হাতে গোনা দুই

মঙ্গলবার, ২৩/০৭/২০১৩ @ ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

শাহনাজ বেগম ::

Sahnaj-হাতে গোনা দুই! মাহমুদা আপা আর গুলশান আপা। একজন শ্যামা অন্যজন গৌরী। একজন চোখে পড়ার মতো উচ্চতায় অন্যজন দীঘল কালো ঘন মেঘের চুলে সুডৌল মুখমন্ডল, কপালে বড় টিপের সদা লাস্যময়ী মাহমুদা আপা।

এ দুজন নারী সাংবাদিক আমাকে আলোড়িত করে। চিনি না, কিন্তু বেগমের ‘মহুয়া’ যে মাহমুদা চৌধুরী এটুকু জানার পর কেবলই ভাবি, কী অসাধারণ, সাবলীল, তুখোড়, বুদ্ধিদীপ্ত জবাব দেন তিনি। মনে হয়, ভাবতে হয় না তাকে, সবই জানেন তিনি! আহা কী চমৎকার!

প্রয়াত গুলশান আপা! অবিশ্বাস্য অবেলায় তিনি মিলিয়ে গেছেন। সকল ভ্রুকুটি ঠেলে অত্যন্ত সনাতণী বনেদী ঘরের বউ হয়েও নামমাত্র মূল্যে লেখা ছাপাতে কী ব্যাকুল তিনি! দ্বন্দ্ব সর্বত্রই। ঘরে-অফিসে, রাজনীতি-সমাজ, শিল্প-সাহিত্য সব বিষয়ে তাঁর সীমাহীন আগ্রহ। ব্যক্তি জীবনে কবি। অত্যন্ত সংবেদনশীল। সৌন্দর্য পিপাসু। জীবনের চরাই উৎরাই নিয়েও সাংবাকিতা পেশায় লড়তে লড়তে না ফেরার দেশে যাত্রা করেন তিনি।
মর্জিনা আপা, ভিন্ন ঘরণার। আমি খুব কম জানি তাঁর সম্পর্কে। দূর থেকে আজও দেখি তাকে বিনম্র শ্রদ্ধায়।

এই এক আর আগের দুই মিলে তিন। এ তিনজন আমার কাছে তিন নক্ষত্রের নাম।
কী রক্তক্ষরণ নিয়ে এগিয়ে গেছেন তাঁরা, পথ নির্মাণ করেছেন আমাদের জন্য তা আজকের মেয়েদের বোধেরও অগম্য। আমার এই তিন অগ্রজকে শ্রদ্ধা জানাই অকুণ্ঠ চিত্তে। কারণ সাংবাদিকতা পেশায় নেশারও মিশেল লাগে তা আমি তাদের জীবনাচরণে দেখেছি। মানুষ মাত্রই দোষ-গুণের সংমিশ্রণ। এ সত্য মাথায় রেখে বলছি তাঁরা অনন্যা!

‘যোগাযোগ বার্তা’। ঝকঝকে মলাট, গ¬সি পেপারে এক রঙ্গিণ ম্যাগাজিন। আশির দশকের মাঝামাঝি সিদ্ধেশ্বরী রোড থেকে বেরোতো। সম্পাদক শিরীন রহমান জাহিদ। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ডাকসেটে চীনপন্থী নেতা আনোয়ার জাহিদের স্ত্রী। হলুদ একটি তিনতলা বাড়ির নিচতলায় অফিস। কী পারিপাটি! অসাধারণ সুন্দরী দুই নারী বসে কথা বলছেন। আমার পা … না। মিষ্টি করে হেসে একজন জানতে চাইলেন, তুমি ‘শাহনাজ’। মাথা ঝাঁকালাম। উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার টেনে বসতে দিলেন। সবুজ জর্জেট শাড়ি পরা আর কপলে কালো টিপ, একহারা গড়নের এক সুন্দরী নারী! হেসে বললেন, ‘আমিই গুলশান। বসো।’ পাশের সোফায় বসে থাকা ভদ্রমহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আপা, আপনাকে শাহানা আপা (আলমগীর ভাইয়ের স্ত্রী) ওকে পাঠাবে বলেছিলো।’ আমি কিছুটা আড়ষ্ট। দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখছিলাম। এতো পরিপাটি বেশভূষায় খুব কম নারীকে দেখেছি। ভাবছি এরা আসলেই সাংবাদিক!

১২টায় কথা শুরু হলো। কভার স্টোরি লিখতে হবে। মনোপূত হলে ২৫০ টাকা পাবো। এসব ঠিক হবার পরই শিরীন আপা বললেন, ‘এসো।’ আমি রওয়ানা হতেই বললেন, ‘ওদিকে না।’ গুলশান আপা হাত ধরে ডাইনিংয়ে নিয়ে গেলেন। বললেন ‘আমাদের সঙ্গে খাবে।’ আমি খুব লজ্জা পেয়ে না; না ; বলে উঠলাম। জবাবে বললেন, ‘কোথায় খাবে এ দুপুরে?’ তখন ঢাকায় আজকের মতো এতো খাবারের দোকান গড়ে ওঠেনি। আমাকে ইউনির্ভাসিটিতে যেতে হবে। মধুতে যাবো। বিকেলে মিছিল আছে সংগ্রাম পরিষদের। সব মিলিয়ে ভাবছি। টেনে বসিয়ে দিলেন গুলশান আপা। খেতে বসে পড়লাম। আহা! আজ আর এমন দৃশ্য কই? কে কাকে সুধায় সবাই তো ভী-ষ-ণ ব্যস্ত!

এ ভাবেই অগ্রজ মেয়েদের চিনতে শুরু করলাম। তখন লিখি; বিচিন্তা, ঢাকা কুরিয়ার, নয়পদধ্বনী, আগামী, পূর্বাভাসে। নিয়মিত কাজ করি কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আনন্দ বাজার’ পত্রিকা আর প্রবাসী ‘আনন্দ বাজার’এ।

আমার প্রিয় বড় আপাদের চারপাশে ঘুরপাক খাই। কুরিয়ারে বসেন ‘মিতি আপা’, কী দারুণ খোলা তরবারী-ক্ষুরধার কথা বলেন। এডিট করেন। ওদের দেখে নেশা লাগে ‘সাংবাদিক হবো’।

যোগাযোগ বার্তায় কভার স্টোরি হয়ে গেছে। আমি খুশি। কপিটা দিলাম গুলশান আপাকে।
‘কী যা-তা লিখেছো? কথা পেঁচিয়ে বলা সাংবাদিকতা নয়। এর ইতিহাস কোথায়, ক্রম বিবর্তনের ধারাবাহিকতা নেই কেনো? শব্দগুলো সেকেলে কেনো? ছোট বাক্যে লেখো।’ হিলে শব্দ তুলে গুলশান আপা চলে গেলেন। আমার নেশা কেটে যায়। এই রে, বুঝি আর সাংবাদিকতা হবে না!

পনেরো মিনিট পর গুলশান আপা তিন চারটি বই নিয়ে ফিরে আসেন। ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করা গুলশান আপা! বলেন, ‘দেখো; এগুলো পড়। এটি এনসাক্লোপেডিয়া। কোথা থেকে কিভাবে এর উৎপত্তি, বিকাশ তার সবটা পড়। তারপর তোমার দেখা আজকের সঙ্গে মিলিয়ে দাও। ভাবো কী করে শব্দের মালা গাঁথবে। পাঠক যেন একই সঙ্গে তথ্য আর শব্দের মায়াজালে জড়িয়ে যায়…।’

আমি আরও মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। প্রতিজ্ঞা করি আমাকেও পারতে হবে এভাবেই। আমরা ইতিহাস-রাজনীতি আর সংস্কৃতি নিয়ে অনেক দূর ভাবি।
এখন মনে পড়ে গহনার ওপর স্টোরি করতে গিয়ে সাতটা বই পড়তে দিয়েছিলেন গুলশান আপা!

আজ কী এমন কোনো নির্বাহী সম্পাদক আছে? এসব আজ আর কোথায় পাবো!
মাহমুদা আপার সঙ্গে আজও যখন কথা বলি আলোচনায় কত কিছু তুলে আনতে পারেন তিনি। এ আলাপচারিতা যেমনি মিষ্টি, তেমনি ইতিহাস-সংস্কৃতি আর জেন্ডারজ্ঞান সমৃদ্ধ। এসব কথা মিথ্যে শব্দের ফাঁকাবুলি নয়; নিরেট সত্য।

সংখ্যার দিক থেকে মিডিয়াতে নারীর উপস্থিতি এখন চোখে পড়ার মতো। একটি কপির শুরু থেকে শেষ অব্দি কিভাবে তথ্য সমৃদ্ধ করতে হবে তার কারিগররা ওদের সহযোগিতায় আছে তো?

আমি ভাবি আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগেও দু‘তিনটি ভালো ম্যাগাজিন মেয়েদের হাত দিয়ে বের হতো। দিল মনোয়ারা মনু আপা, গুলশান আপা, মাহমুদা আপারা এসব দায়িত্ব বহু বছর পালন করেছেন। কিন্তু আজ এসব জায়গায় কোনো নারীকে দেখি না। এর মানে এই নয় যে সাংবাদিকতায় মেয়েরা ভালো করছে না। এদের হাত দিয়ে তো বহু পুরুষ সহকর্মীকেও গড়ে উঠতে দেখেছি আমি। প্রাচীন প্রবাদটি মনে পড়ে ‘সংখ্যায় বাড়লে মানে কমে।’

তবে কী সংখ্যার দিক থেকে আমাদের আরও বাড়তে হবে? তাহলেই আমরা গুলশান, মাহমুদা হয়ে লায়লা সামাদ অব্দি পৌঁছাতে পারবো? যে পথের ‘এপিটাফে’ লেখা আছে ‘এরা কারো কন্যা-জায়া-বন্ধু পরিচয়ের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠেননি। খুঁড়িয়ে-গড়িয়ে নানান প্রতিকূলতায় সমাজ-সংসারে এরা দলিত হয়েছেন কিন্তু পরাভূত হননি। সাংবাদিকতা যে পেশা, সেই পেশাটিকে জীবনের সব সংকটেই বুকে আগলে রেখেছেন। পেশার প্রতি নির্মোহ এসব নারীর জীবন নির্যাস আজকের মেয়েদের পথচলা মসৃণ করেছে। এরা গেয়েছেন পেশার জয়গান।’ জয়তু মাহমুদা-গুলশান আপা।

কৃতজ্ঞতা: কণ্ঠস্বর
লেখক: জ্বালানি বিষয়ক রিপোর্টার

সর্বশেষ