স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য সংগ্রাম

সোমবার, ২২/০৭/২০১৩ @ ৭:৫৯ অপরাহ্ণ

হামিদ মীর ::

hamid mirসম্মান ও অপদস্থতা একমাত্র আল্লাহর হাতে। কেউ কাউকে সম্মানিত যেমন করতে পারে না তেমনি অপদস্থও করতে পারে না। আল্লাহ কাউকে সম্মান দিলে পরে তার পরীক্ষাও নেন। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস দৃঢ় হলে মানুষ প্রতিটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন। হিংসুকদের অপবাদের ধারা অব্যাহত থাকে, শত্রুদের কূটচাল চলতে থাকে, কিন্তু স্রষ্টা এসব ষড়যন্ত্র ও কূটচাল পাত্তায় আনেন না। পাকিস্তানে স্বাধীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে জেনারেল আইয়ূব খানের আমলে, যখন সামরিক শাসন প্রেস অধ্যাদেশ ১৯৬৩ দ্বারা স্বাধীন গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরার চেষ্টা করে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি গণমাধ্যম স্বাধীন হলে দেশটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যেতো না। ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের বিরোধিতাকারী সাংবাদিকদের কারাগারে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেটা ছিল ওই যুগ যখন গণতন্ত্রের কথা বললে রাশিয়া ও ভারতের এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। কারণ জিয়াউল হক ও তার সহযোগী ধর্মীয় দলগুলোকে আমেরিকা তখন আফগানিস্তানে ব্যবহার করছিল। জেনারেল জিয়াউল হকের ১১ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত হয়েছেন ওই রাজনীতিক, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকরা, যারা মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছেন। তাদের মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে যেতে হয়েছে।

জেনারেল জিয়াউল হক থেকে শিক্ষা নিয়ে জেনারেল পারভেজ মুশাররফ ১৯৯৯ সালে সেনা বিদ্রোহকে মার্শাল ল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেননি। নওয়াজ শরিফের শাসনামলের শেষ দিকে তিনি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মিডিয়ার সঙ্গে একটি যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি করে যান। পারভেজ মুশাররফ তা থেকে ফায়দা লাভ করেন। তিনি স্বাধীন আদালত ও গণমাধ্যমের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেননি। কৌশলে তিনি নিজেকে সেনাশাসক ঘোষণা না করে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে ঘোষণা দেন। এতে সুপ্রিম কোর্ট তাকে একধরনের বৈধতা দিয়ে দেয়। কিন্তু ২০০১ সালের পর যখন পারভেজ মুশাররফ একধরনের স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা শুরু করেন তখন তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। তিনি তার বিরোধীদের তালেবান ও আল-কায়েদা বানিয়ে জেলে ঢোকাতে থাকেন।

ওই সময় পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলা শুরু হয়। আমি দক্ষিণ ওজিরিস্তানে সরেজমিনে গিয়ে জানতে পারি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে সীমান্তবর্তী এলাকায় ড্রোন হামলায় অনেক নিষ্পাপ মানুষ মারা যাচ্ছেন। আমার সেই টেলিভিশন প্রোগ্রামে স্থানীয় সাংবাদিক হায়াতুল্লাহ খান সহযোগিতা করেন। প্রোগ্রাম সম্প্রচার হওয়ার পর সর্বপ্রথম ডিজিআইএসপিআর মেজর জেনারেল শওকত সুলতান সরকারি টেলিভিশন পিটিভিতে আমাকে ‘পাকিস্তানের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কয়েক দিন পর হায়াতুল্লাহ খানকে গুম করে হত্যা করা হয়।

হায়াতুল্লাহ খানের হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং জেনারেল পারভেজ মুশাররফের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। আর যেদিন আমরা পাকিস্তান পার্লামেন্টের গ্যালারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আফতাব শেরপাও’র উপস্থিতিতে ‘ঘাতক ঘাতক মুশাররফ ঘাতক’ স্লোগান দিই সেদিন থেকে মুশাররফ সরকার তার বিরোধী সাংবাদিকদের ভারত ও আমেরিকার এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে।

জেনারেল পারভেজ মুশাররফ স্বাধীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে জায়েদ হামিদকে ব্যবহার করতে থাকেন। জায়েদ হামিদ ওই ব্যক্তি যিনি আফগান যুদ্ধে আহমদ শাহ মাসউদের সহযোগী ছিলেন। কিন্তু আহমদ শাহ মাসউদ তাকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট আখ্যা দিয়ে বের করে দেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি রাসুল সা.-এর কুৎসা রটনাকারী ইউসুফ কাজ্জাবেরও সহযোগী। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর এই রহস্যময় ব্যক্তি পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে ময়দানে অবতীর্ণ হন। তিনি বিভিন্নজনকে ভারত ও আমেরিকার এজেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা শুরু করেন। জায়েদ হামিদের ব্যাপারে সচেতন নাগরিকদের কান কাড়া হয় তখন যখন তিনি গণতন্ত্রকে পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকর আখ্যা দিতে থাকেন এবং রাজনৈতিক শক্তি অর্জনে কিছু সেনা কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করতে থাকেন। এমনকি এক পর্যায়ে সেনা কর্মকর্তা জেনারেল ইশতিয়াক পারভেজ কিয়ানির সমালোচনা শুরু করেন।

জায়েদ হামিদ মিডিয়ার বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার চালান তার ওপর ভিত্তি করে পারভেজ মুশাররফ ২০০৭ সালে গণমাধ্যমের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন। ২০০৭ সালে মুশাররফ একদিকে জায়েদ হামিদ অন্যদিকে সালমান তাসিরের মতো লোকদের পরামর্শে টিভি উপস্থাপকদের হাতকড়া পরান। জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে ভারতীয় চ্যানেল অবাধে উন্মুক্ত করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল বরখাস্তকৃত বিচারকদের প্রতি যেন মানুষের নজর না পড়ে। কিন্তু জনগণের দৃষ্টি অন্যায়ভাবে বরখাস্তকৃত বিচারকদের থেকে অন্যত্র সরে যায়নি। পারভেজ মুশাররফ ও তার পান্ডারা প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মোহাম্মদ চৌধুরীকে সন্ত্রাসবাদের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু স্রষ্টা ইফতেখার মোহাম্মদের সঙ্গে ছিলেন।

জায়েদ হামিদসহ মুশাররফের সহযোগীরা আমাকেসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় টিভি অ্যাঙ্করকে আমেরিকা ও ভারতের দালাল সাব্যস্ত করতে চেয়েছে। পাকিস্তানের জনপ্রিয় চ্যানেল জিও টিভিকে ইহুদিদের চ্যানেল হিসেবে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। কিন্তু মহান স্রষ্টা এসব অপবাদকে কখনো প্রাধান্য পেতে দেননি। সম্প্রতি প্রকাশিত আমার কলাম সংকলন ‘কলম কামান’ এর মধ্যে আদালত ও গণমাধ্যমের ওপর আরোপিত অপবাদের কথা বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। ২০০৮ সালে পিপলস পার্টির শাসন প্রতিষ্ঠা হলে মুশাররফের সহযোগীরা পিপলস পার্টির সরকারকে ঘিরে রাখে এবং গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচার অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। কিন্তু আল্লাহ এসব অপবাদকে নিষ্ক্রিয় করে দেন।

২০১২ সালের জুলাই থেকে আদালত ও গণমাধ্যমের ওপর নতুন এক হামলা শুরু হয়। তখন আমি আমার এক বন্ধু আবসার আলমকে সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছায় নিজেদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাই। আমরা সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট করি। এতে আমরা আবেদন জানাই, সরকারি টাকায় সাংবাদিক কেনার ফান্ড বন্ধ করা হোক, তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ বন্ধ করা হোক এবং মিডিয়ার ওপর সরকারি চাপ তদন্তে একটি কমিশন গঠন করা হোক। আমাদের এই আবেদনের ওপর দীর্ঘ এক বছর পর্যন্ত শুনানি চলে। সুপ্রিম কোর্ট প্রথম দফা সরকারের কাছে সাংবাদিক কেনার গোপন ফান্ড সম্পর্কে তথ্য চায় এবং একটি মিডিয়া কমিশনও গঠনের নির্দেশ দেয়। এই কমিশন গঠনের একটি সুপারিশ সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হয়েছে এবং এর ওপর শুনানি এখনো অব্যাহত আছে।

তবে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ জুলাই সাংবাদিক কেনার গোপন ফান্ডের ব্যাপারে একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রায়ে বলেছে, আইনের ১৭০ দফা অনুযায়ী মহাহিসাবরক্ষক প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গোপন ফান্ডের অডিট করতে পারবেন। গত এক বছর গোপন ফান্ড ব্যবহারকারীরা আমাদের ব্যর্থ করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির করেছে। তবে আল্লাহ আমাদের ইজ্জত রক্ষা করেছেন। যারা গত কয়েক বছর ধরে আমাদের ভিনদেশীদের এজেন্ট বলে অপপ্রচার চালাচ্ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে আমাদের হেনস্থা করছিল আদালতে তারা আমাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পেশ করতে পারেনি। উল্টো আমরা গোপন ফান্ডের মাধ্যমে মিডিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ এবং সাংবাদিক কেনাবেচার গোপন রহস্য ফাঁস করে দিয়েছি। আমাদের আবেদনের ভিত্তিতে নতুন প্রশাসন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের গোপন ফান্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। কারো কাছে গোপন ফান্ড থাকলে অডিটর জেনারেল যেকোনো সময় অডিট করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

আমাদের এই আইনি লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মিডিয়া কমিশন সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জনসাধারণের কাছে আহ্বান জানাবে, কারো কাছে কোনো মিডিয়া সম্পর্কে দেশদ্রোহিতা বা দালালির কোনো প্রমাণ থাকলে তা যেন কমিশনের কাছে পেশ করা হয়। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করছি, যদি কারো কাছে আমার সম্পর্কে অথবা জিও টিভি সম্পর্কে ‘দালালিসুলভ’ কোনো তথ্যপ্রমাণ থাকে তাহলে সুপ্রিম কোর্টের দরজা খোলা, যে কেউ তা আমাদের বিরুদ্ধে উপস্থাপন করতে পারেন। সম্মান ও অপদস্থতা আল্লাহর হাতে। আল্লাহ মিথ্যুক ও অপবাদ আরোপকারীদের আরো বেশি অপদস্থ করবেন।

লেখক: পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক; প্রধান নির্বাহী, জিও টিভি।

দৈনিক জং-এর সৌজন্যে। উর্দু থেকে অনুবাদ: জহির উদ্দিন বাবর

সর্বশেষ