বিচার পাননি নাদিয়া, কবে পাবেন?

বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০১৩

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

Nadia Sharmeen(২৫ জুলাই ২০১৩)- রাজধানীর মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ চলছিল। দিনটি ছিল ৬ এপ্রিল। অফিসের নির্দেশে সেই সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহের জন্য পুরানা পল্টন মোড়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দাঁড়িয়েছিলেন একুশে টেলিভিশনের ক্রাইম রিপোর্টার নাদিয়া শারমিন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তিনি হামলা শিকার হন। সহকর্মীদের সহায়তায় রক্ষা পেলেও আহত হন মারাত্মকভাবে।

হেফাজতের সমাবেশে নারী সংবাদকর্মী কেন? এমন প্রশ্ন তুলে তার ওপর উন্মাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে হেফাজতে ইসলামের লেবাসধারী কিছু মধ্যযুগীয় বর্বর। পর্দার প্রশ্ন তুলে ইসলাম রক্ষার দোহাই দিয়ে তাকে বেদম মারপিট করা হয়। দৌড়ে প্রাণ বাঁচাতে গেলেও পেছন থেকে তাকে বারবার আঘাত করা হয়। শেষ পর্যন্ত সহকর্মীদের সহায়তায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সঙ্গে সঙ্গে সম্প্রচার করা হয় গণমাধ্যমে। দেশব্যাপী তীব্র সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

আহত নাদিয়াকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ঘটনার পর রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনার পর প্রায় চার মাস কেটে গেলেও এর কোনো বিচার হয়নি। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার জন্য কোনো সহায়তা। সাংবাদিক নির্যাতনের নতুন নতুন ঘটনায় চাপা পড়ে গেছে নাদিয়া ইস্যু। হয়তো অনেকে ভুলেও গেছেন সেই দিনটির কথা।

নাদিয়া এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। ফিরতে পারেননি কর্মস্থলে।

হেফাজতের হামলার ঘটনা, বর্তমান শারীরিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বৃহস্পতিবার নাদিয়া শারমিন খোলামেলা কথা বলেন বাংলামেইলের নিউজরুম এডিটর কাজল কেয়ার সাথে। বাংলামেইল২৪ডটকমের সৌজন্যে তার বক্তব্যের চুম্বক অংশ প্রেসবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেছি ২০১০ সালে। এর আগেই ২০০৯ সালে যোগ দেই একুশে টিভিতে। সেখানে কাজ করি ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি একুশে টিভিতেই আছি।

মা-বাবা ও এক বোনকে নিয়ে আমাদের ছোট্ট সুখের সংসার। পরিবার আমাকে সব সময়, সব পরিস্থিতিতে সাপোর্ট দিয়ে আসছে। আমার প্রতি তাদের আস্থা আছে। তাই আমার সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম দেয় আমার পরিবার, আমাকে সাহস যোগায়।

৬ এপ্রিল হেফাজতের কর্মসূচিতে অফিসের নির্দেশে আরেকজন রিপোর্টারের বদলে আমি ওখানে গিয়েছিলাম। পল্টন মোড়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ হেফাজতে ইসলামের একজন কর্মী আমাকে ধমকের স্বরে বলেন, ‘পুরুষদের মধ্যে কেন এসেছেন।’ আমি বললাম, ‘আমি একুশে টেলিভিশনের সাংবাদিক, দায়িত্ব পালন করতে এখানে এসেছি।’ একথা বলতেই হেফাজত কর্মীরা আমাকে পেটাতে শুরু করে। ১০ থেকে ১২ জন হেফাজতকর্মী আমাকে মারতে মারতে ৫-৬ বার মাটিতে ফেলে দেয়।

আমি কোনো রকম উঠে দৌড়ে বিজয়নগরের দিকে চলে যাই। এ সময় ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মী পেছন পেছন এসে আমাকে মারতে থাকে। আমি অসহায় হয়ে আশপাশের লোকজনের কাছে সাহায্য চাইলে কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে আমার সহকর্মীরা খবর পেয়ে সাহায্যের জন্য ছুটে আসেন। এরপর তাদের সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীরা আমাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।

ওইদিনের হামলায় আমার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। টানা চারমাস ধরে আমি বিছানায় পড়ে আছি। অথচ আজ পর্যন্ত আমার ওপর হামলার কোনো বিচার পাইনি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা বা আশ্বাসও আমাকে দেয়া হয়নি। প্রথম দিন কয়েকজন দেখা করতে এসেছিলেন। এখন আর কেউ আসেন না। কিন্তু আমার পরিবার সব সময় আমাকে সাপোর্ট দিয়ে আসছে। তারা আমাকে সাহস যুগিয়েছে।

পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। এরপর আবার আমি ফিরে যাবো আমার কর্মস্থলে। আবার বের হবো রিপোর্টিংয়ে।

বুঝতে পারছি না আমার ওপর এরকম অন্যায় হামলার বিচার কোথায় গিয়ে আটকে আছে। তাবে আমার মনে হয়, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হামলার ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে ঝামেলা অনেক বাড়বে। সাংবাদিক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার ঘটনা আরও বাড়বে।

হেফাজত যে আসলে কী চায় আর তাদের চিন্তা-ভাবনা কী, সেটা তাদের দফা এবং ভিডিও দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। আহমদ শফীকে বোঝার জন্য তার বক্তব্যই যথেষ্ট। এই মানুষটা এবং তার অনুসারীরা ক্ষমতা পেলে মেয়েদের যে কী অবস্থা হবে তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ আসলে কী চায়?

সাংবাদিকতাকে এখন সবাই খুব সহজ মনে করে। ডাক্তারি না শিখে যেমন ডাক্তার হওয়া যায় না, তেমনি সাংবাদিকতা না শিখেও সাংবাদিক হওয়া যায় না। আমি বলছি না সাংবাদিক হওয়ার জন্য সাংবাদিকতা বিভাগেই পড়তে হবে। তবে এর কিছু বেসিক জিনিস থাকে। এগুলো আয়ত্ব করা খুবই জরুরি। সাংবাদিকতার বড় বিষয় হচ্ছে নৈতিকতা। আর এই নৈতিকতা আসে মানুষের ভেতর থেকে।

সাংবাদিকতা যেন ব্যবসা না হয়। কারণ যখনই এটাকে কেউ ব্যবসা মনে করবে, তখন সে সাংবাদিকতার নৈতিকতা হারাবে, নিরপেক্ষতা হারাবে। বর্তমানে যেভাবে গণহারে সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে এবং বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে, এতে সাংবাদিকতা পেশা আগামীতে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ দরকার। সাংবাদিকতার মান যাচাই করা দরকার।