অতঃপর আমরা!!

সোমবার, ০৮/০৭/২০১৩ @ ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ

সাজেদা হক ::

sajeda haqueরেশমা উদ্ধার কাহিনী, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ। দেশের তো বটেই, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো উদ্ধার ইতিহাস। উদ্ধার কর্মীদের সে কি নিরলস প্রচেষ্টা, পরিশ্রম। দিন-রাত পাহারা দেয়া গণমাধ্যম কর্মীদের উৎকন্ঠা, সময়-শ্রম-ত্যাগ-তিতিক্ষা। শত শত স্বেচ্ছাসেবীর সে কি অক্লান্ত আত্মত্যাগ। সাভারের ভবন ধসে উদ্ধার তৎপরতার প্রত্যেকটা সকাল-সন্ধ্যা-রাত-ভোর শুরু আর শেষ হয়েছে প্রতিদিন কতজনকে উদ্ধার করা হলো সে খবর দিয়ে। ফেসবুকে থেকে শুরু করে সব গণমাধ্যমের তখন অন্যতম প্রধান সংবাদ ‘সাভার ভবন ধসে উদ্ধার তৎপরতা’। দেশের এমন কোনো গণমাধ্যম নেই যে, সেই উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন! উদ্ধারকর্মীদের, স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্দেশ্যকে, আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন!

প্রশ্নাতীত সেই উদ্ধার অভিযানে, ১৭ দিন পর উদ্ধার হওয়া রেশমার পোশাক নিয়ে যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন এক সাংবাদিক, তখনও দেশীয় সব গণমাধ্যম সেই সাংবাদিকের প্রতি অঙ্গুলি তুলেছেন নির্দ্বিধায়। মানবতার প্রশ্নে সব মানুষই তখন সেই অমানবিক প্রশ্নকারীকে বিধ্বস্ত করতে দ্বিধা করেন নাই। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশে যখন সব কিছু শান্ত, ঠিক তখনি রেশমা উদ্ধার নিয়ে বোম ফাটানোর মতো প্রতিবেদন প্রকাশ করলো বৃটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মিরর। সাংবাদিক সাইমন রাইট তার প্রতিবেদনে দাবি করলেন, রেশমা উদ্ধার অভিযান সাজানো।’

এমনিতেই এটি আমাদের ঘরোয়া ইস্যু, তার উপর আবার বিদেশী সাংবাদিক। যে সাংবাদিককে কিনা ‘সাজানো নাটকের’ অভিযোগে ২০১০ এর বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় জরিমানা করা হয়েছিলো। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় সংবাদ করতে যান সাইমন রাইট। সেখানে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পাভলোস জোসেফ নামে এক সমর্থককে ইংল্যান্ড ফুটবল দলের ড্রেসিং রুমে প্রবেশের ব্যবস্থা করে নাটক সাজিয়েছিলেন তিনি। সেই অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় পত্রিকাটি নিজেও সেসময় সাইমনের গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছিল। সাইমন বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন। অর্থাৎ, তিনি প্রমাণিত অপরাধী। মূলত তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বিশ্বের সামনে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরাই এই সাংবাদিকের মূল লক্ষ্য। বিশের অনেক দেশই তাকে ‘ব্রিটিশ এজেন্ট’ বলেই সন্দেহ করে।

যাই হোক, নির্ভরযোগ্য কোন সোর্সের উল্লেখ না থাকা স্বত্বেও প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে চটকদার বৃটিশ ট্যাবলয়েটটি। সেই পত্রিকার রেশ ধরেই আমার দেশসহ এদেশীয় দোসর পত্রিকাগুলো রা রা করে উঠলো। প্রকাশ করলো একই রকম সংবাদ। যেনো, দেশীয় কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্টারের চাইতে ভিনদেশী ওই সাংবাদিক দেবদূত। যা এদেশের কেউ জানতে পারলো না, তা কেবল জানলেন ডেইলি মিরর-এর সাইমন রাইট!!

যদি ঘটনার এক বিন্দুও সত্যি হয়, তাহলে এটাই বলা উচিত এ লজ্জা উদ্ধারকর্মীদের নয়, বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের। এ অপমান শুধু সেনাবাহিনীর নয়, রাষ্ট্রের। এ ধিক্কার- লাঞ্ছনা-গঞ্জনা শুধু রেশমা বা তার পরিবারের নয়, এদেশের আপামর সব মানুষের। যারা কি না, নিজের চেয়েও পর কে বিশ্বাস করে বেশি, তাদের সবার।

অথচ, এই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করা উচিত ছিলো, যৌথভাবে। দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার প্রয়োজন ছিলো বৃটিশ গণমাধ্যমকে। যেমনটা দেয়া হয়েছিলো দেশের সেই অমানবিক প্রশ্নকর্তা সাংবাদিককে। আর তা করতে পারলেই ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেতো বাংলাদেশের। লজ্জার হাত থেকে রেহাই পেতো এদেশের গণমাধ্যম, বিশ্বস্ততা-আস্থা আর আন্তরিকতা বাড়তো উদ্ধারকর্মীদের প্রতি।

তাই বলে ভূল ধরিয়ে দিতে পারবো না, তা বলছি না আমি। কিন্তু, আমাদের দেশকে অপমাণিত করে এমন স্পর্ধা দেখানো অন্য যেকোন দেশ, জাতি বা মানুষকে সবার একসঙ্গে জবাব দেয়া উচিত। অবশ্যই আমরা আমাদের গঠনমূলক সমালোচনা করবো। কিন্তু ভিনদেশীদের সাথে নিশ্চয় আঁতাত করবো না!! কারণ এদেশের আলো, বাতাস, মাটিতেই আমাদের জন্ম-বাস-বেড়ে ওঠা। তাই দল যার যার, দেশ সবার। দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোন কিছুর বিরুদ্ধেই আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, বৈশাখী টেলিভিশন

সর্বশেষ