নিজ অফিসে মফস্বল সাংবাদিকদের মূল্যায়ন !

রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৩

মাহাবুর আলম সোহাগ

Mahabur-Alam-Shohagমফস্বল সাংবাদিকদের দুঃখ, দুর্দশা, ভোগান্তি, কষ্ট ও তৃপ্তি নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের শেষ পর্ব এটি। এর আগে মফস্বল সাংবাদিকদের এসব কাহিনী নিয়ে দুটি লেখা লিখেছি। যা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশও হয়েছে। ব্যাপক সাড়াও ফেলেছে মফস্বল সাংবাদিকদের কাছে। এমনকি মফস্বলের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপানো হয়েছে লেখা দুটি।

শেষ পর্বে যা লিখতে চাই, জানিনা এ লিখাটি সাংবাদিকদের কাছে কতটুকু গুরুত্ববহন করবে। তারপরও লিখব। ২০০৭ সালে আমি তখন ঢাকার একটি জাতীয় পত্রিকার (পাঠক, বিশেষ কারণে পত্রিকাটির নাম উল্লেখ করলাম না) ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা।

ছোট একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করতে চাই। একদিন ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবে বিকেলের দিকে বসে আড্ডা দিচ্ছি। এমন সময় (আমি যে পত্রিকায় কাজ করি ওই) পত্রিকা অফিস থেকে আমার মোবাইলে টেলিফোন থেকে একটি ফোন এলো। আমি তো মহাখুশি। উপস্থিত সবাইকে বললাম, ‘একটু চুপ করেন আমার অফিস থেকে ফোন এসেছে।’ এরপর কথা বলা শুরু করলাম। এক পর্যায়ে আমি বাধ্য হয়ে ওই স্থানটি ত্যাগ করে অন্য স্থানে চলে গেলাম শান্তিপূর্নভাবে কথা বলার জন্য।

কারণ অফিস থেকে ফোন দিলেই খুব খুশি হতাম। আর ভাবতাম নিশ্চয় আমাকে একটু গুরুত্ব দিয়েছে। তাই গুরুত্বের বিষয়টি চিন্তা করেই খুব খুশি হতাম।

যাহোক, অফিস থেকে একজন সাব-এডিটর আমাকে ফোনে জানালেন, আমি যে সংবাদটি ফ্যাক্স করেছি, সেটি অস্পষ্ট। আবার পাঠাতে হবে। আবার গেলাম ফ্যাক্স করতে। ঠাকুরগাঁওয়ে তখন হাতে গোনা কয়েকটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকান। অনেক কষ্টে ফ্যাক্স করলাম। এরপর অফিসের ওই নম্বরে ফোন করে জানিয়ে দিলাম। অফিস থেকেও আমাকে জানানো হলো, সংবাদটি এবার ভালোভাবে পাওয়া গেছে।

এরপর আমি চিন্তা করলাম অফিস থেকে যেহেতু সংবাদটি আবার চাওয়া হলো, সেহেতু সংবাদটি পরের দিন নিশ্চয় ভালোভাবে প্রকাশ পাবে। কিন্তু মজার ঘটনা কি জানেন, পরের দিন পত্রিকায় সংবাদটি ছিল না। কেমন লাগে বলেন। এতো কষ্ট করে সংবাদটি দ্বিতীয়বার পাঠালাম। অথচ আসলো না।

তবে এর কয়েকদিন পর একটা সংবাদ ছাপা হয়েছিল প্রথম পাতায়। বিশ্বাস হয়তো করবেন না, ওই পত্রিকাটি সারাদিন হাতে নিয়ে ঘুরেছি। চোখের সামনে যে কয়েকজন পরিচিত মানুষ পেয়েছি তাদের দেখিয়েছি। এক পর্যায়ে হাতের ঘামে পত্রিকাটি ভিজে গিয়েছিল সেদিন।

অবশ্য, যেদিনই প্রথম পাতায় সংবাদ ছাপা হয়েছে, সেদিনই আমি মহাখুশি। তবে, আফসোস কোনো দিনও নাম দিয়ে আমার সংবাদ প্রকাশ হয়নি প্রথম পাতায়। অথচ স্টাফ রির্পোটারদের যেকোনো সংবাদ বাই নামে প্রকাশ হতো।

এ আফসোসগুলো কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারতাম না। অফিসে বলার সাহসও পেতাম না, যদি আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নেয় এই ভয়ে। এভাবে হতাশা আর কষ্টের মাঝেই দিন পারতাম করতাম।

এরপর এলো ডিসেম্বর মাস। কার্ডের মেয়াদ শেষের দিকে। ভাবলাম অফিসে গিয়ে নতুন একটা কার্ড নিয়ে আসবো। অফিসে ফোন করে বললাম, ‘কার্ডের মেয়াদ শেষের দিকে, আমি কি আসবো?’ অফিস থেকে জানানো হলো, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আসেন।

অফিসের কথা অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই গেলাম। অফিসে গিয়ে পৌঁছালাম সকাল সাড়ে নয়টায়। দেখি তেমন কেউ নেই। কয়েকজন আছেন, কিন্তু খুব ব্যস্ত। ভয়ে কোনো চেয়ারে বসার সাহস পাচ্ছি না। বলা তো যায়না সেটা কোনো বড় কর্মকর্তার চেয়ারও হতে পারে।তাই বসতাম না।

এরপর সম্পাদক সাহেব এলেন। আমাকে বললেন, ‘আপনার কি চাই।’ উত্তরে জানালাম, ‘আমি ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি কার্ডের জন্য এসেছি।’

এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি বিকেলের দিকে আসেন।’ এ কথা বলেই তিনি তার রুমে চলে গেলে। আমার কোনো কথাই শুনলেন না। অপরদিকে, তার এ কথা শুনে খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম কোথায় যাব এখন। এরপর সারাদিন অফিসের বাইরে সময় কেটে বিকেলে আবার অফিসে গেলাম।

অফিসে গিয়ে দেখি সবাই এতো ব্যস্ত কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই। চিন্তা করলাম বার্তা সম্পাদকের সঙ্গে পরিচয় হবে। তার কাছে যাওয়া মাত্রই তিনি বললেন, ‘কিছু বলবেন, একটু তাড়াতাড়ি বলেন, এখন আমাদের পিক আওয়ার কাজের সময়।’ আমি পরিচয় দিলাম, তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে ভালোভাবে কাজ করেন।’ বেশ এটুকুই। এছাড়া তিনি আরও কিছুই বললেন না। এরপর আর কেউ কথা বললো না আমার সঙ্গে। তখন নিজেকে ‍খুব একাকি মনে হচ্ছিল।

প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকলাম সম্পাদক সাহেবের সঙ্গে কথা বলার জন্য। এর মাঝে কেউ আমার সঙ্গে কোনো কথা বললেন না। কেউ একচাপ চায়ের কথাও বললেন না। খুবই খারাপ লেগিছিল সেদিন।

তিন ঘণ্টা পর সম্পাদক সাহেবের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো। সম্পাদক সাহেবের রুমে প্রবেশের পর কার্ডের কথা বলা মাত্রই তিনি জানালেন, ‘পরের দিন সকালে এসে নিয়ে যেতে।’ অথচ সেদিনই সকালে গেছিলাম, তিনিই বলেছিলেন, ‘বিকেলে এসে কার্ড নিয়ে যেতে।’

এরপর তিনি বললেন, ‘আপনার সঙ্গে এখন কথা বলার সময় নেই, পরে কথা হবে।’

সম্পাদকের রুম থেকে বাইরে এসে হতাশার দম ছাড়লাম। চিন্তা করলাম অফিসে একটু সময় কাটাবো। দেখবো কিভাবে এখানে সবাই কাজগুলো করেন। কাজের টেবিলের দিকে যেতে না যেতেই, পিয়ন এসে বললেন, ‘আপনাকে না সার আগামীকাল (অর্থাৎ পরের দিন) সকালে আসতে বলেছে। এখন যান। কালকে আসেন।’

আরও হতাশ হলাম। ভাবলাম সাব-এডিটর, স্টাফ রির্পোটার তো কথাই বলেন না, দেখছি পিয়নও মূল্যায়ন করেনা। পিয়নের ওই ব্যবহারে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। চোখে পানি চলে আসার অবস্থা হয়েছিল তখন।

তখন বার বার মনে হচ্ছিল এসব মানুষগুলোর জন্য নিজের এলাকায় কত কিছু না করি, অথচ তাদের কাছে এলে তারা চিনেনা, কথাও বলেনা। আর মনে হচ্ছিল, ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকে একটি কার্ডের জন্য ঢাকায় এসেছি, অথচ সামান্য একটি কার্ড দিবে তাতে কত হয়রানি করছে।

এরপর, পরেরদিন সকালে অফিসে গেলাম সকাল দশটায়। গিয়ে দেখি সম্পাদক সাহেব অফিসের বাইরে। তিনি নাকি আসবেন দুপুর ২টায়। অপেক্ষা করলাম ওই সময় পর্যন্ত। এরপর তিনি এলেন, আবার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনার কি’ আরও অবাক হলাম। ভাবলাম, কালকে থেকে এ মানুষটির সঙ্গে তিন দফায় কথা হয়েছে অথচ তিনি আমাকে চিনতেই পারছেন না।

র্নিলজ্জের মতো আবারও আমার পরিচয় দিয়ে কার্ডের কথা বললাম। তিনি এক বাক্যে বললেন ‘ফ্রেবুয়ারির আগে কার্ড দেওয়া যাবে না, আপনি পরে আসেন। এখন যান।’ তিনি আমার কোনো কথায় শুনলেন না।

এরপর কষ্ট নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে আসলাম। ভাবতে লাগলাম, কার জন্য দিনরাত কষ্ট করে কাজ করছি। কেন করছি। আমার একটু ভালো লাগা আর একটু শখকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কেনো এতো হয়রানির শিকার হচ্ছি। কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তারপরও হতাশ হয়নি।

এরপর এলাকায় এসে শুধুই ভেবেছি, যার জন্য এতো কাজ করছি তারা সামান্য মূল্যায়ন পর্যন্ত করেনা। অথচ অফিসে গিয়ে আমি অনেক স্টাফ রির্পোটারসহ অনেককে অনুরোধ করেছি, ভাই চলেন চা খাব। কষ্টের সঙ্গে বলতে হয়, কেউ আমার সঙ্গে চা খাওয়ার সময় পর্যন্ত দেননি।

জানিনা, মফস্বলের সাংবাদিকদের এতো অবমূল্যায়ন কেন করেন অফিসের লোকজন। কেন তারা ভুলে গেছেন, তারা নিজেও কোনো না কোনো মফস্বল এলাকার। কেন একজন স্টাফ রির্পোটারকে এতো গুরুত্ব, আর কেনই বা একজন মফস্বল সাংবাদিকের প্রতি এতো অবহেলা।

তবে, শেষে একটি কথায় বলবো, মফস্বলের একজন সাংবাদিক অফিসের ডেস্কের কোনো একজন কর্মীর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে মেধাবী। কারণ একজন মফস্বল সাংবাদিক কোনো একটি জেলা বা উপজেলার বিশেষ গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি।

[লেখক: মাহাবুর আলম সোহাগ, নিউজরুম এডিটর, বাংলানিউজ, ই-মেইল: [email protected] ]
সৌজন্যে : বাংলানিউজ