আন্দোলনের নয়, গণমাধ্যমের কর্মী

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৩

এহসান জুয়েল
Sahbagআন্দোলনের কসম—তারুণ্যের এতটা প্রাণশক্তি এর আগে দেখেনি বাংলাদেশ। এত উচ্ছ্বাস, এত বিপ্লব, তারুণ্যের এমন গর্জন কে কবে দেখেছে বলুন! এখনকার বাংলাদেশ দেখছে। দেখছে কতটা ঘৃণার পাহাড় জমে ছিল অন্তরালে। রাজপথে তাই এখন দ্রোহের শব্দাবলী, বিপ্লবের ইশতেহার পাঠ হচ্ছে উচ্চকণ্ঠে। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ফিরে আসছে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে।

শাহবাগের পাশেই বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের প্রিজন সেলে শুয়ে থাকা গোলাম আযমের অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে উঠতে বাধ্য! পুরো বাংলাদেশ আজ এক ফ্রেমে জ্বলে উঠছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে রাষ্ট্রযন্ত্রের “প্রহসন” বলে যা মনে হচ্ছে, তা মেনে নিতে পারেনি এদেশের এই প্রজন্ম, আগামী প্রজন্ম। তাইতো স্লোগানে-কোরাসে-গণসঙ্গীতে-প্রতিবাদী কবিতায় জ্বলে ওঠা আন্দোলনের শিখা আজ ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল ছাড়িয়ে যাচ্ছে অনায়াসে।

এমন অভূতপূর্ব সব আবেগ ছুয়ে যাচ্ছে এদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে। আমরা যারা সংবাদকর্মী, তাদেরও রক্তে বাজে আন্দোলন। তবে সেটাকে বুকের পাজরে সযত্নে আগলে রেখেই কণ্ঠ মেলাতে হচ্ছে একটু ভিন্নভাবে। দিনরাত শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে সারাদেশের মানুষদের কাছে পৌছে দিচ্ছি সেখানকার সর্বশেষ খবর। বলতে পারেন, রক্তে যদি আন্দোলনই বাজে তাহলে প্রকাশ কোথায় অনিবার্য বিপ্লবের স্বপ্ন প্রকাশের!

সাংবাদিকতার এটাই হয়তো এই সময়ের ট্র্যাজেডি! ‘অন প্রিন্সিপাল’ এর ঘেরাটোপে থাকায় আবেগের গলা চেপে ধরতে হয়। আমাদের স্লোগান দেয়া চলে না! মুষ্ঠিবদ্ধ হাজারো থেকে লাখো হাত যখন বিপ্লবের শপথবাক্য পাঠ করে, আমরা তখন দু’হাতে বুম (টেলিভিশন চ্যানেলের মাইক্রোফোন) চেপে ধরে শুনিয়ে যাই তাদেরই কথা। কি হচ্ছে, কি হতে চলেছে সেই খবরগুলো। বস্তুনিষ্ঠতা আর নিরপেক্ষতার আড়ালে পাথরচাপা দিই পাঁজরের কাঁপন।

গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব বলে কথা। কে অস্বীকার করবে, আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি মূলধারার গণমাধ্যমগুলো শাহবাগের এই “প্রজন্ম চত্বর”কে জাগিয়ে রাখছে, লাইভ বা জীবিত রাখছে দিন-রাত। আবার এটাও ঠিক, গণমাধ্যম একটু হোঁচট খেলে, একটু বিপথে গেলে বিপ্লব বেহাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই পেশাদারিত্বের জায়গায় অটল থাকার প্রত্যয় থেকে বিচ্যুত হওয়ার অবকাশ কই!

কেউ কেউ কি হচ্ছেন না, হচ্ছেন। শুক্রবারের মহাসমাবেশের দিন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের এক সহকর্মীকে দেখলাম উদ্দাম নৃত্যে মেতে উঠতে। গলায় ঢোল, একহাতে জাতীয় পতাকা, আরেকহাতে বুম নিয়ে মূল মঞ্চের সামনে তিনি নাচলেন বেশ কিছুক্ষণ। কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা ঐ প্রতিবেদক ব্যক্তিগতভাবে নাচতেই পারেন। তবে সাইনবোর্ড হিসেবে তার চ্যানেলের বুমটিকে বারবার উপরে উঁচিয়ে না তোলাটাই বোধহয় শ্রেয় ছিল।

টেলিভিশনগুলোর সরাসরি সম্প্রচারে আন্দোলনকারীদের নিজস্ব আবেগ, অনুভূতি, কর্মসূচির চেয়ে অনেক প্রতিবেদকই নিজস্ব মন্তব্য, আবেগ জুড়ে দিচ্ছেন বেশি বেশি। কথা বলছেন ভাষণ দেওয়ার স্টাইলে। লাগামটা ঠিক কোথায় টানতে হবে, কোথায় গিয়ে থামতে হবে, বুঝতে দেরি হয়ে যাচ্ছে ঢের।

একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তাতো প্রথম দিনেই আন্দোলনটিকে নিজস্ব চ্যানেলের “প্রোডাক্ট” বানাতে গিয়ে রীতিমতো সমালোচিত। এমনকি শাহবাগের নাম নিয়েও ধোয়াসা তৈরি করে রেখেছে গণমাধ্যমগুলো। তাহরির স্কোয়ারের সাথে মিলিয়ে কেউ কেউ শাহবাগ স্কোয়ার নাম দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগেন। কিন্তু দ্বিতীয় দিনই শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী সংহতি জানাতে গিয়ে এই এলাকার নাম প্রস্তাব করেন প্রজন্ম চত্বর। সব প্রজন্মই সেখানে একমত হয়ে দুই হাত তুলে তাতে সাড়া দেয়। পরে শুক্রবারের মহাসমাবেশে আন্দোলনের আহ্বায়ক যে লিখিত বক্তব্যটি দেন, তাতে তিনি এই জায়গার নাম প্রস্তাব করেন গণজাগরণ মঞ্চ। তারপরও এক একটি চ্যানেল নিজেদের দেওয়া নামে ডাকছে আন্দোলন স্থলটিকে।

এই আন্দোলনে থেকেই জামায়াত–শিবির ঘরানার দুয়েকটি গণমাধ্যমকে বয়কটের আহ্বান জানানো হচ্ছে। সেইসব গণমাধ্যম আন্দোলন বিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তাই প্রগতিশীল গণমাধ্যমগুলোকে অনেক বেশি সতর্ক হয়েই নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হচ্ছে।

এই আন্দোলনের প্রকৃতিটা বুঝতে হবে। এর আগে ৫২, ৬৯, ৭১ কিংবা ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের চেয়ে কিছু অর্থে এই বিক্ষোভটা একেবারেই ভিন্ন। এর আগে সব মানুষের অংশগ্রহণে এমন অহিংস আন্দোলন দেখেনি কেউ। তাই গণমাধ্যমগুলোর নিউজ কাভারেজের ঢংয়েও এসেছে ভিন্নতা। সেটাকে পুরো ইতিবাচক হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে।

বেশিরভাগ গণমাধ্যমই এখন পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব পালনে সফল। তবে সামনে কঠিন একটা সময়। তাই গণমাধ্যমগুলো দায়িত্বশীলতার, পেশাদারিত্বের জায়গায় একটু বেশি সচেতন, সতর্ক না হলে আন্দোলনের মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

তবে আশার কথা দিয়েই বলতে হয় একটি কথা। চেতনার জায়গায় সবাই যেহেতু একটি জায়গায়, তাই আন্দোলনের প্রবাহ বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সবাই নিশ্চয় আরো পরিপক্ক হবেন। আর এই আন্দোলনের ফল আসার পর সেটিকে গাঁথা হবে একই সুতোয়।

এহসান জুয়েল, সিনিয়র রিপোর্টার, সময় টেলিভিশন
[email protected]