মিডিয়ায় ঈদ : অন্য আলোয় আলোকিত একদিন

বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০১৩

সাজেদা হক ::

Media eid. sajeda haqueঈদ মানেই তো আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। পরিবার পরিজন নিয়ে কিছুটা আনন্দঘন মূহুর্ত, জমজমাট আড্ডা। স্বজন-বন্ধু-সুহৃদদের সাথে দিনভর খুনসুটি আর নতুন কাপড়ে রাঙ্গা ভোর, সকাল, দূপুর, সন্ধ্যা, রাত। অযথাই হৈ চৈ, আনন্দ আহ্লাদ আর মায়ের হাতের রান্নার ভূঁয়শী প্রশংসা। রঙ্গিন সাজ-পোশাকে প্রতিবেশী ভাই-বোন-বন্ধুদের নিয়ে দিনভর উল্লাস। কিছু স্মৃতি, কিছু কথায় প্রত্যেকটা ঈদ তাই প্রিয় সবার কাছে। সে কারণেই সারাটা বছর শেষে নানা দুর্ভোগ স্বত্বেও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে নিজ বাড়িতে ছুটে যান সব শ্রেনী পেশার মানুষ।

ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও যেতে পারেন না কেবল ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদ কক্ষে কর্মরতরা। প্রোগ্রাম বা প্রশাসনিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িরা অবশ্য সেসব ছুটি উপভোগ করতে পারেন। যেমন তিন দিনের ছুটি ঘোষণা নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করেন সংবাদপত্রের কর্মীরা।

কিন্তু টেলিভিশনে যারা বার্তা বিভাগে কাজ করেন তাদের ছুটি নিতে হয় পালাক্রমে। কেউ ঈদ-উল ফিতর এ ছুটি নেন, কেউ ছুটি নেন ঈদ-উল আযহায়। সহকর্মীদের মধ্যে এ এক অন্যরকম সৌহার্দ্য। এই বিভাগে যারা কাজ করেন তারা সবাই জানেন, বোঝেন এবং সহযোগিতা করেন। এইসব কর্মীদের পরিবার পরিজনেরাও নিজেদের মানিয়ে নেন। ঈদের দিন তাই সকালে উঠেই প্রিয় মানুষের মুখ দেখা হয় না কারো কারো।

পরিবার পরিজনহীন এমন একটা ঈদ আমি কাটিয়েছি একুশে টেলিভিশনে ২০০৭ সালে। তখন আমি নিউজরুম এডিটর, ন্যাশনাল ডেস্কে করি। অবশ্য রাত ১২ টার পর থেকেই মুঠোফোনে শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছিলেম বহু। সকালেই অফিস। তাই, নতুন জামা পড়েই অফিসে যাওয়া, সহকর্মীদের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় এবং যথারীতি ডেস্কে বসে নিজের দায়িত্ব পালন করা। সকাল থেকেই জেলা প্রতিনিধিদের শুভেচ্ছাসহ সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা আর সংবাদ তৈরিতে দৌড়ের উপর। এর ফাঁকেই ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত টেলিভিশনের নিজস্ব খাবার সকালের নাস্তা, দুপুরের বিশেষ মেনুসহ খাবার। যেহেতু কম মানুষ তাই, একটু বেশি সময় ধরে কাজ করার পর বাড়ি ফেরা।

এই দিনে সহকর্মীদের এতো সহযোগিতা, এতো শুভেচ্ছা, প্রতিষ্ঠানের এতো আপ্যায়নও পূরণ করতে পারে না স্বজনদের কাছে না থাকার শুণ্যতা। সারাদিন অফিসে পড়ে থাকলেও মন খুঁজে বেড়ায় স্বজনের সান্নিধ্য। প্রথম বলেই হয়তো এতোটা বিষন্ন লেগেছিলো আমার। মনে হয়েছিলো বছরের একটা দিন. তাও যদি ভাই-বোন-বন্ধুদের সাথে না কাটাতে পারি তাহলে আর কিসের জীবন।

বাড়ীর বড় মেয়ে হিসেবে ঈদের যে পর্বটা আমি সব সময় এনজয় করি সেটা হলো সালামি দেয়া নিয়ে কৃপণতামীটা। পকেটে অনেক টাকা নিয়েও ছোট ভাইবোনদের একটু জ্বালাতন করতে ঈদের দিন ভালোই লাগে। ভীষণ মজা। সালামি পাওয়ার জন্য বান্দর গুলারে যা বলব তাই করতে রাজি। তাই সকাল থেকেই বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে একজন গোয়েন্দা ঠিক করে দেয়া আমার এযাবত কালের স্বভাব। যে শুধু সাবধান করবে আমায়। যেনো হুট করে কেউ পায়ে ধরে সালামটা না করে বসে!!

যে আমার পায়ে ধরে সালাম করবে আমি ঘোষণা দিয়ে সালামি তারেই বেশি দিবো। পিচ্ছিগুলোর সেই কি প্রতিযোগিতা..। ভীষণ মিস করি আমি। ঈদের দিন সকাল মানেই আমার তোলা আশি টাকা। তার উপর সালামিতে কৃপণতা ভাবটা সেই অহমিকায় যোগ দেয় বাড়তি ঝিলিক।

নতুন টাকার গন্ধে ছোটরা মুগ্ধ হয়ে থাকে। সেই সাথে বাড়তি খাওয়া, সিনেমা দেখা আর ঘুরে বেড়ানোর বাড়তি আনন্দ তো থাকেই। আর আমি ওদের সবার তৃপ্ত মূখ দেখে তৃপ্তি পাই। সেটাই ঈদে পাওয়া আমার সেরা উপহার।

অথচ সেই প্রিয় ঈদেও যখন কাজ করতে হয় তখন কি আর মন ভালো থাকে। না, কিন্তু রাখতে হয়। কর্মজীবনটাও একটা বিরাট জগত। এখানেও জমা হয় ছোট ছোট স্মৃতি, আনন্দ-বেদনা কাব্য। কোন কোন সহকর্মীর প্রতি হৃদ্যতাও তৈরি হয়। সেসবই কিছু সময়ের জন্য ভূলিয়ে রাখে স্বজনের সাথে না থাকার শুণ্যতা।

কাজের মাঝেও পরিবার থেকে অনুজদের অনবরত ফোন, কাছে না থাকায় যে শুণ্যতা তৈরি হয়েছে তার শ্রদ্ধামাখা ঝাড়িও কিন্তু কম আনন্দদায়ক না। সেই ঝাড়িতে ফুটে উঠে সালামি কম হওয়ারও গঞ্জনা। আর অগ্রজদের øেহমাখা, দরদী কন্ঠ ভরিয়ে দেয় মন। প্রশান্তিতে কেটে যায় সারাটা বেলা।

একুশে টেলিভিশনে এর পরেও ঈদ করেছি চারটি। পরের বছরগুলোতে অতোটা খারাপ লাগেনি। এরপর যোগ দিলাম যমুনা টেলিভিশনে। এই টেলিভিশনটি এখনো সম্প্রচারে আসেনি। আমি যমুনায় যোগ দেই ২০০৯ সালে। সে বছরের প্রথম ঈদ সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ। এখানে ঈদের আগে থেকেই এক ধরণের অস্বস্তিতে ভূগতে হয়েছে সবাইকে। কয়েকদিন তো গেছে ঈদ-বোনাস দেব কি দেবে না তাই নিয়ে। তারপর সেই চাওয়া-পাওয়ায় যোগ হয়েছে সবাই ছুটি পাবো কিনা? না, সম্প্রচারে না থাকলেও সবাই ছুটি পাই নি যমুনায়। তাই ২০০৯ সালের ঈদুল ফিতরটা কাটাতে হয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যমুনা টেলিভিশন ভবনে। ব্যস্ততার চেয়ে একটা পার্টি মুড ছিলো ওই ঈদে। সহকর্মীদের সাথে আড্ডা আর ভাই-বোনদের সাথে ফোনালাপ, সেই সাথে যমুনার বিশেষ মেনুতে ভূড়ি ভোজ-সব মিলিয়ে জম্পেশ ঈদ বলা যায় ওটাকে।

বেশিদিন থাকা হয় নি যমুনায়। এরপর ২০১০ সালে যোগ দিয়েছি বৈশাখী টেলিভিশনে। সে বছর প্রথম ঈদ হয় সেপ্টেম্বর মাসে। বৈশাখী টেলিভিশনের সহকর্মীদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার সেই শুরু। বছরের প্রথম ঈদ বলেই ছুটিতে যাওয়ার তালিকাও থাকে বেশি। সবাই ছুটিতে যেতে চায়, আমিও। ছুটিতে যাওয়ার সৌভাগ্যতো সবার হয় না, এটা বলেছি শুরুতেই। সে বার আমারও হলো না। রয়ে গেলাম বৈশাখী টেলিভিশনে দায়িত্ব পালনে। এরপর ২০১১ ও ২০১২ সালেও দুই ঈদে বাড়ি যাওয়া হয়নি আমার।

ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ির লোকজন। জেনে গেছে, বউমাকে বা মেয়েকে এক ঈদে পাওয়া যাবে, আর এক ঈদে পাওয়া যাবে না। তাই যেসব ঈদ অফিসে কাটাই সেইসব ঈদে প্রিয়জনদের সান্নিধ্য ভীষণভাবে মিস করি।

টেলিভিশনে বার্তা কক্ষের কর্মী হিসেবে, প্রত্যেকটা ঈদে একটা বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয় আমাদের। বলা যায় রেড এ্যালার্ট। তা হলো, দূর্ঘটনা। সেটা সড়ক পথেও হতে পারে, রেলপথেও হতে পারে, পানিপথেও হতে পারে এবং হয়ও। কখনও কখনও দুর্ঘটনায় নিহতদের সংখ্যা গুনতে গুনতে ঈদ আর ঈদ থাকে না। তখন মৃত্যুর মিছিলে যোগ দেয় সব আনন্দ। আনন্দ যোগ দেয় নিহতদের পরিবারের সমবেদনা হয়ে, আর আহতদের সহযোগিতা হয়ে। আরো একটি বিষযে নজরটা থাকে, সেটা হলো আগুন। ঠিক কেনো যেনো আগুন আর দুর্ঘটনায় ঈদের সময়টাতে বেশি হয় তা জানি না। আগুনে হোক বা সড়ক দুর্ঘটনাতেই মানুষের মৃত্যুর সংবাদ দিতে হয় মানুষের স্বার্থেই।

এই যে, আনন্দের মাঝেও বিষাদের স্বাদ, দিনভর ক্লান্তি আর স্বজনদের কাছে না থাকার শুণ্যতাও এই পেশাটাই ভরিয়ে দেয় মন। মনে হয়, সব সাংবাদিকদের চেয়ে আমরা সেরা। কারণ অনেক ত্যাগ আমরা করি, আমাদের পরিজনেরা করেন। সেই শ্রদ্ধা পায় কয়জন? সহকর্মীদের যে সহমর্মিতা সেই পাওয়াটাও কি কারো সাথে তুল্য?

এখানেও যে তৈরি হয়ে গেছে একঝাঁক অনুজ ও অগ্রজ। অগ্রজদের কাছ থেকে উপহার নেয়া তো বাদ যায় না এখানেও। অনুজরাও তাদের সালামি আদায় করে ছাড়ে। এটাও একটা জগত। ভিন্ন আনন্দে ভরা। এসবই ভূলিয়ে দেয় প্রিয়জনদের সাথে না থাকার কষ্ট।

তার চেয়েও বড় তৃপ্তি, মানুষের জন্য কাজ করায়। এই যে, সবাই যখন আনন্দে বিভোর, তখন আমরা গুটিকয়েক মানুষ, শখ-আনন্দ-উল্লাস বাদ দিয়ে কাজ করি জনগণের জন্য। সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রচার পর্যন্ত। আর যারা ঘরে বসে বিনোদিত হন, তারাও যখন চ্যানেল ঘুরিয়ে সংবাদে একনজর বুলিয়ে নেন, তখনই স্বার্থক আমরা। আমাদের ত্যাগ, আমাদের শ্রম।

অন্য এক আলোয় উদ্ভাসিত জীবনে গতি আনে, ছন্দ আনে। ঈদে বাড়ি না ফেরার কষ্টকে ভূলিয়ে দেয় মানুষের জন্য কিছু করতে পারার তৃপ্তি। সংবাদের মধ্য দিয়েই সব মানুষের মাঝেই আমরা আমাদের আনন্দকে ভাগাভাগি করে নিই। পরিবারের গন্ডির বাইরে গিয়েও আমরা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরা হয়ে উঠি সার্বজনীন। সবার স্বজন। সংবাদে, অনুষ্ঠানে হয়ে উঠি সবার আনন্দের উৎস। এটাই আমাদের মিডিয়া কর্মীদের প্রেরণা। মন খারাপের দিনে একমাত্র শান্তনা।

লেখক: সহকারি বার্তা সম্পাদক, বৈশাখী টেলিভিশন।