সাংবাদিকতার পতন ও পতনের সাংবাদিকতা

রবিবার, জুলাই ২১, ২০১৩

রবার্ট জেনসেন ::

Robert_Jensenঅনেকে বিশ্বাস করেন শক্তিশালী ও সর্বজনীন সাংবাদিকতা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য খুব জরুরি, টিকছে না। কারণ একবিংশ শতকের সাংবাদিকতা সেটিকে নিম্নস্তরে পৌঁছে দিয়েছে। বিজ্ঞাপননির্ভর সাংবাদিকতার মূল্যায়ন যা-ই হোক না কেন, বাণিজ্যিক আদলে সজ্জিত এ ধরনের সাংবাদিকতা আমাদের খুব কমই পেশাগত সাংবাদিক উপহার দিয়েছে; যারা শুধু তাদের পেশাগত কাজের জন্য পারিশ্রমিক পান। সত্যিকারের সাংবাদিক অর্থাৎ যাদের জন্মই হয়েছে সাংবাদিকতা করার জন্য, তাদের ছাড়া এটি কখনো টিকবে না। ভাবনাটি অবাস্তব হলেও বর্তমানের সত্য এটিই।

আবার যারা মনে করেন, পৃথিবী হলো শক্তির প্রতিযোগিতা; এই একবিংশ শতকে সেটিও নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছেছে। আধুনিক জ্বালানি শক্তি বা প্রযুক্তির যুগ যা-ই বলা হোক না কেন, এটি স্পষ্ট যে— বর্তমানে আমরা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। পৃথিবী শুধু ভোগ ও আবর্জনার ভাগাড় এ যুগে অলীক প্রমাণিত হয়েছে সেটি। আমাদের কোনো পছন্দ নেই। তবে আমরা জানি সাংবাদিকতার পতন কীভাবে হলো এবং আমাদের পতনের সাংবাদিকতা সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সাংবাদিকতার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। সবার কাছে বোধগম্যও সেটি।

সাংবাদিকতার মূল কথা: আদর্শ ও সীমাবদ্ধতা
প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিকতার ব্যাপক বিস্তারের কারণে সত্যিকারের সাংবাদিকতাকে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আদর্শগত দিক থেকে সাংবাদিকতা হলো একটি সমালোচনামূলক ও স্বাধীন তথ্যের উত্স; যেটি জনকল্যাণকর নীতি প্রণয়নের জন্য অর্থবোধক ভূমিকা পালন করে। মুক্ত সাংবাদিকতার মূল কথা হলো, সমালোচনামূলক স্বাধীন সত্তা। কারণ একজন সাংবাদিক শুধু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা নীতির নয়, তাদের নিজস্ব জগতেরও সমালোচনা করেন। সাংবাদিকতা হলো গণতন্ত্রের মতো। যার মূল কাজ একটি জনকল্যাণনীতি প্রণয়নে কার্যকরী ভূমিকা পালন করা। অর্থবহ গণতন্ত্র জনগণের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। তেমনি সাংবাদিকতাও জনগণের মতামত নিশ্চিত করে।

এ লেখার মূল বিষয়— মূলধারার সাংবাদিকতা। যাকে বলে ‘করপোরেট-কমার্শিয়াল’ গণমাধ্যম। যেখানে কাজ করছেন দৈনিক সংবাদপত্র, সম্প্রচার ও ক্যাবল-টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমের সাংবাদিকরা। যদিও মানদণ্ড ও মাধ্যমের ভিত্তিতে অনেক ধরনের স্বাধীন ও বিকল্প সাংবাদিকতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠী এই মূলধারার মাধ্যমগুলো থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সংবাদ গ্রহণ করে থাকে। যেগুলোর অধিকাংশ বড় কোনো করপোরেশন এবং প্রাথমিকভাবে কোনো না কোনো বিজ্ঞাপনদাতার টাকায় পরিচালিত। ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা মাঝে মধ্যে পঙ্গুধারা (লেইমস্ট্রিম) বলে সমালোচনা করেন এটিকে। এ ধরনের সাংবাদিকরা তাদের বোধের স্বল্পতা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতার কারণে সত্যিকারের তথ্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হন। রক্ষণশীল জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় সত্যিকারের সর্বজনীন মূল্যবোধ ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হন।

একজন প্রতিবেদক ও সম্পাদকের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি উদাসীন। অন্যদিকে সমকামী ও নারী অধিকারের ইস্যুগুলোর সমর্থক; যা সাধারণ জনগণের চিন্তার বিপরীত। সাধারণত এ ধরনের সাংবাদিকতা ওইসব মালিক বা ব্যবস্থাপনা কমিটির মতাদর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়; যা মূলধারার মাধ্যমগুলোকে একটি কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী করে রাখে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকরা মানতে নারাজ সেটি। তারা মনে করেন, সাংবাদিকতা ও বাণিজ্য— এ দুটির মধ্যে একটি অভেদ্য দেয়াল রয়েছে; যা একজন সাংবাদিককে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।

এ ধারণার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একজন সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনা করি। যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকতার জগতে জো নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সম্পর্কে আমার মতামত শুনে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আমাকে আজ পর্যন্ত করপোরেট অফিস থেকে কেউ এমন কোনো নির্দেশনা দেয়নি।’ এ কথা শুনে আমি তাকে বলি, এমনো তো হতে পারে, আপনি নিজ থেকে যেটি করছেন, সেটিই তাদের চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি আমার মতকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ‘নিউজরুমে আমি স্বাধীন।’ আমি তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করি এবং বলি, আমি শুধু আলোচনার জন্য একটি প্রশ্ন করতে চাই।

ধরুন, আমি আর আপনি পেশাগত দিক থেকে আপনার বর্তমান পদের জন্য সমান দক্ষ ও যৌক্তিক দুজন সাংবাদিক এবং আমরা উভয়ে এই পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছি। আপনার কি মনে হয়, আপনার বস আপনার পরিবর্তে কখনো আমাকে ওই পদের জন্য পছন্দ করবেন? আমি এক সেকেন্ডের জন্যও তাদের কাছে আপনার চেয়ে উপযুক্ত বিবেচিত হব?

জো’র রাজনীতি কিছুটা মূলধারার রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মতো রীতিসিদ্ধ। তিনি বিশ্ববাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যকে সমর্থন করেন। প্রকৃত অর্থে, আমি ধনতন্ত্রের সমালোচক। কিছু বিষয়ে আমি তার সঙ্গে একমত। তবে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আমাদের ভিন্নতা রয়েছে। জো আমার যুক্তিকে সমর্থন করে বলেন, ‘এ কথা সত্য যে, তোমার মতাদর্শের কাউকেই আমার পদে নিয়োগ দেবেন না তারা।’

আমি এ লেখায় রাজকীয় (রয়্যাল), আধ্যাত্মিক সাংবাদিকতা (প্রফেটিক) ও ভবিষ্যত্দ্রষ্টা (আপকালিপটিক)— এ তিনটি ধারা নিয়ে আলোচনা করব। যদিও সাংবাদিকতা একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। আমার উদ্দেশ্য কোনো ধর্মকে সমর্থন করা নয়, বরং মানব ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা আস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বিতর্কটার বিস্তারিত আলোচনা কর

রাজকীয় (রয়্যাল): মূলধারার করপোরেট সাংবাদিকতা, যেগুলো জোয়ের মতো সাংবাদিকদের দ্বারা পরিচালিত, সেগুলোকে রাজকীয় বা রয়্যাল সাংবাদিকতা বলে। রাজকীয় শব্দ দিয়ে কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং একটি ধারাকে বোঝানো হচ্ছে; যা এককেন্দ্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরো প্রান্তিক করে দেয়। রাজকীয় ধারা বলতে প্রাচীন ইসরায়েল, রোমান সাম্রাজ্য বা সমসাময়িক যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো হয়। ধর্মতাত্ত্বিক ওয়াল্টার ব্রুগেম্যান মনে করেন, এই রাজকীয় দম্ভ ইসরায়েলকে চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেয়। যার মূল কারণ ছিল ধনাঢ্যতা, শোষণমূলক সামাজিক নীতি ও নিশ্চল ধর্মীয় রীতিনীতির পরিবর্তে উদারতাবাদের প্রতিষ্ঠা। এই সচেতনতা শুধু তাদের নেতাদের মধ্যে নয়, বরং সব সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তার লাভ করে। ব্রুগেম্যান মনে করেন, এই সচেতনতা জনগণকে অসাড়তার দিকে টেনে নেয়। আর অসাড়তা মানেই মৃত্যু।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে মূলধারার প্রায় সব করপোরেট সাংবাদিকতাই রাজকীয় সাংবাদিকতা। এটি কল্পনাশক্তি ছাড়া সাংবাদিকতা; যা একটি কর্তৃত্ববাদী শক্তির দ্বারা পরিচালিত। ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন), এমএসএনবিসি, ফক্স নিউজ— এগুলো রাজকীয় সাংবাদিকতার অন্যতম উদাহরণ। নিউইয়র্ক টাইমস এ ধারার ভিত্তিমূল। একথা সত্য নয় যে, এ ধারা থেকে ভালো কোনো সংবাদিকতার জন্ম হয়নি। তবে ধারাটি রাজকীয় চিন্তার বাইরে যেতে পারে না।

আধ্যাত্মিক (প্রফেটিক): বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে এ সাংবাদিকতার উত্পত্তি। এ ধরনের সাংবাদিকরা কোনো আধ্যাত্মিক নেতা নন, যারা ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং জনগণ তাদেরকে অনুসরণ করেন। তবে সেই দৃষ্টিভঙ্গির খুব কাছাকাছি একটি তত্ত্ব। হিব্রু ও খ্রিস্টানদের নতুন টেস্টামেন্টে নবী তাদের বলা হয়, যারা মানবজীবনের সর্বোত্তম ধারাটির কথা বলেন এবং জনগণকে সে অনুযায়ী চলতে নির্দেশ দেন। প্রকৃত অর্থে নবুয়াতি হলো সততা ও সাহসের অপর নাম।

সেই অর্থে আমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা ও বক্তব্য সমাজের কাছে অতটা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তাদের কাছে এটির কোনো বিশেষত্বও নেই। আবার আমরা যখন তাদের আধ্যাত্মিক বক্তব্যগুলোকে বিশ্লেষণ করি, তখন কখনো কখনো সেসব অন্যায্য বলে মনে হতে পারে। ভবিষ্যত্দ্রষ্টা হওয়ার জন্য প্রথমে নিজ আত্মার কাছে সত্যবাদী হওয়া খুব জরুরি। তারপর অন্যায় ও পৃথিবীর এ ভঙ্গুর কাঠামো সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন এবং এসব সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর উত্পত্তি সম্পর্কেও জ্ঞান থাকতে হবে।

আমস, হসেয়া, জোরেমিয়াহ, ইসাইয়াহ সবাই শক্তি ও সম্পদ অর্জনে বাধা দিয়েছেন। অন্যদিকে ন্যায় ও ভালোবাসা শিক্ষা করতে বলেছেন। এসব আধ্যাত্মিক নেতা কখনো দুর্নীতি বা অসত্যকে প্রশ্রয় দেননি। তারা সবসময় ন্যায় ও সত্যের কথা বলেছেন এবং সমাজের সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এটিই হলো বিশ্বাস, যা মানুষকে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। বিশিষ্ট ধর্মবেত্তা রব্বি ইব্রাহিম জসুয়া হেকেল বলেন, এ ধারার মূল কথা হলো নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা। এখানে গুটিকয়েক মানুষ অপরাধী আর বাকি সবাই ঈশ্বরের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল। আমরা যদি বলি, একজন মানুষ তার সমাজে সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। তাহলে ব্যক্তিত্ব অপরাধ সমাজের বহিঃপ্রকাশ।

ব্রুগেম্যান আধ্যাত্মিক বা প্রফেটিক ধারার সমালোচনা করে বলেন, ‘এ ধরনের চিন্তা আমাদের শারীরিক মৃত্যুর পরিবর্তে মানসিক মৃত্যু ঘটায়। ফলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন নতুন কথা আমাদের চেতনাকে আঁকড়ে ধরে এবং সেগুলো বিশ্বাস করতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। ব্রুগেম্যান মনে করেন, এটি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বাধ্যবাধকতা নয় এবং একজনের মূল্যবোধ আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দেয়াও নয়। বরং একে অন্যের সঙ্গে একত্র করার প্রয়াস মাত্র। আধ্যাত্মিক বাণী নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে না, বরং আমাদের চারপাশে বিরাজমান সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। যখন মানুষ সেটি অনুসরণ করতে থাকে, তখনই শুরু হয় ভোগবাদিতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত। এ ধ্যান-ধারণার কোনোটাই একজন সাংবাদিককে নির্দিষ্ট কোনো দল, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সমর্থন করতে বলে না। সাংবাদিকদের অপপ্রচারক হওয়ার কোনো প্রয়োজনও নেই। সাংবাদিকতা স্বাধীন সত্যের পূজারি মাত্র। কিন্তু একটি শক্তিশালী ইন্দ্রজালিক ক্ষমতা এসব মূলধারার সাংবাদিককে একটি মতাদর্শের জালে বন্দি করে ফেলে। যেটি সমাজের শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত।

ভবিষ্যত্দ্রষ্টা (আপকালিপটিক): আধ্যাত্মিক সাংবাদিকতা আমাদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে। কিন্তু এটি একটি অস্পষ্ট বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ধরা হয়, এর দ্বারা আমরা রাজকীয় চেতনা ও মৃত্যুর অসাড়তাকে দূর করতে পারি। যদিও প্রকৃত অর্থে সেটি অসম্ভব। মারটিন লুথার কিং এক ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বলেন, ‘একটি নৈতিক পৃথিবী অনেক দূরের বাদ্য। যদিও ন্যায় হলো সেই পৃথিবীর সূতিকাগার।’ যিনি আধ্যাত্মিক ধারার অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তবে বর্তমানে এসব ভবিষ্যদ্বক্তার দাবি ধোপে টিকছে না। তৈরি হচ্ছে নতুন ভবিষ্যৎ। এখানে বিশ্বাস করা হয়, কেউ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগাম বলতে পারে না। একেই বলা হয় আপকালিপটিক ধারা।

এ দুটি ধারা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। এখানে এই নতুন চিন্তাধারার কথা আলোচনা করব। এ ধারাটি ভবিষ্যদ্বাণী করে না, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো ক্ষতিকারক ঘটনাকে প্রতিহত করতে নির্দেশনা দেয়। যখন প্রফেটিক ধারাটি ব্যর্থ হয়, ঠিক তখনই আপকালিপটিক ধারার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। আর এখন আপকালিপটিক ধারার উপযুক্ত সময়। ফ্রেড গিটার তার ‘ফেট অব দ্য স্পেসিস’ গ্রন্থে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেন। যিনি সায়েন্টিফিক আমেরিকার নির্বাহী সম্পাদক।

আধুনিক যুগে কম্পিউটার ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ, শক্তি সম্পদ, কৃষিক্ষেত্র ছাড়া এক দিনও অতিবাহিত করা সম্ভব নয়। আমরা প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে এত উপরে উঠে গেছি যে, এখান থেকে আর নিচে নামা সম্ভব নয়। আমরা আশীর্বাদ হিসেবে প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেছিলাম। অথচ সেটিই আজ আমাদের ধ্বংসের কারণ। যদিও এটি নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি আরো বলেন, আমি কোনো সমাধান দিচ্ছি না, বরং সমস্যা থেকে সাবধান হওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। বিরোধীরা মনে করেন, প্রযুক্তির জন্য যেসব সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, সেটির একমাত্র সমাধান আরো উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার।

তারা বিশ্বাস করেন, মানুষ নিজেই তাদের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। এখানে প্রযুক্তির সম্ভাবনা বা ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, শুধু সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের কাজ করা উচিত। এ সম্পর্কে জেমস লাভলক বলেন, সিএফসি গ্যাসের কারণে আমাদের জীববৈচিত্র্যসহ পুরো পৃথিবীই হুমকির মুখে আজ। তাই বিতর্ক নয়, আমাদের ভাবতে হবে পৃথিবী একটি কঠিন সময় পার করছে। পৃথিবীটাকে একটি অভিন্ন সত্তা হিসেবে ভাবার সময় এসেছে। আমরা এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হব খুব তাড়াতাড়ি। যিনি ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির সম্মানিত সহযোগী।

আর সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য— কঠিন হলেও এসব সত্যকে তুলে ধরা। তবে এটা সত্য যে, এ কথা বলা যত সহজ বাস্তবে অতটা সহজ নয়। কারণ এ ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে হাত রয়েছে বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের। আর এসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের টাকায় পরিচালিত হয় আমাদের গণমাধ্যম। তাই আপকালিপটিক সাংবাদিকতার প্রধান টার্গেট হওয়া উচিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যাদেরকে আধুনিকতার মোহ গ্রাস করেনি এখনো।

লেখক: প্রফেসর, স্কুল অব জার্নালিজম, টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, অস্টিন
ট্রুথআউট ওয়েবসাইট থেকে ভাষান্তর মো. তরিকুল ইসলাম
সৌজন্যে- বণিক বার্তা।