সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড: জজ মিয়া নাটকের শেষ দৃশ্যে কি আছে?

রবিবার, ১০/০২/২০১৩ @ ১১:২৪ অপরাহ্ণ

মুরাদ মাহমুদ,

sagor-runi-murderসাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের এক বছর অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত হত্যাকারী প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার মোটিভ উদঘাটন করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন পর্যন্ত মামলার তেমন কোন উল্লেখ যোগ্য অগ্রগতি নেই।

গত বছরের ১০ই অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এক সংবাদ সংবাদ সম্মেলন ডাকে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন ডাকার খবরে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও দেশবাসী যতটা না আশান্বিত হয়েছিল তার থেকে বেশী নিরাশ হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাত জনকে হাজির করা হয়। এ সাত জনের মধ্যে পাঁচজন চিকিৎসক নারায়ণ হত্যা মামলার আসামী।

এখন প্রশ্ন হলো, ডা: নারায়ণ এবং সাগর-রুনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশার মানুষের হত্যার সাথে একই খুনিরা জড়িত হলো কিভাবে? হত্যাকাণ্ডের দিন সাগর-রুনির বাসায় কোনো ডাকাতি হয়নি। কোন মূল্যবান মালামাল খোয়া যায়নি। তার পরও কি ধরে নেব চুরি করতে গিয়েই সাংবাদিক দম্পতি কে হত্যা করেছে তারা?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, নারায়ণের গাড়িচালক কামরুলও সাগর-রুনি হত্যা মামলায় সংশ্লিষ্ট ছিলেন। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার আগে থেকে কামরুল চিকিৎসক নারায়ণের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন, সে অবস্থায় কিসের জন্য সে সাগর-রুনি কে হত্যা করতে যাবে? হত্যাকাণ্ডের পর পর পুলিশ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেছিলেন যে খুন করেছে অপেশাদার,অনভিজ্ঞ মানুষ। তাই যদি হবে তাহলে এখন কিসের ভিত্তিতে এই সব পেশাদার খুনিদের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী?

সাগর-রুনি দম্পতির একমাত্র সন্তান এবং খুনের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মাহির সরোয়ার মেঘ বলেছে, সে তার বাবা-মাকে খুন করতে দেখেছে। খুনিদের দেখলে সে চিনবে। খুনিদের মধ্যে একজনকে সে বনভোজনে দেখেছিল। তবে কে সেই ব্যক্তি যে সাগর-রুনিদের সাথে বনভোজনে গিয়েছিল? বাসার দারোয়ান হুমায়ুন কে ধরে জিজ্ঞাসা করে ছেরে দিলেও হুমায়ুনকে ধরার জন্য ১০ লাখ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তানভীর নামে এক পারিবারিক বন্ধু এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবী করা হলেও সাগর-রুনির পরিবার জানিয়েছে সাগর-রুনির তানভীর নামে কোন বন্ধুর নাম তারা কখনও শোনেননি। চিকিৎসক নেতা নিতাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত পেশাদার ডাকাত দের সাথে তানভীরের সম্পর্ক কি তা সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি। এ রকম অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি বাকপটু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গোলমেলে বক্তব্য দিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণের মুখে আকস্মিক প্রস্থান করেছেন তিনি। তদন্ত চলছে অজুহাতে তিনি অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন।

গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করা হলে তারা হাউমাউ করে কেঁদে বলে, মাননীয় আদালত, আমরা সাগর-রুনিকে চিনি না। আমরা কেউই ওই সাংবাদিকদের খুন করি নাই।

অপরাধীরা নিজেকে বাঁচাতে অনেক পথ বের করার চেষ্টা করতে পারে এটা যেমন সত্যি তেমনি এটাও সত্যি যে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এনামুল হক ওরফে আমিনুল ওরফে কলিম উদ্দিন ওরফে হুমায়ুনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এই সাক্ষীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হয়তো বা ঘটনা মোড় নিতে পারে আবার অন্য কোন দিকে।

রাজনীতির কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে। যে ভাষা আমাদের দেশের রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় পৈশাচিক গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার রাজনীতিতে নতুন একটি শব্দ আমদানি করে। রাজনৈতিক ভাষা পায় নতুন একটি শব্দ। শব্দটি হলো “জজ মিয়া।” কোন কুকীর্তি ধামাচাপা দিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টার নাম হয় ‘জজ মিয়া’।

২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় পৈশাচিক গ্রেনেড হামলার পর আসল ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সরকার জজ মিয়া নামক একজনকে দায়ী করে সংবাদমাধ্যমে হাজির করে। ছিঁচকে অপরাধী জজ মিয়া আর্জেস বোমা দূরের কথা, শেখ হাসিনার জনসভায় নুরি পাথরের ঢিল মারার সামর্থ্যও যে নেই তা এখন সকলের কাছে পরিষ্কার।

বিএনপি জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে ছিল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পৈশাচিক হামলাকারীদের আড়াল করতে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগ জজ মিয়া নাটক মঞ্চস্থ করছে দেশের নির্ভীক দুজন সাংবাদিক হত্যার সাথে জড়িতদের আড়াল করতে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকার যে জজ মিয়া নাটকের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তা দিন দিন পরিস্কার হচ্ছে।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এই মামলার তদারকি করছেন বলেও শোনা গেছে। তাই যদি সত্যি হয় তবে প্রধানমন্ত্রী থেকে শক্তিশালী কোন অদৃশ্য হাত কি কলকাঠি নাড়ছে মূল হত্যাকারীদের রক্ষা করতে?
লেখক: সাংবাদিক।