আমরা দুই ভাগে কেন?

মঙ্গলবার, ২৩/০৭/২০১৩ @ ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

সুপ্রীতি ধর ::

আজ বার বার আমার সাগর-রুনি আর নাদিয়া শারমীনের কথা মনে পড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন চ্যানেলের দুজন সাংবাদিককে পেটানোর অভিযোগে আজ সাংবাদিক মহল আবার সরব হয়েছে, আবার তারা রাজপথে নেমেছে। প্রাথমিকভাবে সাংসদ গোলাম মাওলা রনিকে বয়কটের মধ্য দিয়ে সাংবাদিক সমাজের একটা জয় সূচিত হয়েছে। খুবই ভাল উদ্যোগ। প্রশংসার দাবিদার।

কিন্তু আমার সংশয়বাদী মন কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। কিছুতেই আমি বিষয়টাকে আর সবার মতো নিতে পারছি না। কেন? আমার বার বারই মনে হচ্ছে, এটা রনি-সাংবাদিক দ্বৈরথ নয়, এটা সালমান-রনির দ্বৈরথ। সাংবাদিক এখানে ব্যবহার হয়েছে মাত্র। সাধারণ মানুষ কিন্তু প্রতি মূহূর্তেই ব্যবহার হচ্ছে, বলির পাঁঠা হচ্ছে।

খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়, আমরা যারা কাছের বন্ধু-সহকর্মী ছিলাম সাগর-রুনির, তাদের মন থেকে এখনও ক্ষত সেরে উঠেনি। এখনও তাদের অবুঝ সন্তান মেঘ আমাদের সমস্ত মন জুড়ে এক বড় কষ্টের পাথর হয়ে আছে। সাগর-রুনি হত্যার কোন কুলকিনারা আমরা করতে পারিনি, আমাদের এতো ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও। আমরা তখন কারও বিরুদ্ধে কেন কোন অ্যাকশনে গেলাম না, কেন আমরা কাউকে বয়কট করলাম না। তখন তো অনেকগুলো বিষয় আমাদের কাছে খুবই স্পষ্ট ছিল, কার বিরুদ্ধে যাবো, কি করবো, সব জানা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সাংবাদিক সমাজ চুপ মেরে গেছিল। শোনা যায়, আঁতাত হয়েছিল। কিসের আঁতাত? কার সাথে আঁতাত? কেন আমরা জানতেই পারলাম না কে তাদের খুন করেছিল? কেন আমরা একদিনের জন্যও আমাদের সম্প্রচার বন্ধ করতে পারলাম না, কেন?

সাংবাদিক কেন, কারও গায়েই হাত তোলার অধিকার কোন সাংসদের যেমন নেই, তেমনি অন্য কারোরই নেই। আজ দুজন সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে প্রতিবাদ যেমন জোরালো হয়েছে, একুশে টেলিভিশনের নাদিয়া শারমীনকে হেফাজতে ইসলামীর লোকজন যখন সবার সামনে দৌড়ালো, পিটালো, আমরা তখন কোথায় ছিলাম? কেন তখন সবাই এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না? কেন তখনই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে হেফাজতে ইসলামীর সমাবেশ কভার করা থেকে বিরত থাকলাম না? কেন বা পরের সমাবেশও বাদ দিলাম না?

আমরা বলতে এখানে সাংবাদিক সমাজকেই বুঝাচ্ছি। আমরা কি এখন খবর রাখি নাদিয়া শারমীনের? আজ দুজন সাংবাদিক আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, সেই খবর আমরা জানি, তাদের শরীরের দাগও দেখেছি, কিন্তু নাদিয়া যে সেই ৬ই এপ্রিলের সমাবেশের পর থেকেই অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি বসে আছে, পায়ে তার প্লাস্টার (লিগামেন্টের অপারেশনের কারণে), কেউ কি সেই খবর রাখি? সেদিন অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার কারণে একুশে কর্তৃপক্ষ যে তাকেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে, চিকিৎসার কোন খোঁজখবরও নেয়নি, বেতনও পায়নি, চাকরিটাই আসলে নেই, সেই কথা কি সাংবাদিক নেতারা জানেন? তারা কি কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন এর বিরুদ্ধে? অথচ সাংবাদিক মাত্রই জানেন, অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়া কোন রিপোর্টারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। তাহলে নাদিয়া কেন আজ শরীরে এতো বড় ক্ষত আর চাকরি হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে একা দিন কাটাচ্ছে? কেন আমরা তার পাশে নেই?

ফেসবুকে একজন সাংবাদিকদের ওপর বিষোদগার করে লিখেছেন, “রনি কেন যে কোন নারী সাংবাদিককে পিটালো না বুঝলাম না । একজন নারী সাংবাদিককে অপদস্থ করলে কিছু হয় না, এটি বুঝতে হবে। দেশের যত গুন্ডা ,বদমাশ, লাফাঙ্গা , কুলাংগার, চাঁদাবাজ আছে, সবাই যে কোন একটি সংবাদপত্রের পুরুষ সাংবাদিক হয়ে যাক । এরপর চালাক তাদের কুকর্ম । সাত খুন মাফ । পুরুষ সাংবাদিকদের রক্ষার জন্য তাদের সংস্থাগুলো তৎপর । ১৬ সম্পাদক আছে না? এই নারী সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করেছে কে কে, তা আমাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকগণ খুঁজে বের করেন না কেন”?

আমি জানি না, কে কে এই কথাগুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করবেন, আমি অন্তত করতে পারছি না। সাগর-রুনি হত্যার পর নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের একটি মানববন্ধনে আমাদের বড় আপা নাসিমুন আরা হক মিনু ক্ষোভের সাথেই বলেছিলেন, আজ যদি সাগর খুন না হয়ে শুধুই রুনি খুন হতো, তাহলে কি এতো বড় আন্দোলন হতো? হতো না আমি নিশ্চিত।

তাহলে বিষয়গুলো কি দাঁড়াচ্ছে? রুনি-সাগরের বিষয়টি ধামাচাপা পড়লো কার বা কাদের ইঙ্গিতে? নাদিয়ার পাশেই বা কেন দাঁড়ালো না সাংবাদিক সমাজ? নাদিয়া একান্তই নারী রিপোর্টার বলে? নাকি কারও নির্দেশে?

খুব হতাশা লাগে এসব দেখে-শুনে। কার জন্য লড়াই আমাদের, কিসের বিরুদ্ধে লড়াই, সেটাই বুঝতে পারি না। ন্যায়ের পথে থেকেও শুধুমাত্র নারী সাংবাদিক বলে আমরা অবহেলার শিকার হবো? অথবা ক্ষমতার রোষানলের শিকার হবো? আজ কথা বলছিলাম নাদিয়ার সাথে, ওর গলাতেও হতাশার সুর। জানি না, বাসায় শুয়ে শুয়ে ও কী ভাবছে? তার নীরব প্রতিবাদ কি ছুঁয়ে যায় না কাউকে?

লেখক: সাংবাদিক।
সৌজন্যে- উইমেন চ্যাপ্টার

সর্বশেষ