মিডিয়ার নাইট-লেট নাইট!!

সোমবার, ০৮/০৭/২০১৩ @ ২:৪৭ অপরাহ্ণ

সাজেদা হক ::

sajeda haque1কর্মস্থলে সাধারণত দায়িত্ব পালন করতে হয় ৯টা-৫টা। সব সরকারি অফিস ও বেসকারি প্রতিষ্ঠানে একই নিয়ম। ব্যতিক্রম কেবল মিডিয়া হাউসগুলো। সে পত্রিকা হোক আর টেলিভিশন। সংবাদের তো বাধা ধরা কোনো নিয়ম নেই, যেকোন মুহুর্তে ছুটতে হতে পারে সংবাদের জন্য। সেজন্য ২৪ ঘন্টাই ‘অন ডিউটি’ থাকেন মিডিয়া কর্মীরা। অবশ্য হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদেরও একইভাবে ‘অন ডিউটি’ থাকতে হয়।

আর এই ২৪ ঘন্টা তো আর একজনের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়, তাই শিফট। অর্থাৎ ৮ ঘন্টা হিসেব করে কেউ সকালে, কেউ বিকেলে তো কেউ রাতে ডিউটি করে। বিদেশের কোনো মিডিয়া হাউজের কথা হলফ করে বলতে পারবো না, কিন্তু দেশীয় গণমাধ্যমগুলো রাতে মেয়ে কর্মীদের রাখা হয় খুব কম। এটা হয়তো সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করেই। তারপরও প্রয়োজন কোনো আইন মানে না।

২০০৭ সালের ১১ নভেম্বরের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা ‘সিডর’ ছিলো আমার সাংবাদিক জীবনের প্রথম বড় ‘প্রয়োজন’। সেদিন কোন আইন না মেনেই আমার দিন শুরু হয়েছে একুশে টেলিভিশনে, রাতও কেটেছে একুশে টেলিভিশনে টানা কাজ করে। সেটাই আমার সাংবাদিক জীবনের ‘বড় ইভেন্ট! সেই প্রথম অভিজ্ঞতা। নিউজরুম থেকে জেলায়, জেলা প্রতিনিধি, স্টাফ রিপোর্টারদের সাথে সমন্বয়, স্ক্রিপ্ট লেখা, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ..সেই সাথে স্ক্রলে লাশের সংখ্যা বাড়ানো…উফ!!! কি যে ভীষন ভয়াবহ ব্যস্ততা, দিন-রাত যে কখন কেটে গেছে, কাজের চাপে সেটা এখনও মনেই পড়েনা। একটু অবসরে লাশের সংখ্যা নিয়ে সহকর্মীদের সাথে কষ্ট শেয়ার করার অনূভূতিটাও স্বজন হারানো ব্যাথার মতোই!

এরপর ২০০৮ এর ২৯ ডিসেম্বর সংসদীয় নির্বাচন। তখনও একুশে টেলিভিশনে। আমার সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে সফল আর স্মৃতিবিজড়িত ইভেন্ট। প্রার্থীদের প্রোফাইল তৈরি থেকে শুরু করে, ভোট শুরু, গণনা এবং সরকার গঠনের সব কাজ যেনো আমরাই করছিলাম। দিন-রাত কোন দিক দিয়া যে গেছে…এখনও মনে পড়ে না!! দারুন অভিজ্ঞতা! এতো আগ্রহ নিয়ে ওই সময়টা কাটিয়েছি যে, এখনও ভূলতে পারি না! এতো কাজ যে কথা বলার সময় নাই! সকালে যখন রিপোর্ট তৈরি করতে গেছি, দেখি গলা দিয়ে আওয়াজই বের হয় না…হা হা হা! ভাঙ্গা গলায় ভয়েজ দেয়া, সেটাও আবার অনএয়ার করা, দারুন সে অভিজ্ঞতা।

এরপরই কর্মস্থলে ভয়াল রাত-দিন পার করেছি ২০০৯ সালের ২৫-২৮ ফেব্র“য়ারি। তখনও একুশে টেলিভিশন এ। ২৫ তারিখ সকালে অফিসে ঢুকেই আটকে পড়েছিলাম, বিডিআর বিদ্রোহ। স্পটে আব্দুল্লাহ তুহিন! পড়ে যোগ হয়েছেন আরো অনেকেই। কিন্তু ভয়, আতঙ্ক আর টান টান উত্তেজনাময় প্রায় ৩দিনের একটি অবিস্মরনীয় ইভেন্ট, যা এখন ইতিহাস। আর আমরা কালের সাক্ষী। কয়জন পায় এমন ভাগ্য!!!

তারপরে ২০০৯ এর ২৩ মে, আবারো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাম ‘আইলা’। তখনও একুশে টেলিভিশন। একই দায়িত্ব, একই ব্যস্ততা, একই কষ্ট, একই আনন্দ!!! এর মাঝে স্থানীয় সরকার নির্বাচন গেছে। তখন আমি বৈশাখী টেলিভিশনের কর্মরত সেসময়ও নির্বাচন কেন্দ্রীক কাজ নিয়ে কর্মস্থলেই রাত-দিন পার করতে হয়েছে। অপূর্ব সে অভিজ্ঞতাও।

এরপর বৈশাখী টেলিভিশনে লেট নাইট করতে হয়েছে ‘মহাসেন’ এর অপেক্ষায়। সেদিন শারিরক ক্লান্তির চেয়ে মানবিক উদ্বেগ কাজ করেছে বেশি। আসি আসি করেও শেষ পর্যন্ত আসেনি মহাসেন। তবে আমার দেখা সেরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উদাহরণ এই ‘মহাসেন’। সে হোক মিডিয়ার, কিংবা হোক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশস নিবাচনের রেজাল্টও আশা করি দ্রুতই হয়ে যাবে। সেই সাথে শেষ হবে ক্লান্তিময়, পরিশ্রমী একটা দিন-রাত। সাংবাদিকতার এই এক অন্যরকম অহংকার, যা অন্যরা ঠিক এইভাবে মনে হয় উপলব্ধি করতে পারে না। আজ বেশ গর্বই বোধ হচ্ছে আমার।

‘সেইসব-এইসব’ স্মৃতিময় দিনগুলোতে যারা সাথে ছিলেন-আছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন-দিচ্ছেন, সহযোগিতা করেছেন-করছেন, সাথে থেকেছেন-আছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আপনাদের সবার সহযোগিতায় আমার আজকের এমন সুখবোধ, পেশাটাকে নিয়ে এমন অহংকার।

লেখক: সহকারী বার্তা-সম্পাদক, বৈশাখী টেলিভিশন।

সর্বশেষ