সাংবাদিক নির্যাতন প্রসঙ্গ

সোমবার, ২৯/০৭/২০১৩ @ ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

:: নাজিমুদ্দীন শ্যামল ::

বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা, সাংবাদিককে মারধর করা যেন ডালভাতে পরিণত হয়েছে। অতি সম্প্রতি সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মওলা রনি ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুইজন কর্তব্যরত সাংবাদিককে যেভাবে পেটালেন তাতে মনে হয়েছে সাংবাদিক পেটানোর ঘটনা যেন ডালভাত থেকেও সহজতর হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে সব সরকারের আমলে সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন, মারধর করার ঘটনা ঘটেছে।

হুমায়ুন কবির বালু থেকে শুরু করে সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনিসহ অনেক সাংবাদিককে সত্যপ্রকাশের কারণে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এদের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয় বরং সবসময় সরকারি দলের ক্যাডারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। অর্থাৎ সাংবাদিক হত্যা যেনবা ডালভাত, কেননা সাংবাদিক হত্যা করলে কোন বিচার হয় না। প্রকৃত খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।

আর সাংবাদিকদের উপর হামলা-মামলা নৈমিত্তিক এক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পুলিশ, র্যাব থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, হোমরাচোমড়া সকলেই সাংবাদিকদের আঘাত করে। তারপর বলে দেয় সাংবাদিকরা চাঁদা চেয়েছিলো। খুব সহজ এক বুলি। এসব দুষ্কৃতিকারীদের মুখে সাংবাদিকদের চাঁদা দাবির কথা শুনলে মনে হয় সাংবাদিক সমাজ যেনবা চাঁদা তুলেই তাদের পরিবার পরিজনের মুখে আহার তুলে দেয়।

মানুষ সন্ত্রাসী দখলদারদের চাঁদা দেয়ার পরিবর্তে জীবন দিতে কুণ্ঠবোধ করে না। ফলে দেশে অহরহ হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর এসব সন্ত্রাসীরা যেন কলম পেশা সাংবাদিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভয়ে থর থর করে চাঁদা দিয়ে দেয়। সত্যিই, এসব উদ্ভট গল্পও এখানে শোনা যায়।

সে যাই হোক, আমাদের সাম্প্রতিক টক শো তারকা গোলাম মওলা রনিও সাংবাদিকদের মারধর, নির্যাতনের পর নানা কথা বলেছেন। চাঁদা দাবির কথাও বলেছেন। এসব হাস্যকর কথা মানুষ শুনেছেও। তিনি নিজে যেখানে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ‘ভাইয়া বাহিনী’র মাধ্যমে বছরের পর বছর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও জমিদখল থেকে সব ধরনের অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত আছেন বলে সেখানকার এলাকার মানুষজন বলছে, পত্রিকায় এসব খবর বিস্তারিত এসেছেও, সেখানে তাঁর কাছে গিয়ে দুইজন নিরীহ সাংবাদিকের পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হাস্যকর ছাড়া আর কি।

বস্তুত, ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে তিনি তার দল, দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের উপর নানাভাবে চড়াও হয়েছিলেন গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব সময় পর্যন্ত। যে টেলিভিশন বা পত্রিকার সাংবাদিকরা টকশো প্রচার করে বা লেখা প্রকাশ করে অখ্যাত গলাচিপা এলাকার জনৈক গোলাম মওলা রনিকে দেশের মানুষের কাছে রীতিমতো তারকা বানিয়ে দিয়েছেন, সেই সাংবাদিকদের এমন বেধড়ক পিটুনী দেয়া যেন সেই অকৃতজ্ঞ বাঘের কথাই মনে করিয়ে দেয় যে বাঘ উপকারী বককে ভক্ষণ করতে চেয়েছিলো।

গোলাম মওলা রনির গ্রেফতারের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী সংবাদপত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিলেন। এখন এর ন্যায়বিচার যদি সাংবাদিকরা পায়, তবে বুঝতে হবে বর্তমান সরকার ও সরকার প্রধান সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আর এতে বিশ্বাস মানে হলো গণতন্ত্রে বিশ্বাস। আমরা আশা করতে চাই যে, বর্তমান সরকার সেই বিরল নজির স্থাপন করবেন, যা ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। গোলাম মওলা রনিকে যথাযথ শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার তার হারানো ইমেজ (যা রনি কর্তৃক বারংবার সাংবাদিক পেটানো ও নাজেহালের ঘটনায় ক্ষতি হয়েছিল) তা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের শত্রু গোলাম মওলা রনির গ্রেফতারের ঘটনা কর্মরত সাংবাদিকদের প্রকৃতপক্ষে আশ্বস্ত করেছে।

তার আইনানুগ বিচার সম্পন্ন হলে সাংবাদিক সমাজ নিরাপত্তা বোধ করবে। কেননা, এটি একটি বিরল উদাহরণ হিসাবেই বিবেচিত হতে থাকবে।
গোলাম মওলা রনির বিরুদ্ধে সরকার আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ায় কর্মরত সাংবাদিক হিসাবে আমি আনন্দিত ও গৌরবান্বিত বোধ করেছি। কিন্তু সাংবাদিক নেতাদের কর্মকাণ্ডে কর্মরত সাংবাদিক হিসাবে লজ্জিতও বোধ করেছি। আমরা টিভিতে দেখেছি অনেক সাংবাদিক নেতা গোলাম মওলা রনির অফিসে গিয়ে বিষয়টি আপোষ করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো সাংবাদিক নেতারা কেন একজন সন্ত্রাসী (হোক না তিনি এমপি) এর অফিসে গেলেন? ঘটনার প্রতিবাদ না জানিয়ে আপোষ করতে গেলেন কেন? আমি সত্যিই লজ্জিত। তারপর দেখলাম সরকারপন্থি সাংবাদিক নেতারা (যারা পদবিতে আছেন) মুখে ‘রা’ পর্যন্ত করলেন না, বিবৃতি দেয়া, প্রতিবাদ, নিন্দা জানানো তো দূরের কথা! এটা কেন হলো?

কিন্তু তারপরও সারাদেশের সচেতন সাংবাদিকরা সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দাবিতে ও গোলাম মওলা রনির বিচার চেয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে।

এসব দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিস্মিত, আনন্দিত হয়েছি, আবার নেতাদের কর্মকাণ্ডে বিমর্ষ হয়ে পড়েছি। তবুও বোধ করি, কর্মরত সাংবাদিকরা পেশার মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কোন না কোন সময় ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এই আশা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লেই মঙ্গল সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের জন্য।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, দি ইন্ডিপেনডেন্ট