চলার পথে টুকরো কথা…

রবিবার, জুন ৩০, ২০১৩

সুলতানা রহমান ::

sultana rahman-2আষাঢ় মাস। তবু চৈত্রের মতো তপ্ত গরম। বরিশাল থেকে ফিরছি ঢাকায়। পদ্মার পাড়ে কেওরাকান্দি ঘাটে ফেরির অপেক্ষায়। ঘন্টা খানেক পরে ফেরি এলো, লোড-আনলোড করতে আরও আধা ঘন্টা। এরপর পদ্মা পারি দিতে লাগবে আরও প্রায় দুই ঘন্টা। মোট চার ঘন্টার মামলা! অথচ ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় বেশ কয়েক বছর আগে কেনা নতুন ফেরি বীর শ্রেষ্ট জাহাঙ্গীর আমাদেরকে মাওয়া থেকে কেওরাকান্দি পৌছে দিয়েছিলো মাত্র দেড় ঘন্টায়। এখন পেয়েছি পুরানা টানা ফেরি। ৭৫ সালে জাপান থেকে কেনা ফেরিটির দু’টি অংশ, একটি ইঞ্জিন জাহাজ, অন্যটি ডাম্প জাহাজ। স্টিলের তার দিয়ে বাধা থাকে দুটি অংশ, একটি আরেকটিকে টেনে নিয়ে যায়, তাই এর স্থানীয় নাম টানা ফেরি। চট করে মনে হলো-কোনও দিন ‘পদ্মা সেতু’ হলে এই টানা ফেরির নাম ‘আবুল ফেরি’ হলে মন্দ হয়না!

হুইসেল বেজে উঠলো, টেনে টেনে ওঠানো হচ্ছে ফেরির র‌্যাম্প। চারদিকে একটা হঠাৎ একটা দৌঁড়ঝাপ শুরু হলো। কেউ কেউ তখনো আয়েশ করে ডাব খাচ্ছে, একজন জুতা পালিশে ব্যস্ত। একজন ঘাটে দাঁড়িয়ে ধীরে সুস্থে ঝালমুড়ি খাচ্ছিল, পরিমরি দৌড়ে উঠলো ফেরিতে। র‌্যাম্প লেগে যাওয়ার পর এলো একজন মোটর সাইকেল আরোহী, কয়েকজন মিলে মোটর সাইকেলটি উচু করে তুলে ওঠালো ফেরিতে, আর আরোহী কোন রকম লাফ দিয়ে উঠলো, তার হেলমেট ওপারে আরেক জনের হাতে। সিনেমায় নায়ক নায়িকার বিচ্ছেদের সময় যেরকম দুই হাত একটু একটু করে দূরে সরতে থাকে, সেরকম দূরে সরতে সরতে কোনও ভাবে হেলমেট পৌছলো মালিকের হাতে।

ফেরি চলছে বটে, কিন্তু তার কচ্ছপ গতি অনুভব করা কঠিন। পদ্মার হু হু বাতাসও যেনো গরমে কাবু! আমার আবার পায়ের নিচে বরই’র বিচি, একজায়গায় বেশিক্ষন খামোখা বসে থাকতে পারিনা। দুই ঘন্টা গাড়িতে বসে বসে ঘামতে হবে-ভাবতেই পায়ের নিচের বরই’র বিচি’র খোচা খেলাম। একটু সাহস করে ডাম্প জাহাজ থেকে উঠে গেলাম ইঞ্জিন জাহাজে-সরু সিড়ি বেয়ে সোজা তিন তলায়, মাষ্টারের রুমে। সেখানে দুই জন বসে আছেন। একজন দেখতে টাইটানিকের ক্যাপ্টেনের মতো চাপ দাড়িওালা। তাকেই উদ্দেশ্য করে বললাম, কেমন আছেন?

আল্লাহ রাখছে ভালো।
আপনি-ই তো মাস্টার সাহেব?

জ্বি। উনি সুকানি। আপনি কোথায় যাবেন?

ঢাকায় যাবো। বরিশাল গেছিলাম।

ও। বরিশাল কোথায়?

সিটি কর্পোরেশন ইলেকশনে।

আপনি তাইলে সাংবাদিক। কোন চ্যানেলে?

তার প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ভাবছি, একটা সময় ছিলো, গলায় স্টিল ক্যামেরা ঝোলানো না থাকলে সাধারন মানুষ ভাবতো ‘কেমন সাংবাদিক, ক্যামেরা নাই’। আর এখন সাংবাদিক শুনলেই প্রথম ধারনাতেই মনে করে টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক। আর মেয়েরা সাংবাদিক-এতো কল্পনায়ও আনতে পারতোনা! বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথম দিকের নারী রিপোর্টার রাশেদা আমিন ৭৮ সালে সরকারী বার্তা সংস্থা বিএসএস থেকে একবার ঢাকার বাইরে গেছিলেন এসাইনমেন্টে। সম্ভবত ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া। রিপোর্ট করতে পেরেছিলেন কিনা জানিনা তবে সেখানকার কেউ আগে কো্নো নারী সাংবাদিক দেখেনি। তাই তাৎক্ষনিক ভাবে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিলো।
ভাবনায় বাধ সাধলো মাষ্টার সাহেবের প্রশ্ন। আপা, নির্বাচন কেমন হলো?

ভালো তো। বেশ ভালো।

প্রশাসন কি নিরপেক্ষ ছিলো?

আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আপনার কি মনে হয়?

আমরা তো চব্বিশ ঘন্টাই নদীতে থাকি, কেমনে বলবো?

পেপার-পত্রিকা পড়েননা? টেলিভিশন দেখেননা?

টেলিভিশন তো বিটিভি ছাড়া কিছু দেখতে পাইনা। আর পত্রিকা কোনটা যে সত্য বলে কোনটা মিথ্যা বলে বুঝিনা। এই জন্য মাঝামাঝি একটা রাখি-যুগান্তর। এর সম্পাদক সালমা খান। উনি নাকি জাতীয় পার্টির। জাতীয় পার্টি আবার আওয়ামীলীগের সঙ্গেও আছে, বিএনপি’র সঙ্গেও আছে। আপা একটা সত্যি খবর বলবেন?
জানলে নিশ্চয়ই বলবো।

মতিঝিলে হেফাজতের কত মানুষ মরছে?

আপনি কি শুনেছেন?

আমরা তো একেকজনের কাছে একেক রকম কথা শুনি। কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা কিছুই বুঝতে পারিনা।

যুগান্তর তো বিশ্বাস করেন, তারা কি লিখেছে?

এখন আপা, বিষয়টা হইছে কি, দেশে একটা কিছু হইলে সরকার এক রকম বলে বিরোধী দল আরেক রকম বলে। কেউ মরলে একদল বলে আমাদের লোক, আরেক দল বলে আমাদের লোক। আসলে যে কি-আমরা আম-জনতা তো কিছুই বুঝতে পারিনা।

আপনারা না হয় নদীতেই থাকেন। জানতে পারেননা। কিন্তু আপনাদের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা হয়না? তারা কি বলে?
তারাওতো গ্রামে থাকে, বিটিভি ছাড়া কোনও চ্যানেল দেখতে পায়না। পত্রিকা পড়তে পারেনা। মানুষ যা বলাবলি করে তাই শুনে।

টানা ফেরি মাওয়া ঘাটে এলো, সেখানে তখন আরেকটি ফেরি কিছুক্ষন আগেই পৌছেছে। সেটি আনলোড হবে, আপলোড হবে, তারপরে ছেড়ে যাবে আর আমাদের ফেরি আনলোড হওয়ার সুযোগ পাবে। এক ঘন্টার মামলা! তিন তলার সরু সিড়ি বেয়ে নামছি আর ভাবছি-দেশটা আসলে টানা ফেরিটির মতোই এনালগ চক্করে। এগিয়েছে বটে, কিন্তু ছাড়তে পারেনি পুরনো জঞ্জাল।

লেখক : সাংবাদিক।