সাংবাদিকতাকে ‘গার্মেন্টস দাসত্ব’ থেকে মুক্তি দিতেই আজিম গ্রুপ ছেড়েছি

বুধবার, জুলাই ১৭, ২০১৩

আসাদুজ্জামান সম্রাট ::

asaduzzaman shamratগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অদ্ভুত এক চাকরি করছিলাম। সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার সবচে’ কাঙ্খিত পদ ‘সম্পাদক’এর চাকরি। গার্মেন্টস কোম্পানির মালিকানায় অনলাইন সংবাদপত্রের সম্পাদকের চাকরি। যা ছিল পোপ ফ্রান্সিসের ভাষায় ‘এ যুগের দাস’-এর চাকরি। একজন সম্পাদকের সকাল ৯টায় উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। বিলম্বে বেতন কর্তন। এক বছরেও চাকরি কনফার্ম না করা। কোন ছুটি-ছাটা নেই। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, মায়ের অসুস্থতায় গ্রামের বাড়ি যাওয়া এমনকি বিয়ে করতে গিয়ে ছুটি নেই। আছে বেতন কর্তন।

ওয়েজ বোর্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিজস্ব নিয়মে নিয়োগপত্র প্রদানসহ দাস’দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মগুলোকে সাংবাদিকদের মানতে বাধ্য করা। অথচ কথা ছিল আজিম গ্রুপ হবে বাংলামেইল২৪ডটকম-এর প্রমোটার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে তা হয়েছে উল্টো। যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি। আর এই ‘গার্মেন্টস দাসত্ব’ থেকে সাংবাদিকতাকে মুক্ত করতেই আমি আজিম গ্রুপ ছেড়েছি।

দু’দফা ইংল্যান্ড সফরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাংলামেইল নামে একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা প্রকাশ করবো। যা হবে ব্রিটিশ ডেইলি মেইলের আদলে। আমাদের দেশে ট্যাবলয়েড হিসেবে মাত্র একটি পত্রিকা বের হয়। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কিংবা সক্ষমতার অভাবে সেটি আসলে প্রকৃত ট্যাবলয়েড পত্রিকা নয়। ট্যাবলয়েড সাইজের একটি সিরিয়াস পত্রিকা। আমাদের সময়ের পর মানবজমিনে সংক্ষিপ্ত চাকরি শেষে অর্থনীতির কাগজে চিফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেয়ার পরে এসব পরিকল্পনা শেয়ার করতাম আমার সহকর্মীদের সঙ্গে। একটি ‘প্রোজেক্ট প্রোপোজাল’ তৈরি করে ১২ কোটি টাকার একজন বিনিয়োগকারী খুঁজেছি।

সে সময়ে লন্ডনে বসবাসরত আমার প্রকৌশলী বন্ধু রেজাউল করিমসহ অনেকের সঙ্গেই বিনিয়োগ নিয়ে শেয়ার করেছি। কিন্তু সর্বত্রই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি, আমি কতো টাকা বিনিয়োগ করতে পারবো? ‘এক টাকা দেওয়ার সামর্থ আমার নেই বলতেই, বললো তাহলে তোমাকে তো ৫০ শতাংশ শেয়ার দেয়া যাবে না। টাকা ছাড়া শেয়ার হয় না। সেই যে স্বপ্নের থেমে যাওয়া সেখান থেকে আর চিন্তা না করে নিজের চাকরি করে গেলাম।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আবার স্বপ্নটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কারণ বন্ধু-ছোটভাই অনেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছে। শুরুতে বন্ধুবর অনেক সংসদ সদস্য বিনিয়োগ করতে চেয়েছে। কিন্তু তাদের সবারই একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। কেউ সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হবেন, কেউ প্রধান সম্পাদক হবেন কেউবা নিজেই সম্পাদক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কারো প্রস্তাবই আমার মন:পূত হয়নি। অর্থাৎ যুতসহ কোন বিনিয়োগকারী পাওয়া যাচ্ছিলো না। অবশেষে ট্যাবলয়েডের চিন্তা মাথা থেকে ফেলে দিলাম।

১৯৯৬ সালের দিকে পরিচয় হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল আজিমের সঙ্গে। গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, মিষ্টভাষী এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ববান মানুষটির সঙ্গে দীর্ঘবিরতির পর আবার দেখা হলো। আগে তার সঙ্গে পরিচয় ছিল বিএনপির ‘ব্যাকবেঞ্চার’ সংসদ সদস্য হিসেবে। এবার আর তিনি বিএনপির এমপি নন, স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে সংসদে এসেছেন। অনেক আগেই তার ব্যাবসায়ীক পার্টনার বন্ধু মেজর মান্নান বিএনপি ছেড়েছেন। এবার বিএনপিই ছেড়ে দিয়েছেন তাকে। অর্থাৎ মনোয়ন দেয়নি তাকে। প্রথম দিনই জানালেন বিএনপিতে ফিরছেন না। ফেরার পথও নেই। কারণ ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের পরে সংস্কারবাদীদের সংগঠিত করতে তার ভুমিকা ছিল জোরালো।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের অফিসের কাছেই তার বাসা। সেখানেই মিলিত হতো সংস্কারবাদীরা। বাড়ির সামনে বিশাল খোলা জায়গা, বাড়ির ভেতরে বিশাল ড্রয়িংরুম আর পেছনে সুইমিং পুলের পাশে দৃষ্টিনন্দন জায়গায় মেজর হাফিজদের বৈঠক হতো। এসবে যতোটা তার দোষ ধরা হয় তার চেয়ে বেশি অভিযোগ হচ্ছে, তারেক রহমানের গ্রেফতারের আগে যৌথবাহিনীর বৈঠকটি হয়েছিল তার বাসায়। ওই গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া অফিসারটি ছিল তার ভাগ্নে জামাই।

জনশ্রুতি রয়েছে, তারেক রহমানের পিঠের হাড় ভেঙ্গেছেন ওই কর্মকর্তা। যাতে ইন্দন রয়েছে ফজলুল আজিমের। এর বাইরে কোন সত্য রয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তবে ফজলুল আজিম নেতা হিসেবে কখনো তারেক রহমানকে মানেন নি। তার সম্পর্কে তার মন্তব্য এখানে না-ই বললাম। আর এ ক্ষোভ থেকেই তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়নি। তার আসনে বিএনপির মনোনয়ন যাকে দেয়া হয়েছিল, তিনি মাত্র ৫৮০ ভোট পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনে বিএনপির কোনও প্রার্থী এতো কম ভোট পাননি।

আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া নিয়ে প্রথমদিকে তার আগ্রহ ছিল। কিন্তু সংসদ ফ্লোরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ‘তুমি’ বলে সম্মোধন করায় মনক্ষুন্ন হন তিনি। কারণ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বয়সে তিনি প্রায় দশ বছর বড়। এ নিয়ে একদিন দু:খ প্রকাশ করেছিলেন। বললেন, কোন দলে যাবেন না। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। এতে আমিও তাকে উৎসাহ দেই। বিরোধীদলবিহীন সংসদে তিনি একটি ভুমিকা রাখতে পারবেন। জাতির জন্য কতোটুকু তিনি করতে পারবেন তা বড়ো নয়। জাতি তাকে স্মরণ করবে। এমন অনেক উৎসাহব্যঞ্জক কথা আমি তাকে বলেছি। সংসদে কয়েকটি বক্তব্যের ক্ষেত্রে আমি তাকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছি। প্রতিদিনই কমবেশি তার কথা লিখেছি, অপর সহকর্মী বন্ধুদের লিখতে অনুরোধ করেছি।

২০১১ সালের সম্ভবত রোজার ঈদে দু’একদিন আগে আমাকে ফোন করলেন এবং বললেন তার সাথে বাসায় দেখা করতে। সন্ধ্যার পরে যখন তার বাসায় পৌছাই তখন তিনি বাসায় ছিলেন না। কোন একটি ইফতার পার্টি থেকে ফিরে তার স্বভাবসুলভ বিনয় থেকে বিলম্বের জন্য দু:খ প্রকাশ করলেন। বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে নানা বিষয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বললেন একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিতে। বললেন, একসময়ে তিনি হলিডে’র পরিচালক ছিলেন। তিনি আর মঞ্জুর এলাহীসহ অনেকেই প্রচুর টাকা দিয়েছেন। কোন রিটার্ন পাননি। কোন রিটার্ন তিনি প্রত্যাশাও করেন না। দৈনিক দিনকালে কতো টাকা দিয়েছেন তার ইয়াত্তা নেই।

সর্বশেষ বেগম জিয়া তার কাছে পাঠিয়েছিলেন শফিক রেহমানকে। যিনি যায়যায়দিনের জন্য তাকে বিনিয়োগ করতে বলেছিলেন। সেখানে শফিক রেহমানের কাছে তিনি যে প্রস্তাব পেয়েছিলেন তার বিশালত্ব দেখে কিছুটা ভড়কে গিয়েছিলেন। কারণ বাইরে থেকে আজিম গ্রুপকে যেভাবে গ্রুপ হিসেবে ভাবা হয় বাস্তবতা তার ভিন্ন। এর বার্ষিক আয় দেশের যেকোনো টোটকা কোম্পানির চেয়ে কম। কারণ বাংলামেইলের মাসিক ১০ লাখ টাকা বেতন জোগাড় করার কষ্টটিতে আমি দেখেছি। যাই হোক, যায়যায়দিনের পেছনে প্রতিবছর ২০ কোটি টাকা গচ্ছা দেয়ার বিনিময়ে তিনি কী পাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে শফিক রেহমান নাকি তাকে বলেছিলেন, এদিকে ২০ কোটি টাকা খরচ করে অন্যদিক থেকে ২০০ কোটি টাকার লাভবান হতে পারবেন। তার তেমন কোন বিজনেস নেই বলে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

বাসা থেকে ফেরার জন্য যখন বিদায় নিচ্ছিলাম ঠিক তখনই আমার হাত ধরে জোর করে একটি প্যাকেট দিলেন। বেশ মোটা একটি হলুদ খাম। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্পর্কের মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়তে হয়নি আমাকে। আমি না করতেই দাবির সুরে বললেন, ‘বড়ো ভাই হিসেবে দিলাম। একটি পাঞ্জাবী কিনে নিও’। আমি অনেকটা দ্বিধান্বিত। এতোবড়ো মোটা খাম। তা দিয়ে পাঞ্জাবী কিনতে বললেন। বুঝলাম না। তখন আমি নিজেই ড্রাইভ করতাম আমার লাল ছোট্ট গাড়িটি। যেটিকে বন্ধুরা সবাই মজা করে বলতো, ‘মার্সিডিজ’। তার বাড়ির বাইরেই পার্ক করা ছিল। ঈদে ঢাকা ছেড়ে গেছে অনেক মানুষ, তারপরে ইফতারের পরের সময়। বেশ ফাঁকা ফাঁকা শহর। কিছুতেই নিজের ভেতরের কৌতুহল ধরে রাখতে পারছিলাম না। আর পাঞ্জাবী তো আগেই কিনে দিয়েছে আরেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। আর ইসরাফিল আলম ভাইও একটি পাঞ্জাবী এনে রেখেছেন বলে শুনেছি।

তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডের সঙ্গে আড়ংয়ে গাড়ি পার্ক করে প্যাকেটটি খুললাম। এতো মোটা প্যাকেট, অতো বড়ো ব্যবসায়ী। মনে হয় ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। খুব আগ্রহ নিয়ে প্যাকেট খুলে একটু বিস্মিত হলাম। ১০০ টাকার ৫০টি নতুন কড়কড়ে নোট দেখে। এবার বুঝলাম কেনো পাঞ্জাবী কিনতে বললেন। কিন্তু এ টাকায় কি সত্যিই পাঞ্জাবী হতো? এনাম ভাই রাপা প্লাজার প্রিন্স থেকে যে পাঞ্জাবী কিনে দিয়েছেন তার গায়ে লেখা ছিল ১০৫০০ টাকা। জানিনা তিনি কোন ডিসকাউন্ট পেয়েছেন কিনা। আর হসপাইপারের স্যান্ডেলটি ৭ হাজার ২০০ টাকায় কেনা।

ঈদের পরে সংসদের অধিবেশন আবার শুরু হলো। এর মধ্যে প্রথম আলোর হারুন ভাই ‘হাতিয়ার রাজনীতি ও দস্যুতা’ বা এমন কোন শিরোনামে একটি রিপোর্ট করেছেন। যাতে ফজলুল আজিমকে কোন একটি দস্যুবাহিনীর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চরের জমি দখলসহ অনেক অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ তিনিই পুরো সংসদ অধিবেশনে তার প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ আলীকে দস্যুদের সর্দার আর পুলিশ সুপার হারুনুর রশিদ হাজারীকে এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়েছেন। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টের পরে আমার উপর দায়িত্ব পড়লো এর প্রতিবাদ লিখে দেওয়া। যথারীতি আমি তা দিয়েছি-ও।

এর মধ্যে আমি প্রকাশ করলাম ‘পার্লামেন্ট জার্নাল’। সংসদে সক্রিয় ভুমিকা রেখেছেন এমন ১০জন সংসদ সদস্যর কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছিল তাতে। সংসদে সক্রিয়তার দিক থেকে তাকে নিয়ে প্রতিবেদনের শিরোনাম করলাম ‘ভয়েস অব পিপল’। ওই প্রকাশনার মূল উৎসাহদাতা ছিলেন বর্তমানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও তৎকালীণ স্পিকার আব্দুল হামিদ এ্যাডভোকেট। যেখানে তার স্ত্রীর সঙ্গে ফুল বিনিময়ের একটি রোমান্টিক ছবি ছেপেছিলাম। যা আলোড়ন তৈরি করেছিল। কারণ, মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্ত্রী সবসময়ই ছিলেন প্রচারের আলোর বাইরে।

যেদিন পার্লামেন্ট জার্নাল প্রকাশ হয় সেদিন তার বাসায় মেহমান এসেছিল। সম্ভবত তার বড়ো ছেলে ফারহানের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কথাবার্তা হওয়ার কথা। সেদিন সবার আগে সন্ধ্যায় তিনি পত্রিকা নিয়েছিলেন ১০০ কপি। মেহমানদের দেয়ার জন্য। অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছাপার এই জার্নালটির প্রতি কপির জন্য আমার ২১৭ টাকা খরচ হয়েছিল। সেখানে আমি ২০০ টাকা দাম রেখেছিলাম। কোন বিজ্ঞাপন নেয়া হয়নি। আশা ছিল সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ খুশি হয়ে বেশি টাকা দেবেন। কিন্তু একমাত্র শাহরিয়ার আলম ছাড়া বাকি সবাই কম দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ফজলুল আজিমের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। জার্নাল ছাপা হওয়ার আগেই তিনি দু’দফায় ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমদিনে ১০০ কপি ছাড়াও নির্বাচনী এলাকা সফরের সময়ে ২০০ কপি এবং চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে আরও ৫০ কপি জার্নাল নিয়েছিলেন। সেই ৫০ কপি পত্রিকা তাকে এয়ারপোর্টে পৌছে দিয়েছিলাম কোন এক সন্ধ্যায়। ওই প্রকাশনার আগে বন্ধু প্রশান্ত’র কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নিয়েছিলাম ছাপাখানার টাকা দেয়ার জন্য। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। ওই দু:খ থেকে দ্বিতীয় সংখ্যাটি আর করা হয়নি। তবে আরেকটি সংখ্যা প্রকাশের কাজ শেষ করে এনেছি। এটি হবে এ সংসদে আমার সর্বশেষ প্রকাশনা।

এর পরে তার সঙ্গে আরও কয়েকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। বিশেষ করে হরতালের দিনগুলোতে তিনি বাসা থেকে বের হন না। এই দিনগুলো আড্ডার জন্য তার প্রিয় সময়। এমন কোন একদিন তার বাসায় নাস্তা খাওয়ার দাওয়াত ছিল। সেখানে মহিষের দইয়ের সঙ্গে খেজুর গুড় আর নারকেল দিয়ে খাওয়া ভোলার নয়। নিজ হাতে আপ্যায়ন করতে তিনি খুব পছন্দ করেন। ওই সময়ে তার স্ত্রী বিদেশে ছিলেন। আমরা দিনভর আড্ডা দিয়েছি, দুপুরে খেয়েছি। সেদিনই বললো, একটি প্রস্তাব দিতে। আমি এর কিছুই বুঝি না। বলতেই ধরিয়ে দিলেন তার অফিসের এক ডিজিএম’কে। সাহাদাৎউল্লাহ খান। তার সঙ্গে বসে প্রোপোজাল তৈরি করার কথা বললেন। সে সময়ে আমাদের সময় নিয়ে ‍নূর আলী আর নাঈমুল ইসলাম খানের মধ্যে আইনী লড়াই চলছিল। আমার মনেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। আমিও আগ্রহী হয়ে আজিম গ্রুপের অফিসে গিয়ে বৈঠক করি। সাহাদাৎ সাহেব বেশ প্রাণবন্ত সাবজান্ত টাইপের একজন মানুষ। আমার মতো শারীরিক গঠন হলেও অসম্ভব বাকপটু।

তবে এবার ট্যাবলয়েড নয়, নিউমিডিয়া ‘অনলাইন’ ডেইলি। আমি একটি ধারনাপত্র তৈরি করে তাকে মেইল করি। সে সেটা বের করে রাখে। যাতে আমার সুনির্দিস্ট প্রস্তাব ছিল এর প্রফিট শেয়ারিং হবে ৫০:৫০। কয়েক দফা বৈঠক করে আমরা প্রস্তাব চূড়ান্ত করি। না বললেই নয়, অনলাইন ডেইলি করার ব্যাপারে পুরো আজিম গ্রুপের সবার বিরোধিতা একাই সামলে সামনে এগিয়ে নিয়েছেন এই ডিজিএম’ই। মূলত: তার আগ্রহের কারনে আমিও কাজ করে মজা পাচ্ছিলাম এবং একটি ভালো পেশাদার টিম নিয়ে কাজ শুরু করতে পেরেছিলাম। ফজলুল আজিম কোম্পানির চেয়ারম্যান শুনে তৎকালীণ স্পিকার এর উদ্ভোধন করতে আপত্তি করলেও আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারনে তাতে রাজি হয়েছিলেন। এবং চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন করেন তিনি।

শুরুতে একটি ছেড়া-ফাটা চেয়ার আর ভাঙা কাচের একটি ধুলি ধুসরময় টেবিল বরাদ্দ হলো আমার জন্য। যেখানে বসে আমার সাইনোসাইটিস নতুন মাত্রা পাচ্ছিলো। মূলত: এটি ছিল আজিম গ্রুপের পরিত্যক্ত একটি রুম। যেখানে ধুমপানে অভ্যস্তরা এসে ধুমপান করতো। প্রথম ১৫দিন এভাবে যাওয়ার পরে আমার হাজিরা নিশ্চিত করার জন্য বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করা হলো। আমাদের ডিজিএম সাহাদাৎ সাহেব এটি গার্মেন্টস’এ বাস্তবায়ন করে পুরো আইটির চৌদ্দগুষ্ঠি শিখে ফেলেছেন বলে জাহির করেন। তার অদ্ভুতসহ যুক্তি-কথাবার্তার সামনে আজিমগ্রুপের কেউ টিকতে পারেন না। আমি টেকার চেষ্টা করি না। তার এসব কথা শুনি আর হাসি। তবে এই চতুর ডিজিএম কোম্পানি তৈরির ক্ষেত্রে আমার শেয়ারিংয়ের বিষয়টি চতুরতার সাথে এড়িয়ে গিয়েছেন। আমি যতোক্ষণে বুঝেছি, ততোক্ষণে পূর্বের কর্মস্থল ত্যাগ করেছি। আমি কিছু বলিনি কাজ করে গেছি।

সমস্যা দেখা দিল আমার উপস্থিতির সময় কী হবে আর অফিস টাইমও বা কী হবে তা নিয়ে। ডিজিএম জানালেন, স্যার (ফজলুল আজিম) অফিস টাইম ৯টা ছাড়া অন্য কোন কিছু এ্যালাউ করেন না। আপনাকে ৯টায় আসতে হবে। যে ভয়ে বিসিএস-এ প্রিলিমিনারিতে টেকার পরে ভাইবার দিনে না গিয়ে বেক্সিমকো মিডিয়ায় গিয়েছিলাম এ্যাপয়েনমেন্ট লেটার আনতে। সেই ৯টা আবার আমার সামনে। ডিজিএম সাহেব যুক্তি দেখালেন আপাতত: আপনি এ সময়ে আসুন। পত্রিকার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে পরে টাইম পরিবর্তন করে নেবেন। সেই যে শুরু তার আর শেষ নেই। গত এক বছরে বিলম্ব উপস্থিতিতে কতো টাকা কর্তন হয়েছে তার হিসাব আমার কাছে নেই। কোন ছুটি তো দূরের কথা, মায়ের অসুস্থতায় বাড়ি গিয়ে এসে দেখি ৭দিনের বেতন নেই। অথচ সকাল ৯টা থেকে রাত ১১ পর্যন্ত কাজ করেছি। আমার স্ত্রী এমন চাকরির দরকার নেই-বলে চাকরি ছাড়ার জন্য অনেক চাপাচাপি করেছেন।

১৬ বছরের পরিচয়ে সম্পর্ক ছোট ভাই বড়ো ভাই ছিল। সম্মোধনও ছিল ‘আজিম ভাই’। তার অফিসে যখন যেতাম একই সম্বোধন করতাম। এটা অবশ্য তার আশে-পাশের দাসগুলো মানতে পারতো না। খুবই বয়স্ক ফাজিল টাইপের একটা পিয়ন আছে তার। একদিন গিয়ে বললাম, আজিম ভাই আছে? সে আরেক পিচ্ছি পিয়নকে ডেকে টিপ্পনী কেটে বললো, স্যারকে যাইয়া বল তার ভাই আইছে। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা নোয়াখালী প্রাধান্য অফিসে পেয়ে একটু বিস্মিত হলাম। পরে শুনলাম সেই বুড়া পিয়নটা তার (ফজলুল আজিম) শ্বশুর বাড়ি এলাকার। তার অফিসে কাজ শুরুর পরে বুঝলাম, আমার আজিম ভাই’ও আমার কাছ থেকে আর ‘ভাই’ ডাক শুনতে চাননা।

অন্য দাসদের মতো আমিও তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করা শুরু করলাম। আর কাজ শুরুর পর থেকে তার আচরণের পরিবর্তন আমাকে শুধু বিস্মিতই করেনি। রীতিমত হতবাক হয়েছি। তারপরেও নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, আমার ওপর নির্ভর করে যে এতো টাকা খরচে সম্মত হয়েছে তার প্রতি সম্মান রেখে অন্তত: কাজটি সঠিকভাবে করে যাই। আমি সেটা করেছি। বাংলামেইলকে কোন প্রকার টেম্পারিং ছাড়াই একটি সফল জায়গায় দাড় করাতে পেরেছি। যাকে বলে বাংলামেইল এ সময়ের একটি ভাইব্রেন্ট অনলাইনে পরিণত হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি প্রয়োজনীয় কৌশলগত কাজগুলো করতে পারলে অনলাইনের ইতিহাসটি নতুন করে লেখাতে পারতাম।

বাংলাদেশে এমন কোন মিডিয়া হাউস আছে কী- যেখানে সম্পাদকের সিদ্ধান্তের পরে আর কোন সিদ্ধান্ত থাকে? আমার জানা নেই। কিন্তু বাংলামেইলে তা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। অর্থাৎ সম্পাদকের কাজটি ছিল এ্যাসিস্ট করা। যা একজন এক্সিকিউটিভের কাজ। অনেক ভালো ভালো সাংবাদিক, রিপোর্টারকে আমি নিতে পারিনি শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রিতার কারনে। বিডিনিউজের আবু সুফিয়ানের ১৫দিনের বেতন দিতে পারিনি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারনে। তাজ ভাই, সাদ্দাম হোসেন ইমরানকে টাকা দিতে পারিনি। যথাসময়ে নিয়োগপত্র দিয়ে রাখতে পারিনি রহমান মুস্তাফিজ, জাহিদুর রহমান শিশিরকে।

চট্টগ্রামে অফিসে বসার জায়গা দিয়েছি, একটি কম্পিউটারও দিতে পারিনি। ব্যুরো ইনচার্জ হিসেবে কাজ করার পরেও বেতন পাননি ফারুক আজম। এগুলো আমার সাংবাদিকতা জীবনের কলঙ্ক তিলক হয়ে থাকবে। আর এখন পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়োগ দিতে পারিনি। বেতন তো দূরের কথা একটি আইডি কার্ড দিতে পারিনি। আর সেই আমি নির্লজ্জের মতো ঢাকায় সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছি, সাংবাদিকদের নেতা হচ্ছি।

শুরুতে একটা সমস্যা ছিল আজিম গ্রুপে আমার অবস্থান কী? আমি কী আজিম গ্রুপের জিএম না ডিজিএম স্ট্যাটাসের অফিসার না এজিএম? আমাকে কিভাবে তারা ট্রিট করবে? বেতনের দিক থেকে আজিম গ্রুপের ঢাকা অফিসে সবচে’ বেশি বেতন ছিল আমার। এটা ছিল সবার চক্ষুশূল। এক জিএম নাকি বেতন পান আমার অর্ধেকেরও কম। অথচ তার ছেলেও আমার চেয়ে বড়ো। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হতো। আর সবাই যতোটা সম্ভব বাধা দিত প্রতিটি পদক্ষেপে। আরমান নামের এক এজিএম আরেক এজিএমকে বলেন সে ‘আজিম গ্রুপের শ্রেষ্ঠ চোর’। সেই শ্রেষ্ঠ চোরটার না-কি সব জায়গা থেকে কমিশন লাগবে। কমিশন না পেলে কাজ আর আগায় না।

আমার এ বিল, ও বিল আটকে যায়, হারিয়ে যায়। সেই চোর’টা কোন কিছু কেনাকাটা করার জন্য চেয়ারম্যানের অনুমোদন নেয় না। অথচ চার লাখ টাকার বিজ্ঞাপন অর্ডার দেয়ার জন্য চেয়ারম্যানের অনুমোদনে জন্য বাসায় গিয়েছিল। এ নিয়ে সবার সামনে তাকে বকা দিলেও সেই নির্লজ্জ লোকটি কোন লজ্জা পেল না। এইসব চোরদের আল্লাহ নানাভাবে শিক্ষা দেয়, তারপরেও তাদের স্বভাব বদলায় না। সবচে’ অবাক লাগে আজিম গ্রুপের কর্মচারিদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই। সবাই সবাইকে চোর বলে গালি দেয়। আবার চুরির সময়ে একের সঙ্গে আরেকজনের অদ্ভুত মিল দেখে আমি বিস্মিত হই।

স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমি আমার রুম ছেড়ে দেই। সেখানে পার্টিশন খুলে নিউজরুম তৈরি করি। অথচ আজিম সাহেব আমাকে বলতো, এই অফিস হবে তোমার আর আমার। কারণ পুরো আজিম গ্রুপ সাভারে চলে যাচ্ছে। সেখানে ১০ তলায় ৪ কোটি টাকা খরচ করে অফিস করা হয়েছে। কিন্তু তার কোন লক্ষণ আমি দেখিনি। কারণ ৫ তলা ফাউন্ডেশনের উপর জোড়াতালি দিয়ে ১০ তলা করা হয়েছে। উপরের ছাদ এতোই পাতলা যে হাটলে কাপতে থাকে। সাভার পৌরসভা থেকে নাকি ৭তলা পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকিটা এখনও পাওয়া যায়নি।

এদিকে আজিম গ্রুপের অফিসের চেহারা দেখে আমার কান্না পেতো। ছেড়া-ফাটা আসবাবপত্র, নেই কোন ডেকোরেশন। আমি আজিম ভাইকে বললাম, আপনার ব্যক্তি পরিচিতি, আপনার বাসার সঙ্গে অফিসটি যায় না। আমার কথায় অনেকটা লজ্জা পেয়েই ডেকোরেশনের উদ্যোগ নিলেন। অফিসটি ডেকোরেশন হয়েছে। যখনই দেখা হতো তখন্ই আজিম সাহেব আমাকে বলতো, তোমার জন্য এতোগুলো টাকা খরচ করে ডেকোরেশন করেছি। আর ডিজিএমকে বলতো, এই টাকার খরচটি মেইল মিডিয়ার নামে যাবে। গত ৯ মাস আমার কোন অফিস ছিল না। যে অফিসটি দেয়া হয়েছে সেই অফিসটিও আমি চাইনি। এখানে অডিটের এক এজিএম তার দু’সহকর্মী নিয়ে বসতো। তাকে উঠিয়ে বসা আমার জন্য ছিল বিব্রতকর। কিন্তু সেই চতুর ডিজিএম কৌশলে রুমটি থেকে সেই এজিএমকে উচ্ছেদ করে আমাকে বসার ব্যবস্থা করেছেন। এতে ডিজিএম খুশি হলেও আমি খুশি হইনি।

এতোদিন অফিস ছাড়া কাজ করেছি ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে। যখন অফিস পেলাম তখন আর সেই অফিস আমাকে টানে না। ভালো লাগে না যখন দেখি একই অফিসে বসে কাজ করে আজিম গ্রুপের কর্মীরা বেতন পায় ৬/৭ তারিখে আর বাংলামেইল ১৪/১৫ তারিখে। সহকর্মীরা দু:খ করে বলতো, আমরা গার্মেন্টস এর চেয়েও খারাপ? এক বছরে কনফর্মেশন হয়নি। বিয়ে করতে গিয়ে বেতন কাটা গেছে। আর এ্যাকসিডেন্ট করে অফিস করেছে বেতন কাটার ভয়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড়ো ভাই, হাতিয়ারই মানুষ খোকন ভাই প্রায়ই এসে বলতো, আর ক’দিন আছেন? আমি বুঝতে পারতাম না। বলতেন, আমিও আজিম সাহেবের সঙ্গে গ্লোবাল টেকনোলজি শুরু করেছিলাম। এখানকার চোরগুলো তা করতে দিলো না।

আমি বলতাম, দু’যুগের বেশি সাংবাদিকতা করি। এখানে না হয় কাজ না-ই করলাম। এটা সমস্যা না। আমার ক্যারিয়ার তো বাংলামেইলে শেষ হবে না। আর শেষ বলে কিছু নেই। আজ বাংলামেইলের প্রিন্টার্স লাইনে নাম লেগেছে তো কাল অন্য জায়গায় লাগবে। আর এমন আজিম সাহেব দু’চারজন আমার পেছনে বিনিয়োগের জন্য বসে আছে। খোকন ভাই বলতো, এইটা দেখিয়ে দেখো সে বিএনপির নমিনেশন পায় কি-না? আমি কিন্তু আজিম সাহেবকে কখনো প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যক্তিগত ইস্যুতে ব্যবহার করতে দেখিনি। এদিক থেকে আমি ভাগ্যবান ছিলাম। আর সমস্যাগুলো তার সামনে গেলে থাকতো না। চোরগুলো তার সামনে গেলে সব সোজা, তার বাসার বাইরে বের হলেই শুরু হয় ষড়যন্ত্র। কারণ এখান থেকে কমিশন খাওয়ার সুযোগ নেই। তার চেয়ে দু’চারটি ভেজাল জমি কিনে দিতে পারলে, অফিসের কোন কেনাকাটা থাকলে তা থেকে কমিশনটা নিশ্চিত থাকে।

ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটায় ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান ড্যাপ-এ জলাধার হিসেবে চিহ্নিত একটি জায়গা স্বল্পমূল্যে কিনে তার দখল নিতে পারছেন না ফজলুল আজিম। কারন ভেজাল এই জমি তার আগেও আরও এক ব্যক্তি কিনেছিলেন। এই জমি কেনায় ডিজিএম-এর যতোটা আগ্রহ তার একশ’ ভাগের একভাগ বাংলামেইলের জন্য থাকলে আমার আর বাংলামেইল ছাড়তে হতো না। এসব ভেজাল জমির প্রতি ফজলুল আজিমের আগ্রহ দেখে মাঝে মাঝে আমি নিজেও দ্ধিধান্বিত হই। তাহলে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সংসদে ফজলুল আজিমকে ভুমি দস্যু ও জলদস্যু বলে যে সম্বোধন করেছিলেন তা সঠিক কি-না?

আগেই বলেছি, বাংলামেইল আমার সন্তানের মতো। আজিম সাহেবের সঙ্গে যখন কথাবার্তা চূড়ান্ত হয় তখন তিনি বলেছিলেন, আমি কিন্তু ইনভেষ্টর নই, প্রমোটার। প্রতিষ্ঠানটি থেকে আমি কোন রিটার্ন চাই না। আমিও সেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এইসব চোরদের কানভারীর কারনে ইদানিং তার মালিক হওয়ারও সখ হয়েছে। যে বাংলামেইল ডোমেইন আমি নিজে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে আমার বন্ধুর মাধ্যমে তার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কেনা হয়েছে তা না-কি তাকে দিয়ে দিতে হবে। তাকে নয়, সেইসব চোরগুলোকে। কারণ ওই চোরগুলো আমার চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত। সামনে গেলে তাদের কাচুমাচু চেহারা দেখলে আমার হাসি পায়। অথচ পেছনে এদের আচরণ একেকটি বাঘের মতো।

সেখানে আজিম সাহেবের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে তাদের একটু বাধে না। তার ব্যক্তি চরিত্র, সন্তানদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়া, তার স্ত্রী কয় নম্বর- এসব বিষয়ে তারা সমালোচনা করতে ছাড়েন না। অবশ্য তাদের কল্যাণে অনেক কথাই জেনেছি, এতোদিন একভাবে চেনা ফজলুল আজিম সাহেবকে। গান্ধার কোম্পানিতে চাকরিকালীণ তার বস এক বিখ্যাত ‘এক খানে’র বিখ্যাত ‘খান’ স্ত্রীর সঙ্গে কতো কিছুর বিবরণ যে শুনেছি তার ইয়াত্তা নেই।

আমি নিজেও অতোটা প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন নই। তাই অন্য লোকের সাহায্য নিই। আমার অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ ব্ল্যাকমেইল করেছে। নইলে অনলাইন পত্রিকা মাত্র ১জন আইটি এক্সপার্ট দিয়ে চালানোর প্রজেক্ট প্রোফাইল করি আমি? যাই হোক বন্ধুদের কেউ সুযোগ সন্ধানী থাকে। আমি হয়তো এখনও তার শিকার। আমি নিজেও চাই এটি যেহেতু খুব একটা দামের কিছু নয়। সেটা তাদের কাছে থাকলে তো আমার সমস্যা নাই। আমি সেভাবে বন্ধুকে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সে নিজে এর কন্ট্রোলটি রাখার পক্ষে। তার যুক্তি হচ্ছে, বাংলামেইল যেহেতু তোর স্বপ্নের একটি বিষয়। এটিকে বাচিয়ে রাখা উচিত। আজিম গ্রুপের কর্মকর্তাদের এ নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখে মনে হচ্ছে, তারা এটি বন্ধ করে দিতে পারে। যেভাবে তোকে কাজ করতে দিচ্ছে না।

তবে প্রকৃত যুক্তির দিকে গেলে, এই ডোমেইনের প্রতি তাদের কোন দাবি থাকার কথা নয়। কারণ এর জন্য যখন আমি টাকা চেয়েছি, তখন তারা বললো, কোটেশন দেন। তিনটি কোটেশন লাগবে। এর মধ্যে যার দর কম তাকে কাজ দেওয়া হবে। আমি বন্ধুকে বলতেই বললো, আমার ক্রেডিট কার্ড আছে। তোকে কিনে দেবো। এর সকল কন্টাক্টে ফজলুল আজিমের নাম ছিল। এখনও আছে। আমার কাছে আছে ইমেইল কনটাক্ট। পরে তাদের দাবিতে সব কন্টাক্টেই তাদের ইমেইল বসানো হয়েছে। এখন তাদের দাবি ডোমেইন ট্রান্সফার করে দিতে হবে। এ নিয়ে আমার সঙ্গে সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি হয়েছে। এর আগে আমার সহকর্মীদের সেগুন হোটেলে খাইয়ে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টা করেছে সেই ডিজিএম। যা পরে চেয়ারম্যানের সামনে ধরা পড়েছে।

দৃশ্যত: বাংলামেইল২৪ডটকম ডোমেইনটি আমার কাছে নেই।এর কোন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। কারণ কোথাও আমার কোন কনটাক্ট, ইমেইল ব্যবহৃত হয়নি। বাংলামেইল২৪ডটনেট-এ এখনও কনটাক্ট ও ইমেইল আমারটা ব্যবহৃত হচ্ছে। আমি হয়তো এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো। যেভাবে আমার গুরু নাঈমুল ইসলাম খান ‘আমাদের সময় ডটকম’ চালাচ্ছে। তবে মেইল মিডিয়া লিমিটেড বা আজিম গ্রুপ যতোদিন প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে নেবে ততোদিন আমি অবৈতনিকভাবে সহযোগিতা করে যাবে। প্রতিষ্ঠানটি তারা বন্ধ করে দিতে চাইলে সে ক্ষেত্রে আমার চেষ্টা থাকবে বাংলামেইল২৪ডটনেট বাচিয়ে রাখা। অর্থাৎ আমার স্বপ্নকে বাচিয়ে রাখা।

গত দু’দিন বন্ধু মহলে সময় কাটিয়ে আড্ডা দিয়ে বেশ ভালো সময় কেটেছে। অনেকেই জানতে চেয়েছে, নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়েছি। গত দু’দিন সকাল ৯টায় দৌড়াতে দৌড়াতে স্কাউট ভবনে উঠতে হয়নি বায়োমেট্রিক দিতে। কারণ প্রতিদিন সকালে রমনা পার্কের হাটা সংক্ষিপ্ত করে অনেক দিন নাস্তা না করেই অফিসে যেতে হয়েছে। এখন আমার বাসাটিও আর স্কাউট ভবনের কাছে নেই। সকালে তাড়াও থাকবে না অফিসে যাওয়ার। প্রতিদিন টেনশনমুক্তভাবে ঘুম ভাঙে আমার।

আসাদুজ্জামান সম্রাট, প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, বাংলামেইল২৪ডটকম
সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি

(এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, লেখাটির কোন প্রকার দায়-দায়িত্ব প্রেসবার্তাডটকম নেবে না। এছাড়া লেখাটি প্রেসবার্তাডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।)