Before Die Live

বৃহস্পতিবার, ২৫/০৭/২০১৩ @ ৩:১৭ অপরাহ্ণ

শারমীন রিনভী ::

sharmin-সম্প্রতি গিয়েছিলাম মার্কিন মল্লুকে। এবারই প্রথম তা নয়, কিন্তু বিশ্বের ১ নম্বর এ দেশটিতে যেতে বরাবরই আমার একটু অস্বস্তি হয়। কেমন যেনো ইট কাঠ পাথরের দেশ মনে হয়। মানুষগুলোও যেনো ইট কাঠ পাথর, অনুভূতি শূন্য, ভাবলেষহীন। দিন নেই রাত নেই, শুধু ছুটছে তো ছুটছে। তারপরও ক্ষমতার শীর্ষ দেশ বলে কথা, একটু উত্তেজনা তো থাকেই। তবে এবারের যাওয়াটা একটু অন্যরকম। কাজ নয় শুধুই ঘুরে বেড়ানো। সাংবাদিকের জন্য যা একেবারেই অসম্ভব, যেনোবা স্বপ্ন। সেটাই পূর্ন হয়েছে এবার।

আমেরিকা ঘোরার এক পর্যায়ে ফ্লোরিডা হয়ে মায়ামী থেকে গিয়েছিলাম মেক্সিকো। ছোটবেলায় ওয়েস্টার্ন গল্পে-রেঞ্চ, আউট ল’, বিদ্যুৎগতিতে রিভালবার বের করে গুলি করা.. এসব স্মৃতির কথা আসলেই মনে পড়ে মেক্সিকোর কথা। তাই মেক্সিকোর কজুমাল আইল্যান্ডে যাওয়ার সময় আমি ছিলাম অনেকটা স্মৃতি কাতর। মনে হচ্ছিলো সত্যিই যদি কোন রেড ইন্ডিয়ান আমার সামনে পড়ে, সত্যিই কি আউট ল’রা এখনো গল্পের মতো গোলাগুলি করে? চিন্তা গুলো ছিলো, অনেকটা ছেলে মানুষী ভাবনায় পূর্ণ। তার উপর জীবনের প্রথম জাহাজে করে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার বিষয়টি ছিলো, অনেক আগে দেখা রঙিন স্বপ্ন পূরণ। ১০ তলা জাহাজ দেখে মনে পড়লো টাইটানিক সিনেমার কথা। এই জাহাজটা টাইটানিকের জাহাজটার মতোই বিশাল। একবার মনে হলো, এটাও ডুবে যাবে না তো?

জাহাজে প্রথম দিন ‌আর রাতটা কাটালাম গল্পের বই পড়ে। আর মাঝে-মাঝেই জানালা দিয়ে দেখছিলাম আটলান্টিক মহাসাগরের নীল পানি। আকাশের সাথে জলরাশির মিতালী। দেখছিলাম সী-গালের মতো পাখিগুলোর উড়াউড়ি। পরদিন জাহাজের ডেকে গেলাম। এ যেনো বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ভাষাভাষীর এক মিলন মেলা। কেউ সুইমিং পুলে সাঁতরাচ্ছেন, কেউ বুদবুদ ওঠা উষ্ণ পানি জাকুজিতে বসে আনন্দ করছেন, রোদ পোহাচ্ছেন কেউ, রক মিউজিকের তালে নাচছিলেন কেউ। আবার কেউবা ডেকে সাজানো বিভিন্ন দেশের খাবার খাওয়ায় ছিলেন ব্যস্ত। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সব। হঠাৎ দেখা হলো একদল বৃদ্ধার সাথে। তাদের কারো বয়সই ৮০ বছরের নীচে হবে না। এসেছেন স্পেন থেকে। রংচং-এ গাঢ় রঙের কাপড় পরা, চোখে কাজল, ঠোটে লাল লিপস্টিক, গালে ব্লাশঅন দিয়ে টুকটুকে বুড়ি। ওনাদের দেখতে খুব ভালো লাগছিলো। কারণ তাদের চোখে মুখে ছিলো ভয়ানক আনন্দ। এগিয়ে গেলাম পরিচিত হতে। ইংরেজীতে নিজের নাম-ধাম বলে হ্যান্ডসেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু ওরা আমার সাথে কথা না বলে একজন অন্যজনের দিকে তাকাতে থাকলো। তারপর বললো, নো ইংলিশ। বুঝলাম তারা ইংরেজী বলতে পারে না। ঠিক তখনই ২৪/২৫ বছরের মেয়েটি এগিয়ে এসে আমাকে জানালো বুড়িদের দলের গাইড সে। এই দোভাষীর মাধ্যমে টুকটুকে বুড়িদের সাথে আড্ডা চালালাম। জানলাম কয়েক বান্ধবী মিলে স্পেন থেকে এসেছে ক্রুজ ভ্রমণে, সমুদ্র দেখতে। গল্প করতে করতে ভাবছিলাম আমাদের দেশের মেয়েদের কথা। শহরে কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও গ্রামে ৩০ বছরেই বৃদ্ধা হয়ে যায় মেয়েগুলো। নিজেদের জীবনের স্বাদ, আহ্লাদ, আনন্দ, ম্রিয়মান হয়ে যায়। আর যারা সত্যিই বৃদ্ধা, বয়স ৫০ এর কোঠায়, তারা তো মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এই বৃদ্ধা আর আমাদের দেশের বৃদ্ধাদের কতো তফাৎ!

জাহাজে যে ক’দিন ছিলাম ডেকে বসে প্রায়ই দূর থেকে আমার চোখ একটা মেয়েকে ফলো করতো। মেয়েটার বয়স ৪০/৪৫ বছর হয়তো হবে। যদিও চেহারা দেখে এখন মেয়েদের বয়স বোঝা কষ্টকর, তার উপর উন্নত দেশের মেয়েরা তো আরো সচেতন। যাহোক, মেয়েটা দেখতে মোটামুটি সুন্দরী। গায়ের রঙ যে সুন্দর হবে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। লম্বাও হবে প্রায় ৫ ফিট ৭/৮ ইঞ্চি। কিন্তু আমি তাকে লক্ষ্য করতাম অন্য কারণে। সে হাঁটতে পারে না, চলাফেরা করে হুইল চেয়ারে করে। তার হুইল চেয়ারে ব্রেক, হর্ন, সব আছে। আমি তাকে দেখতাম আর ভাবতাম, আমাদের দেশের এই বয়সী একটি মেয়ে প্যারালাইসিসের রোগী হলে, এই মেয়েটির মতো তার কি এমন মনোবল আছে, সে ঘুরতে আসবে ক্রুজে! সে তো হয়ে যায় পরিবার আর সমাজের বোঝা। বেঁচে থেকেও সে তো থাকে মৃত মানুষের মতো। গঞ্জনা আর কষ্টই তার নিত্যদিনকার সঙ্গী। কিন্তু এই মেয়েটি? কি হাস্যজ্জ্বোল! কাউকে কেয়ার করছে না। তার সাথের যে ছেলে সঙ্গীটি আছে সেও কতো কেয়ার নিচ্ছে মেয়েটির। গভীর ভালোবাসায় কখনো জুস, কখনো খাবার এনে দিচ্ছে তাকে। কখনো এক সাথে বসে অপলক তাকিয়ে থাকছে সমুদ্রের দিকে। আমি দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে তাদের ভালোবাসা দেখতাম। একদিন ডেকে গিয়ে দেখি মেয়েটা একা বসে। সুযোগ পেয়েই এগিয়ে গেলাম তার দিকে। হাসি দিয়ে বললাম, ‘বসতে পারি তোমার পাশে’? হেসে বললো, ‘অবশ্যই’। নিজের পরিচয়, নাম-ধাম দিলাম প্রথমেই, যেহেতু পরিচিত হওয়ার আগ্রহটা আমারই। সে জানালো তার নাম জেসিকা। আমেরিকান। পড়ালেখা করেছে ইনফরমেশন টেকনোলজি নিয়ে। কথায় কথায় জানতে চাইলাম, সঙ্গীটি কোথায়? বললো সঙ্গীটি তার বয়ফ্রেন্ড, একসাথে থাকে তারা। হ্যারী। গেছে জাহাজের প্লে গ্রাউন্ডে টেবিল টেনিস খেলতে। কথায় কথায় জানা গেলো তার জীবন কাহিনী। ভালো চাকরি করতো জেসিকা। হাসবেন্ড আর বাচ্চা নিয়ে হ্যাপি ফ্যামিলিই ছিলো তার। একটানা অনেকদিন কাজের প্রেসার যাচ্ছিল আর তাতেই বিপত্তি ঘটে। মাথা ব্যাথার পর হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে যায় জেসিকা। যখন জ্ঞান ফেরে ডাক্তার জানান তার পা প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। সেই সময়ের বিভীষিকাময় সময়ের কথা মনে করে শিউরে উঠছিলো জেসিকা। চাকরি চলে গেলো জেসিকার, ভালোবাসার স্বামীটিও ডিভোর্স দিয়ে গেলেন চলে, সঙ্গে নিয়ে গেলেন তার ছেলেকে। কোর্টকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, বাচ্চাটির টেককেয়ার কোনোভাবেই জেসিকা করতে পারবে না। জেসিকা কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘আসলেই তো, আমি তো আমারই কেয়ার নিতে পারি না, বাচ্চাকে পালবো কিভাবে?’ চুপ করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলো জেসিকা। আর আমি ভাবছিলাম, মেয়ে, সে বাংলাদেশিই হোক, আর আমেরিকানই হোক, কষ্টগুলো একই। কিছুক্ষণ পর জেসিকা বললো, “আমি মরেই যেতাম, কিন্তু হ্যারীই আমায় বাঁচতে শেখালো। ও ছিলো আমার ডাক্তার। আমি তার কাছে চিকিৎসার জন্য যেতাম, সুইসাইড করার কথাও ভেবেছিলাম কয়েকবার। ও-ই আমায় পরামর্শ দিলো এই হুইল চেয়ারটা কেনার। সমুদ্রে বেড়াতেও এসেছি ওর আগ্রহেই। প্রায়ই ভাবি মরে তো যাবোই। বিফর ডাই…লীভ”। জেসিকার মতো আমিও এখন ভাবি Before Die.. Live। ভবিষ্যৎ নিয়ে আর ভাববো না। বাঁচবো প্রতিদিনের জন্য।

শারমীন রিনভী, নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন।
(কণ্ঠস্বর থেকে সংগৃহীত)

সর্বশেষ