জাতীয় প্রেসক্লাবের লজ্জা!

সোমবার, ১১/০২/২০১৩ @ ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

জাহিদ নেওয়াজ খান, বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল আই
jewel-nameআব্দুল কাদের মোল্লার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায়ের আগের দিন ফেইসবুকে আমার স্ট্যাটাসটি ছিলো এইরকম: জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য আব্দুল কাদের মোল্লা। শুনেছিলাম তার প্রেসক্লাবের সদস্যপদ স্থগিত আছে। ভেবেছিলাম মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে বলে সদস্যপদ বাতিল করার মতো সুমতি না হলেও অন্ততঃ স্থগিত রেখে কিছুটা পাপমোচন করেছে জাতীয় প্রেসক্লাব। কাদের মোল্লার মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পর জানতে পারলাম, তার প্রেসক্লাব সদস্যপদ স্থগিত আছে চাঁদা না দেওয়ার কারণে। সদস্যপদ স্থগিত হওয়ার সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

আমার স্ট্যাটাসে মন্তব্য করতে গিয়ে কিছু বাড়তি তথ্য দিলেন কেউ কেউ। তাদের একজন সিনিয়র সহকর্মী আনিস আলমগীর। তিনি জানালেন, এদের সদস্যপদ স্থগিতও নেই। গতবার ভোটার লিস্টে নাম ওঠে নি হয়তো চাঁদা দেয়নি বলে। তবে এটাও ঠিক যে, যেহেতু তারা সদস্য(কিভাবে হয়েছে সে বিতর্কতো আছেই) তাদেরকে বাদ দেওয়া হবে কোন দোষে! মামলায় রায় হোক, দোষী প্রমাণিত হোক… তখন বোঝা যাবে জাতীয় প্রেসক্লাব তার গঠনতন্ত্র কতটা মেনে চলছে।

আনিস আলমগীর ভাইয়ের তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেলো সদস্যপদ স্থগিত আছে বলে যে কথা জেনেছিলাম তা-ও ভুল। মোল্লা এবং কামারুজ্জামান এখনও যথারীতি জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য, শুধুমাত্র এবারের ভোটারলিস্টে তাদের নাম ওঠেনি তারা কারাগার থেকে চাঁদা পাঠাতে পারেন নি বলে। এ তথ্য জানানোর জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানোর সঙ্গে আমি ফেইসবুকেই লিখলাম: পদ্মাসেতুর দুর্নীতি এখনও প্রমাণ না হলেও সরকারি কর্মকর্তারা সাসপেন্ড হয়েছেন। মোল্লা-কামারুজ্জামানদের অপরাধ খুব সুশিলীয়ভাবে দেখলেও অভিযুক্ত হওয়ার পর অন্ততঃ এ কারণে তাদের সদস্যপদ স্থগিত করা যেতো।

উত্তরে আনিস আলমগীর লিখেছেন: আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত করছি না। আবার সরকার এবং ‍একটি প্রাইভেট ক্লাব-এর নীতিও এক না। এতোদিন যখন দেখলা আর ক’দিন অপেক্ষা করো। সময় তো ঘনিয়ে এলো… এবার দেখি গঠণতন্ত্রের দোহাই কি বলে!

পরে আমি তাকে লিখে জানাই: অভিযুক্ত হলে স্থগিত; দণ্ডিত হলে বাতিল… এটা সাধারণ কনভেনশন। সরকারি বা বেসরকারি হিসেবে এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। তবে দণ্ডিত হলে প্রেসক্লাব যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন তাতে আমার কিছু যায় আসে না। এটা লজ্জার বিষয় যে, সাংবাদিকদের দলাদলির কারণে কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামানরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য। আমি প্রেসক্লাবের সদস্য না; তারপরও একজন ছোটো সাংবাদিক হিসেবে সাংবাদিকদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের মতো লোকের সদস্য হওয়াতে আমি লজ্জিত। আমি জানি না প্রেসক্লাবের সদস্যরা লজ্জিত কি না।

সঙ্গে আমি এ-ও যোগ করি যে আনিস আলমগীর ভাই(জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য হিসেবে)লজ্জিত, তাই তিনি এ বিষয়ে ফেইসবুকে মন্তব্য করেছেন। এজন্য আরো একদফা তাকে ধন্যবাদ জানাই।

ধন্যবাদ আমি আরো অনেককে জানিয়েছি, কিন্তু তাদের নাম প্রকাশ করতে পারছি না; কারণ তারা প্রকাশ্যে মন্তব্য না করে আমাকে ফেইসবুকে মেসেজ পাঠিয়ে সহমত পোষণ করেছেন, কিছু তথ্যও জানিয়েছেন।তাদের মধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভাষায় তাদের ‘সভ্য’ (সদস্য)যেমন আছেন তেমনি ‘অসভ্য’ (অসদস্য)রাও আছেন। প্রেসক্লাবের সদস্য নন এমন যারা প্রকাশ্য হতে চান নি তাদের কারণটা বুঝতে পারি; তারা তাদের নাম এমন তালিকায় নিতে চান না যাতে কেউ বিব্রত হন আর ভবিষ্যতে তারা প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার সুযোগ হারান। আর প্রেসক্লাবের যে ‘সভ্য’রা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চান নি তাদের আশঙ্কা প্রেসক্লাবের হর্তা-কর্তারা রাগ করে যদি কোনো ছুতোয় সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল করে দেন!

একজন সাংবাদিক এভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ হারানোর আশংকা করলেও কাদের মোল্লা আর কামারুজ্জামানরা কখনোই সেই আশঙ্কা করেন নি। কারণ তারা জানতেন প্রেসক্লাব ‘পলিটিকসে’ (পড়–ন ‘পলিট্রিকসে’) তাদের রক্ষা করার লোকের অভাব নেই। তাদের সেই ভরসার জায়গা যে শতভাগ ঠিক ছিলো তার প্রমাণ তাদের মতো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তরা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত এবং গ্রেফতার হওয়ার পরও তাদের সদস্যপদ বাতিল তো দূরের কথা স্থগিতও হয়নি।

একইসঙ্গে তারা কিভাবে সদস্যপদ পেয়েছিলেন সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

এমন না যে হঠাৎ এক সকালে সরকার তাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আবিষ্কার করেছে আর মামলা ঠুকে দিয়েছে। সেই একাত্তর থেকেই তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা সকলের জানা। ধর্মীয় রাজনীতি করার সুযোগ ফিরে পাওয়ার পর থেকে আগের মতোই তারা জামায়াতি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, পর্যায়ক্রমে এখন তারা শীর্ষ পর্যায়ে। তারপরও তারা প্রেসক্লাবের সদস্যপদ পেয়েছেন, ফেইসবুকে তাই বন্ধু সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান প্রশ্ন রেখেছেন: তারা কি কখনও সাংবাদিক ছিলেন? উত্তরে আনিস আলমগীর ভাই জানাচ্ছেন: কামারুজ্জামান ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার সঙ্গে ছিলেন, কাদের মোল্লারটা তার জানা নেই।

একাত্তরে গণহত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের অভিযোগে কাদের মোল্লা-কামারুজ্জামানরা কিভাবে বাংলাদেশে সাংবাদিক পরিচয় পেতে পারেন সেই প্রশ্ন কোটি মানুষের হলেও প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য প্রেসক্লাবের কাছে তাদের একাত্তরের ভূমিকাই ছিলো বড় নিয়ামক। ফেইসবুকে আমার মন্তব্যে অনেক সহকর্মীই মন্তব্য করে বলেছেন, পেশাদারিত্বের চেয়ে প্রেসক্লাবে রাজনীতিই বড়, তার চেয়েও বড় দলীয় পরিচয়। সেই পরিচয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছেন কাদের মোল্লা এবং কামারুজ্জামানসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আরও কয়েকজন।

এভাবে রাজনীতির কারণে কাদের মোল্লা-কামারুজ্জামানদের জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য করে পুরো সাংবাদিক সমাজকেই বড় লজ্জায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে প্রতিবাদ যে একেবারে নেই এমন নয়, যেমন সহকর্মী মাইনুল আলম (জাতীয় প্রেসক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচিত সদস্য) ফেইসবুকেই জানিয়েছেন, প্রতিবাদ তারা করে যাচ্ছেন এবং ভালো কোনো ফল শিগগিরই দেখা যাবে।

তারপরও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত একজনের রায়ের আগের দিনও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য থাকা পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য এক বড় লজ্জা। এ লজ্জা আরও বাড়তে পারে যদি দণ্ডিত হওয়ার পরও (প্রসিকিউশনের মতে, যে তথ্য-প্রমাণ আছে তাতে দণ্ডিত না হওয়ার কোনো কারণ নেই) যদি আপিলের অজুহাত তুলে তাদের সদস্যপদ রেখে দেওয়া হয়। এরকম না হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কম নয়। কারণ তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা।

যারা তাদেরকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যপদ দিয়েছিলেন তাদের বিন্দুমাত্র লজ্জা থাকলে তারা সেই সদস্যপদ দিতেন না। অন্ততপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হওয়ার পর সদস্যপদ স্থগিত করতেন। তারা তা করেন নি, কারণ তারা নির্লজ্জের মতো কামারুজ্জামান-কাদের মোল্লাদের উত্তরাধিকার হতে চান।

আর প্রেসক্লাবের সদস্য কি সদস্য নন, সেটা বিবেচনা না করে পেশাদার সাংবাদিকরা শহীদ সাংবাদিকদের পূর্বসূরী মনে করেন। দীর্ঘ এ তালিকায় আছেন শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, শহীদ সাংবাদিক নিজামউদ্দিন আহমদ, শহীদ সাংবাদিক আব্দুল মান্নান লাডু ভাই, শহীদ সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাংবাদিক খন্দকার আবু তালিব, শহীদ সাংবাদিক শহীদ সাবের, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিন এবং শহীদ সাংবাদিক চিশতি শাহ হেলালুর রহমানসহ আরও অনেকে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবে তাদের ছবি আছে। অথচ তাদের অনেকের খুনি যে আল-বদর বাহিনী তার সংগঠক হওয়ার পরও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য কামারুজ্জামান এবং কাদের মোল্লা।