ফটো তুলব, নাকি জীবন বাঁচাব?

বুধবার, ২৪/০৭/২০১৩ @ ১২:০২ অপরাহ্ণ

আনিসুল হক ::

tv journalistআমেরিকায় কিংবা জাপানে রাতের বেলা ফাঁকা রাস্তায়ও কেউ ট্রাফিক সংকেত অমান্য করে না। সবাই লালবাতি দেখলে দাঁড়িয়ে থাকে। বাতি সবুজ না হওয়া পর্যন্ত নড়ে না। এর একটা কারণ, অভ্যাস। আইন তারা মানতে চায়। কলকাতার লোকজনও খুব ট্রাফিককানুন মেলে চলে। আরেকটা কারণ হলো, ক্যামেরা। ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে ক্যামেরায় ছবি তোলা হচ্ছে, নিয়ম ভঙ্গ করা হলে ঠিকই বাড়ির ঠিকানায় জরিমানার চিঠি যায় পৌঁছে।

উন্নত দেশগুলোয় অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ক্যামেরার ভূমিকা খুব বেশি। অপরাধী শনাক্ত করার জন্যও ক্যামেরার সাহায্য নেওয়া হয়। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ম্যারাথন দৌড়ের সময় বোমা বিস্ফোরিত হয়। ওখানে যত ক্যামেরা ছিল, টেলিভিশনের, মানুষের মোবাইল ফোনের, সব ছবি নিরীক্ষণ করে এফবিআই শনাক্ত করে দুজন সন্দেহভাজনকে। এ রকমটা ইংল্যান্ডের টিউব রেলে বিস্ফোরণের সময়ও করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ গরিব দেশ, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যামেরা খুব বেশি নেই। থাকলেও সেসব চালু আছে কি না এবং কাজে লাগে কি না সন্দেহ। কিন্তু বাংলাদেশে আছে সাত কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী। এবং এদের অনেকের ফোনসেটেই আছে ক্যামেরা, এমনকি ভিডিও ক্যামেরা। ফলে এই যুগে বহু অপরাধের চিত্র সাধারণ মানুষের ধারণ করা ক্যামেরা থেকে পাওয়া সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে এসব ছবি ব্যবহার করতে পারে অপরাধ দমনে ও অপরাধী শনাক্তকরণে।

আমার চিন্তা, এই ছবি কীভাবে পাওয়া যাবে, কোনটা ব্যবহার করা হবে, তা নিয়েও নয়। আমার চিন্তা হলো, একেবারে ক্যামেরার সামনে যে ভয়াবহ অপরাধের ঘটনাগুলো আমরা ঘটতে দেখলাম, যেসবের ভিডিও ফুটেজ আমরা টেলিভিশনে দেখেছি, ইন্টারনেটে ছড়ানো আছে, সেসবের ক্ষেত্রে অপরাধীকে শনাক্ত করা খুবই সহজ, তাই অপরাধীর গ্রেপ্তার ও শাস্তির নিশ্চয়তা আমরা দাবি করতে পারি কি না। ধরা যাক, বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড। এটা কারা ঘটিয়েছে, কীভাবে ঘটিয়েছে, এটা তো ভিডিওতেই স্পষ্ট।

২০ জুলাই ২০১৩ টেলিভিশনে খবর দেখছি। দেখি, একদল মানুষ লাঠিসোঁটা হাতে একটা গাড়িবহরকে আটকে রেখেছে। তারা গাড়ি ভাঙছে। একটা ছাদ-ফুটো গাড়িতে এক ভদ্রলোক মাথা বের করে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। একজন লাঠিওয়ালা সেদিকে এগিয়ে গেল। বেশ ধীরেসুস্থে সে লাঠির আঘাত বসাল ফোর হুইল গাড়ির ছাদ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সফেদ-পোশাকের নেতাটির মাথায়। পুরো দৃশ্য অকর্তিত অবস্থায় টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা আছে। খবরে বলা হলো, আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মারামারি এটা। মেজর হালিম নামে একজন যাচ্ছিলেন, এমপি মনোনয়নপ্রত্যাশী, তাঁকে মার দিয়েছে সাজেদা চৌধুরীর সমর্থকেরা। কে মার দিল, কে মার খেল, সব ক্যামেরায় ধরা আছে। এখন এই ঘটনার বিচার হবে কি না। বিচার হলে তাতে এই ফুটেজগুলো আদৌ ব্যবহার করা হবে কি না। আমাদের ধারণা হলো, এই হামলার বিচার হবে না।

কারণ, এর সঙ্গে সাজেদা চৌধুরীর নাম এসে গেছে। এখন সাজেদা চৌধুরী বলতে পারেন, আমার নাম আসছে কোথা থেকে। আমার সমর্থক যে কেউ হতে পারে, যেমন যে কেউ ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা, মোহামেডান কিংবা আবাহনীর সমর্থক হতে পারে। যে মেরেছে তাকে ধরুন। আমরাও ঠিক এই কথাটিই বলতে চাই, ক্যামেরার ছবিগুলোকে আমলে নিন। যে মেরেছে, তাকে ধরবেনই। এরপর তার কাছ থেকে কথা আদায় করুন, কারা তাদের লেলিয়ে দিয়েছে মারপিট করার জন্য। একই দিনের আরেকটি চাঞ্চল্যকর খবর। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক খবর সংগ্রহ করতে গেলে সরকারদলীয় সাংসদ গোলাম মাওলা রনি তাঁদের পিটিয়ে আহত করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

প্রথম আলোতেই ছাপা হয়েছে আরেকটা খবর। শিবির মিছিল বের করার আগে সাংবাদিকদের খবর দেয়, অমুক জায়গায় আসেন, আমরা নামব। ক্যামেরা গেলে তারা ভাঙচুর করে, যানবাহনে পেট্রল ঢেলে আগুন দেয়। ক্যামেরায় সেই সব ছবি ধারণ করে প্রচার করা হয়। তাতে তাদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শিত হয়।

ডয়চে ভেলের ওয়েব পাতায় দেখলাম এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন— বাংলাদেশে প্রশ্নের মুখে টেলিভিশন সাংবাদিকতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টেলিভিশন সাংবাদিকতা’ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিউল আলম ডয়চে ভেলেকে বলেন, সাংবাদিকতার এই প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা অপরাধীদের সঙ্গে একধরনের সহযোগিতা। কোনো ঘটনা পেয়ে গেলে তা ধারণ করা সাংবাদিকতা। কিন্তু কেউ যদি কোনো সাংবাদিককে খবর দিয়ে কাউকে হত্যা করে, আর সেই সাংবাদিক যদি পুলিশকে খবর না দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ফুটেজ ধারণ ও প্রচার করেন, তা কোনো বিবেচনাতেই সাংবাদিকতা হতে পারে না। সাংবাদিকদের এ থেকে বিরত থাকা উচিত। নয়তো যাঁরা এর সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন।

এখানে একটা বিতর্কের অবকাশ আছে। শুধু টেলিভিশন সাংবাদিকদের নয়, খবরের কাগজের সাংবাদিকদেরও ফোন করে বলা হয়, আধঘণ্টা পরে অমুক জায়গায় আমরা মিছিল করব। আলোকচিত্র সাংবাদিকেরা সেখানে দৌড়াতে থাকেন। মিছিল হলে তো হলোই, গোলাগুলি মারামারি ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ—নানা কিছুই ঘটতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সাংবাদিক কী করবেন? তাঁরা কি আগে পুলিশকে জানাবেন? কেউ কেউ বলছেন, সাংবাদিকদের সেখানে যাওয়াই উচিত নয়। কিন্তু আমার মতে, অবশ্যই যাওয়া উচিত। পুলিশকে বলে দেওয়া উচিত কি না! বিতর্ক চলতে থাকুক। তবে গণতান্ত্রিক দেশে যে কেউ মিছিল করতে পারে। পুলিশ যদি মনে করে, অমুক দলের মিছিল মানে সন্ত্রাস বোমাবাজি অগ্নিসংযোগ—পুলিশ ব্যবস্থা নেবেই। এই প্রশ্ন সাংবাদিকতার জগতে আছে, প্রশ্ন উঠেছিল

বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের সময়েও—সাংবাদিকেরা ছবি না তুলে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারতেন কি না। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন প্রথম আলোর সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম। সেখানে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সফররত সাংবাদিকদের একটা ছবি দেখান, সাবওয়েতে পড়ে আছে একটা মানুষ, ট্রেন আসছে। এই ছবিটা পুলিৎজার পুরস্কার পায়। প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকের কী করা উচিত? লোকটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা, নাকি ছবি তোলা। সাংবাদিকতার শিক্ষকের মতে, সাংবাদিকের কাজ ছবি তোলা, বিপন্নকে উদ্ধার করা নয়। আমরা বাংলাদেশের নৈতিকতায় হয়তো তাঁর কথা মেনে নিতে পারব না। আমরা বলব, ছবি পরে তোলেন, আগে মানুষ বাঁচান।

বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা যদি আগে থেকে খবর পান, অমুক জায়গায় অমুক কর্মসূচি আসছে, তা পুলিশকে জানাবেন কি না, এই নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা চলতে থাকুক। কিন্তু যেটা নিয়ে বিতর্ক থাকার কথা নয়, তা হলো—একটা অপরাধের চিত্র যদি ক্যামেরায় ধরা পড়েই, তাহলে সেই অপরাধীকে পুলিশ ধরবে কি না, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কাছেই অনেক ফুটেজ আছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, কে কোন গাড়িতে আগুন দিচ্ছে, কে কাকে পেটাচ্ছে। সেটা যেমন ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের এক নেতার গাড়িবহরে আরেক নেতার সমর্থকদের হামলার বেলায় আছে, তেমনি আছে স্বাধীনতাবিরোধী কিংবা মৌলবাদী শক্তির সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় বা গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনার বেলায়ও। এখন পুলিশ কি পারে না এই অপরাধীদের শনাক্ত করতে? তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে?

আমাদের পুলিশের লোকবল কম, সরঞ্জাম প্রযুক্তি কম, তার পরেও পুলিশ পারে না এমন কিছুই প্রায় নেই। সরকার চাইলেই পুলিশের পক্ষে এটা করা সম্ভব। সরকার এটা চাইছে না কেন?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিসিএস পরীক্ষায় কোটা প্রথার বিরুদ্ধে যাঁরা আন্দোলন করেছেন, তাঁদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হবে এবং এঁদের কাউকে আর নিয়োগ দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী এটা কোন আইনের বলে বললেন, আমার জানা নেই। বিসিএস পরীক্ষায় বা সরকারি চাকরিতে একজন আইন অমান্যকারী বা প্রমাণিত অপরাধী বাদ পড়বে, সেটা তো জানা কথাই। কিন্তু পরীক্ষায় কাকে নেওয়া হবে, না নেওয়া হবে, সেটা কি প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতার মাধ্যমে নির্দেশ দিতে পারেন?

আমার মনে হয়, কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কথা বলে দুই লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে এক লাখ ৯৯ হাজার জনকে, সেই সূত্রে তাঁদের আত্মীয়স্বজন সূত্রে ২০ লাখ মানুষকে বিরাগভাজন করা ছাড়া কারও কোনো লাভ পাওয়া যাবে না। বরং ভিডিও ফুটেজ যদি দেখতে হয়, তাহলে বড় বড় ফৌজদারি অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে দেখা হোক। কারা ট্রেনে আগুন দেয়, কারা রাস্তায় গাড়িতে আগুন দেয়, কারা হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনে আগুন দিল, তাদের থেকে শুরু করে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড কিংবা ফরিদপুরে মেজর হালিমের গাড়িবহরের ওপর হামলা বা চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের মোটরসাইকেল মিছিলে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করা যেতে পারে। পুলিশের কাজ পুলিশ করুক, সাংবাদিকের কাজ সাংবাদিক।

কিন্তু রাজনীতিবিদদের কাজ কি রাজনীতিবিদেরা করেই যাবেন? আওয়ামী লীগের এক নেতার সমর্থকেরা যখন টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে আরেক নেতার গাড়িবহরে হামলা করেন, তখন মনে হয়, গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার কথা বলে কী লাভ? কিংবা হরতালের আগের দিন যে নির্বিচারে গাড়ি পোড়ানো হয়, এটা কোন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি?

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
সৌজন্যে- প্রথম আলো।