাধে জেল খাটছে একটি ছেলে। খুবই গরীব এবং অসহায়। একটি নিউজ করলে হয়ত কোন উপকার হতে পারে পরিবারটির। তো পরের দিন শুক্রবার ৬ ই জুন অফিস থেকে এ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে রওয়ানা হলাম টঙ্গির উদ্দেশ্যে। তখন আমি ইসলামিক টেলিভিশনের নিউজ টিমে কাজ করি। সাথে ক্যামেরাম্যান ছিল রফিকুল ইসলাম মামুন। খুব সকালেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম।

টঙ্গির ব্রিজ পাড় হয়ে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে উল্টো দিকে গলির মধ্যে ঢুকলাম । আতিক ভাই বললেন, আমরা যেখানে যাচ্ছি ঐ গ্রামের নাম আরিচপুর। আরিচপুর বাজারে গিয়ে রেললাইন পার হয়ে বেশ খানিকটা পথ আমাদের হেঁটে যেতে হয়েছে, কারন গাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। অনেকটা পথ শেষে গিয়ে যা দেখলাম———-টিন সেডের ছোট খুপড়ি ঘর, একটি চৌকি আর কিছু থালা বাসন নিয়ে আগোছালো একটি সংসার। এই ঘরের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির নাম সুজন।

মাত্র কৈশোর পেরুনো এই সুজন ট্যাক্সি ক্যাব চালিয়ে তার সংসার চালাতো। সুজনের সংসার বলতে তার মা আর বৃদ্ধা নানী। সুজনের মা স্বামী পরিত্যক্তা এক অসহায় মহিলা, যিনি নিজেও রাজমিস্ত্রির জোগালু কাজ করে সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে কাজ করতেন দিন রাত। কিন্তু মে মাসের শেষ দিকে হঠাৎ করে তাদের সংসারে নেমে আসে দু:খের অমানিশা।

আরিচপুর এলাকার অন্যতম সন্ত্রাসী ও ৪টি হত্যা মামলার প্রধান আসামী এক সুজনকে ধরতে গিয়ে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় এই নিরপরাধ ট্যাক্সি ড্রাইভার সুজনকে। এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিরা পুলিশকে প্রতিরোধ করে বলেছিল এই সুজন সেই মার্ডার কেসের আসামী সুজন না। সেই সুজনের বাবা ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী। একপর্যায়ে মামলার বাদী পক্ষের লোকজনও থানায় গিয়ে পুলিশকে জানিয়েছিল, গ্রেফতারকৃত সুজন তাদের মামলার মূল আসামী নয়। কিন্তু পুলিশ নাছোড়বান্দা।

প্রকৃত আসামী সুজনকে আড়াল করতেই তার পক্ষে কাজ করার জন্য এই নকল আসামীকেই আসল আসামী সুজন সাজিয়ে আদালতে চালান করে দেয় পুলিশ। এদিকে তো সুজনের মা আর নানীর অবিরত কান্নায় শোকার্ত হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলি, প্রত্যেকের কাছেই সুজনের প্রশংসা আর ভাল কাজের ফিরিস্তি পাচ্ছি। গলির মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সবাই বলছেন, এই সুজন হত্যা মামলার আসামী সুজন নয়। এ যেন নামে নামে যমে টানে অবস্থা। সুজনের নানী টেলিভিশনে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুধুই কাঁদছেন, আর বলছেন আমার সুজনকে ফিরিয়ে দ্যাও, ফিরিয়ে দ্যাও।

স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলা শেষে সুজনের চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, জন্ম সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স এর কপি নিয়ে গেলাম টঙ্গি থানায়। দেখলাম ওসি সাহেব বেশ আয়েশি ভঙ্গিতেই শুক্রবারের অলস সময় কাটাচ্ছেন। জানতে চাইলাম স্থানীয় জনগনের এত প্রতিরোধ, মামলার বাদী নিশ্চিত করে বলল যে এই সুজন তাদের মামলার আসামী নয়, প্রকৃত আসামীর বাবার নাম পরিচয় ও ঠিকানার সাথে এই সুজনের কোন মিল না থাকার পরেও আপনি তাকে গ্রেফতার করে আনলেন কেন, আবার তাকে এতসব বিষয় অমিল থাকার পরেও নিশ্চিত না হয়েই আদালতে চালান করলেন কিভাবে?

ওসি সাহেব বেশ ঘামতে ছিলেন, অনেকটা অপ্রস্তত আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তিনি ক্যামেরার সামনে উত্তর দিলেন তার ভাষায় “আমাদের ভুলের কারনে এটা হয়েছে, আমরা রোববারে আদালত খুললে এ বিষয়ে মার্জনা চেয়ে ভুল সংশোধন করার আবেদন করব”। একজন মানুষ নিজ অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে তাকে আর কি অভিযোগ করা যায় ? তো ঐ পর্যন্ত শেষ করে দ্রুত ঢাকায় ফিরলাম। ইসলামিক টিভিতে প্রতিবেদন তৈরী করলাম শিরোনাম ছিল “শুধুমাত্র নামের মিল থাকায় আর পুলিশের খাম খেয়ালীপনায় হত্যা মামলার আসামী হিসেবে জেল খাটছে নিরপরাধ ট্যাক্সি ড্রাইভার সুজন”। রাতে ৯.৩০ মিনিট এবং ১১.৩০ এবং পরের দিন সকাল ৯.৩০ মিনিটে প্রচারিত হল প্রতিবেদনটি।

পুলিশের উর্দ্ধতন মহল থেকে শুরু করে পরিচিত অপিরিচত বেশ কিছু টেলিফোন প্রতিক্রিয়া পেলাম। পরের দিন শনিবার পুলিশ সদর দফতরে দেশের আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক আইজিপি’র ( তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদ) সংবাদ সম্মেলন ছিল। সেখানে তাকে বিষয়টি জানালাম। পরের দিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হল নিরপরাধ ট্যাক্সি ড্রাইভার সুজনের জেল খাটার খবরটি। রোববার পুলিশ সদর দফতরের তৎপরতায় টঙ্গি থানার মাধ্যমে আদালতে সুজনের বিষয়ে ভুল সংশোধনী জানিয়ে আবেদন করা হয়। সারা দিনের প্রক্রিয়া শেষে সন্ধ্যার কিছু সময় আগে গাজীপুরের জেলা কারাগার থেকে বের হয়ে আসে সুজন। জেল গেটে তখন সুজনের মা আর নানীর কান্নায় আরেক করুন দৃশ্যের অবতারনা হয়।

সুজন জানায়, ইসলামিক টিভির কারনে আজ সে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে, যদিও যাদের চক্রান্তের কারনে সুজনকে বিনা অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে তাদেরও বিচার চাইছিলেন সুজনের মা। অন্য দিনে সুজনের নানী বার বার বিলাপ করে বলছিলেন, যে সাংবাদিকদের কারনে আমার নাতিকে ফিরে পেয়েছি আল্লাহ তুমি তাদের ভাল কোরো।

ঘটনার অনেক বছর পেরিয়ে গেছে পেশাগত কারনে অনেক সুখ দু:খের নিউজ করেছি এত বছরে, টেলিভিশন স্টেশনও পাল্টেছি কয়েকটা, কিন্তু কেন যেন আজো আমার কানে বাজে সুজনের নানির সেই বুক ভরা দোয়া “যে সাংবাদিকদের কারনে আমার নাতিকে ফিরে পেয়েছি আল্লাহ তুমি তাদের ভাল কোরো” সত্যি যখনই মনে হয় পুরো শরীর আমার শিহরিত হয়ে ওঠে।

সাংবাদিকতার জীবনে এর চেয়ে আর বড় কোন চাওয়া নেই আমার। পেশাগত বাকী জীবনটাও যেন বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করে যেতে পারি সেই প্রত্যাশা প্রতিটি মূহুর্তের। কারন একটি মানুষের গড় আয়ু যদি ৫০-৫৫ বছর হয়। তাহলে তো অর্ধেকের বেশি পার করেছি ইতোমধ্যেই। কিন্তু দেশ কিংবা দেশের মানুষের জন্য কি ই বা করতে পারলাম। সেই যন্ত্রনা যে আমায় প্রতিক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায় । ওহ! সুজনকে জেল খাটানোয় টঙ্গি থানার সেই ওসি কে বদলি এবং সাব ইন্সপেক্টরকে সাসপেন্ড করে কিঞ্চিৎ দায় মুক্তিও করেছিল তখনকার উর্দ্ধতন প্রশাসন।

*** শেষ দিনের রিপোর্ট পাঠকদের জন্য-ইউটিউব লিংকে

লেখক: টিভি সাংবাদিক
ইমেইল: badsha2050@gmail.com