বেসরকারি টিভি চ্যানেলের চ্যালেঞ্জ

মঙ্গলবার, ০২/০৭/২০১৩ @ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ::

jahangirনব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে আমাদের মিডিয়া জগতের একটা বড় অর্জন হলো বেসরকারি খাতে কেব্ল টেলিভিশন বা ‘স্যাটেলাইট টিভি’। সরকারের গঠনমূলক ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাপ্রসূত সিদ্ধান্ত যে দেশে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, এটা তার প্রমাণ। সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত যেমন দেশে বা সমাজে ইতিবাচক ফল দেয়, তেমনি সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য দেশের মানুষকে বছরের পর বছর মাশুল দিতে হয়। যেমন: রাষ্ট্র পরিচালিত বিটিভি ক্ষমতাসীন দলের সাংস্কৃতিক ক্যাডারদের কাছে কার্যত লিজ দেওয়ার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী টেরিস্ট্রিয়াল টিভি স্টেশন কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ সরকার যদি বিটিভির ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিত, তাহলে এটি বিস্ময়কর সব কাজ করতে পারত। বিটিভির মতো অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধা আর কোনো টিভি চ্যানেলের নেই।
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশনের কর্মীরা ‘ব্রডকাস্টার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। ‘সুরক্ষিত করা হোক বেসরকারি টেলিভিশন খাত’ শিরোনামে তাঁদের প্রচারপত্রে সম্প্রতি বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বেসরকারি টেলিভিশন খাতের প্রধান হুমকি হচ্ছে ভারতীয় স্যাটেলাইট টেলিভিশনের আগ্রাসন।’ তাঁদের মতে, ‘দিনরাত ভারতীয় টিভির অনুষ্ঠান দেখে আমাদের সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই দেশে ভারতীয় চ্যানেল প্রদর্শন সীমিত হওয়া উচিত।’ তাঁরা আরও বলেছেন, ‘আমাদের বেসরকারি টেলিভিশন খাত বিশ্লেষণ করলে তা বহুলাংশেই রুগ্ণ শিল্প হিসেবে চিহ্নিত হবে। রুগ্ণ শিল্পকে রক্ষা করার জন্য দেশের অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষা, সংরক্ষণমূলক নীতিমালা গৃহীত হয়। বেসরকারি টেলিভিশনের জন্য সেসব নীতি কেন গৃহীত হবে না?’
‘ব্রডকাস্টার নেটওয়ার্ক’ ভারতীয় চ্যানেল বাংলাদেশে প্রদর্শন না করে কেব্ল অপারেটরদের আরও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যের পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে। বহু দর্শক এই বক্তব্যের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। আমরা এই বিতর্ককে স্বাগত জানাই। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, মিডিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, মিডিয়া-নীতি সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তি, মিডিয়া গবেষক, শিক্ষক, ছাত্র ও সার্বিকভাবে আগ্রহী ও সোচ্চার মিডিয়া ভোক্তারা এই ইস্যুতে আলোচনার আয়োজন করতে পারেন। আলোচনার মাধ্যমে মিডিয়া কর্মী ও নাগরিক সমাজ সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আমার মতামত হলো, কোনো কিছু বন্ধ করা বা নিষিদ্ধ করা আমি সমর্থন করি না, যদি না তার দ্বারা সমাজের ভয়ানক ক্ষতি সাধিত হয়। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম পৃথিবীর কোথাও সীমানা মানেনি। রাজনৈতিক কারণে বা ধর্মীয় কারণে একটি বই বা একটি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু ঢালাওভাবে কখনো কোনো দেশে কিছু নিষিদ্ধ হয় না। অনেক উন্নয়নশীল দেশ নিজের দেশের শিল্পের স্বার্থে সংরক্ষণমূলক নীতি নিয়ে থাকে। বাংলাদেশেরও সে রকম কিছু নীতি রয়েছে। তবে, কোনো দেশ এ রকম নীতি বেশি দিন বলবৎ রাখে না।
একসময় কথা উঠেছিল, ভারতীয় বই বাজারে থাকলে বাংলাদেশের বই বিক্রি হবে না। বাস্তবে কিন্তু তা হয়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস বাজারে থাকা সত্ত্বেও সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন বা আনিসুল হকের বই পাঠকেরা আগ্রহ নিয়ে কিনেছেন ও পড়েছেন। কলকাতার জনপ্রিয় লেখকেরা বই বিক্রিতে কোনো বাধা হননি। কারণ বাংলাদেশের বইগুলো ভালো বলেই বিক্রি হয়। কাজেই ভালো হওয়াটাই আসল কথা।
বাংলাদেশের সিনেমাকে প্রটেকশন দিতে গিয়ে সিনেমার কী দুরবস্থা হয়েছে, তা দর্শক ভালো জানেন। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ছবি, বোম্বের হিন্দি ছবি, কলকাতার সূচিত্রা-উত্তমের বাংলা হিট ছবির পাশাপাশি ঢাকার বাংলা সিনেমা প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। কোনো সমস্যা হয়নি। এই ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না।
এখন হয়তো আমাদের টিভি অনুষ্ঠান ভারতীয় টিভির তুলনায় নিষ্প্রভ মনে হতে পারে। কিন্তু অব্যাহত চর্চা ও অনুশীলনের ফলে আমাদের টিভি অনুষ্ঠান একদিন ভারতেও আদৃত হবে; যদি আমরা প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন করি, যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য পদে স্থান দিই, অনুষ্ঠান নিয়ে গবেষণা করি, সৃজনশীল ও প্রতিভাবান ব্যক্তিকে টিভি অনুষ্ঠানের জন্য খুঁজে বের করি, তাঁদের যোগ্য সমাদর করি।
আমাদের টিভি চ্যানেলে কী কী দুর্বলতা রয়েছে, কী কী অব্যবস্থা রয়েছে, তা আগে খুঁজে বের করা দরকার। যাঁরা টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁরা সবাই টিভি ব্যবসা পরিচালনার জন্য যোগ্য ব্যক্তি কি না, তা-ও দেখা দরকার। রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করে যাঁরা টিভির লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান মানসম্পন্ন হবে কীভাবে? তাঁরা তো এই জগতের লোকই নন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানের সংখ্যা কম। নকল অনুষ্ঠানেরই ছড়াছড়ি। মালিকপক্ষের সঙ্গে যাঁদের হূদ্যতা আছে, টিভি চ্যানেলে তাঁদের গুরুত্বই বেশি দেখা যায়। প্রতিটি টিভি চ্যানেলে একটা কোটারি শিল্পীগোষ্ঠী রয়েছে। পর্দায় সারাক্ষণ তাঁদেরই দেখা যায়। মনে হয় যে দেশে আর শিল্পী নেই। এ রকম নানা দুর্বলতায় কণ্টকিত আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি টিভি অনুষ্ঠান দর্শকের মন জয় করেছে। কিন্তু কয়েকটি ভালো অনুষ্ঠান দিয়ে তো ভারতের ৩০-৪০টি ঝলমলে টিভি চ্যানেলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যাবে না।
বরং একটা কাজ করা যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ যদি আমাদের টিভি চ্যানেল দেখানোর শর্ত হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করতে পারে, আমরাও ভারতীয় চ্যানেল থেকে সে রকম টাকা দাবি করতে পারি। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল দেখানোর জন্য আমাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আমাদের কিছু অনুষ্ঠান তাদের আকর্ষণ করতে পারে। এ ব্যাপারে তথ্য, বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তা দুর্ভাগ্যজনক। আগে আমাদের টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানোর ব্যাপারে সফল উদ্যোগ নিতে হবে। তারপর ‘বাংলাদেশের মূল্যবোধবিরোধী বা ক্ষতিকর’ ভারতীয় বা অন্য দেশের টিভি চ্যানেল বন্ধ করার কথা ভাবা যাবে।
আমাদের প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানের মানোন্নয়নের জন্য অনেক কিছু করার আছে। সবার আগে দরকার একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন। টিভি চ্যানেলের মালিকেরাই যৌথভাবে এই প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করতে পারেন। তরুণেরা নিজের পয়সায় বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ নিয়ে, পরীক্ষা দিয়ে, পাস করে টিভি অনুষ্ঠান করার চাকরিতে ঢুকবেন। এই পদ্ধতি ছাড়া টিভি মিডিয়ায় যোগ্য ও দক্ষ লোক পাওয়ার উপায় নেই। মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান আকাশ থেকে পাওয়া যায় না; এটা চ্যানেলের দক্ষ প্রযোজকেরাই তৈরি করেন।
অনুষ্ঠানের জন্য গবেষণা ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া সংগ্রহে কোনো আগ্রহ এখানে দেখা যায় না। নিজেদের অনুষ্ঠানের কাল্পনিক সাফল্যে নিজেরাই বুঁদ হয়ে থাকেন। দর্শকের মতামত শোনার কোনো গরজ দেখা যায় না। বিবিসির (বাংলা) ‘প্রীতিভাজনেষু’ অনুষ্ঠানের মতো একটি নিয়মিত (পাক্ষিক) ফিডব্যাক অনুষ্ঠান কি কোনো টিভি চ্যানেল চালু করতে পারবে? দর্শকের মতামতের প্রতি কি তাদের শ্রদ্ধা আছে?
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে কয়েকটি ভারতীয় টিভি চ্যানেলের নেতিবাচক প্রভাব সমাজে পড়ছে। এ ব্যাপারে কী করণীয়, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। সেই আলোচনাকে আমরা উৎসাহিত করতে চাই। তবে আমাদের টিভি অনুষ্ঠানের মানোন্নয়নের জন্যও অনেক কিছু করা দরকার। আমরা কি তা করছি?

লেখক: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।
সৌজন্যে- প্রথম আলো।