সব সংবাদমাধ্যম গণমাধ্যম নয়

রবিবার, ১০/০২/২০১৩ @ ১১:০৭ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

22092012090229pmIstiak_Rezaযোগাযোগের কাল্টিভেশন তত্ব বলে – “The media tells us not what to think but what to think about”.

সত্তুরের দশকে গণমাধ্যমে এজেন্ডা সেটিং-এর ধারা আসলে এমনটাই বলা শুরু হয়। এজেন্ডা সেটিং-এর কথা যা বলা হলো, তার অর্থ হলো, মানুষের কাছে কোন একটা বিষয় এমনভাবে নিয়ে আসা যেন তারা মনে করে জাতীয় উন্নয়নের জন্য এই বিষয়টি খুব দরকার, উন্নয়ন নীতিমালা বা আইন প্রণয়নে এই বিষয়টি ভাবতে হবে।

জাতীয় উন্নয়নে কিংবা নীতি নির্ধারণে গণমাধ্যমের ভূমিকা নির্ভর করে তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে শেখানো, উদ্বুদ্ধ করা ও সচেতন করায় তার দক্ষতার উপর।

মিডিয়া সমাজ ও জাতির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরীতে ভূমিকা রাখে, যদি সে সমাজে বা রাষ্ট্রে তার জানার অধিকার নিশ্চিত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার হলো আরেকটি বিষয় যা মিডিয়ার কাছে প্রত্যাশিত। মিডিয়া মানে কোন ঘটনা বা বিষয় তুলে ধরবে, প্রকাশ বা প্রচার করবে, তা নয়, বরং সে ঘটমান বিষয়ের বিশ্লেষণ দেবে যেন সমষ্টির কল্যাণে নীতি প্রণীত হয়। যেমনটা বলেছেন. উন্নয়ন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Stanley Machebu. তাঁর মতে the press “are subordinate to a far higher goal: the goal of ensuring that public and private conduct is directed towards the greatest possible measure of justice, in society”.
একটি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় সমাজে, সরকার ও গণমাধ্যম, সমাজের নেতৃত্ব ও তার অনুসারী, অভিজাত ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ, সকলের মাঝে এমন একটা তথ্য প্রবাহ তৈরী হবে, যেন সকলেই সবসময় আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রাখে। কিন্তু সাংবাদিকরা যেন কখনোই পেশাদারিত্ব ও তাদের জন্য প্রযোজ্য নীতি-নৈতিকতার অঙ্গীকার থেকে সরে না আসে।

এতগুলো কথা এ কারণে বললাম শুথু মাত্র গণমাধ্যমের ভূমিকা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। যখন সমাজ বিপদে পড়ে, সমাজের প্রগতির চাকা থমকে দাঁড়ায়, তখন গণমাধ্যমকে এজেন্ডা সেট করতে হয়। সেই এজেন্ডা গণমানুষের আশা আকাংখা।

দেশে যুদ্ধাপধীদের বিচারের দাবি যখন উঠেছে তরুণ প্রজন্ম থেকে, তখন থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম (দু’ একটি ব্যতিক্রম ছাড়া) এই ইস্যুতে মানুষের সাথে থেকেছে। শুরু থেকে গুরুত্ব দিয়ে ট্রাইব্যুনালের খবর প্রচার করেছে। আর এই বিচারিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যখন রাজপথ রক্তাক্ত করছিলো একটি মহল তখনো গণাধ্যম বসে থাকেনি। কিন্তু এজেন্ডা সেটিং বলতে যা বোঝায়, তা খুব কম প্রতিষ্ঠানই করতে পেরেছে।

সেই কাজটি অনেকটা করেছে নতুন যুগের প্রজন্মের গণমাধ্যম অনলাইন ও ব্লগ। এখানকার একটিভিস্টরা শুরু থেকে বিষয়টি নিয়ে যেভাবে লেগেছিলো, তারই ফলাফল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ, যা আজ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। টেলিভিশনগুলোর মধ্যে প্রথম থেকেই একাত্তর টেলিভিশন, এই তারুণ্যের সাথে ছিলো। পরে অবশ্য কেউ আর বাদ থাকেনি। কিন্তু সবচেয়ে যা ভাল লেগেছে, ধারার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার। সরকারি গণমাধ্যম সবসময়, গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু এবার তা আর থাকতে পারেনি। গত ৮ ফেব্রুয়ারী, শাহবাগের মহাসমাবেশ সরাসরি সম্প্রচার করে নতুন নজির গড়েছে বিটিভি।

এই সমাবেশ একদিকে যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বড় শিক্ষা যে, প্রচলিত ধারার রাজনীতি তারুণ্যের পছন্দ নয়, তেমনি গণমাধ্যমের জন্যও বার্তা যে, মানুষ থেকে, গণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা যায় না।

সমাবেশ চলার সময়, একটি বেসরকারি চ্যানেলের বার্তা প্রধান, মঞ্চ দখলের চেষ্টা করেছিলেন। তারুণ্য তার সেই প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, প্রত্যেকের আমলনামা জানে এই তরুণ প্রজন্ম। তার নিকট অতীতে কার্যকলাপ তাকে এই মঞ্চে জায়গা দেয়নি।

যেসব টকার প্রতিদিন টেলিভিশনের টক-শোতে এসে মুখে খই ফোটান নানা বিষয়ে, এই প্রজন্ম তাদেরও আমলে নেয়নি। এই সমাবেশকে ধরে নিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্য করার চেষ্টা করেছেন, দু-একজন টকার, তবে তারা বেশি একটা পাত্তা পাননি। কারণ তরুণ প্রজন্ম জানে, এরা পর্দায় বলে একটা, বাস্তব জীবনে করে আরেকটা। বরং তারুণ্য জয়মালা দিয়েছে ডক্টর জাফর ইকবালকে, যিনি টকার নন, যিনি দেশ নিয়ে ভাবেন, একইভাবে, অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকেন নিজের বিশ্বাসে ও কাজে। তাঁর বক্তৃতায় যত তালি পড়েছে, তা আর কারো বেলায় পড়েনি।

গণমাধ্যম সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি ন্যায় বিচার করতে না পারলে, মানুষও তাকে ক্ষমা করে না। এই বাস্তবতায় বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের নাম উঠে এসেছে এই সমাবেশে। আহবান জানানো হয়েছে, যেন এসব বর্জন করা হয়। মানুষ করবে কি করবে না, তা মানুষেরই সিদ্ধান্ত। কিন্তু এসব সংবাদ মাধ্যম চিহ্নিত হয়েছে।

সমাজে শান্তি ও প্রগতির স্বার্থে কাজ করতে হয় মিডিয়াকে। তাই কোন পত্রিকা, টিভি, রেডিও, অনলাইন যাই বলি না কেন, যদি সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, বৈষম্যকে উস্কে দেয়, যদি ব্যাপক জনমানুষের বিরুদ্ধে থাকে, বা সামরিক শাসন, একদলীয় শাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে সংবাদ বা মতামত প্রচার করলেও তা গণমাধ্যম নয়।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
বার্তা পরিচালক, একাত্তর টেলিভিশন