ভারতীয় সাংবাদিকের কান্ড!

বুধবার, ২৬/০৬/২০১৩ @ ৫:৩১ অপরাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

Indian_journalist(২৬ জুন ২০১৩)- ক্যামেরাম্যান ক্যামেরার ‘হোয়াইট ব্যালান্স’ ঠিক করে রিপোর্টারের দিকে তা তাক করে বললেন, ‘বোল’ আর অমনি ‘পিটিসি’ দিতে শুরু করলেন তিনি। ভারতের এক টিভি সাংবাদিক বন্যায় প্লাবিত মানুষের ঘাড়ে চরে পিটিসি দেয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। টেলিগ্রাফ

এর আগে সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর একের পর এক লাশ আর আহতদের বের করে আনার সময় ইলেকট্রনিক সাংবাদিকদের কারো কারো কর্মকান্ড মানবিক পরিচয়কে লজ্জায় ফেলে দেয়। ‘বুম’ ধরে কংক্রিটের সøাবের নিচে আটকা পড়া মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতড়ানো আহত গার্মেন্ট কর্মীকে তার অনুভূতি কি তা জিজ্ঞেস করতে দেখা যায় টিভি সাংবাদিকদের। সারিবদ্ধ লাশের খবর নিয়ে নানা রকম বিতর্কিত প্রতিযোগিতা ছাড়াও কবরে নেমে লাইভ সম্প্রচার ইত্যাদি ধরনের সাংবাদিকতাকেও এবার হার মানিয়েছে ভারতীয় এক সাংবাদিক।

ভারতের ওই টিভি সাংবাদিক রীতিমত বন্যার্ত মানুষের কাঁধে চড়ে লাইভ রিপোটিং করেছেন। উত্তরাখন্ডে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষ যখন বিপর্যস্ত, তখন সাধুরা মৃত মানুষের গয়না খুলে নেয়াসহ মন্দিরের টাকা লুটপাট করে বস্তাভর্তি সেসব মালামাল নিয়ে হেলিকপ্টারে উঠতে যেয়ে সেনা সদস্যদের হাতে ধরা খাচ্ছেন। ক্ষুধার্ত মানুষের পাশেই একটি পরোটা বিক্রি হচ্ছে আড়াইশ’ আর এক গ্লাস জলের দাম উঠেছে চারশ’ রুপিতে। গণসৎকার করতে হেলিকপ্টারে করে সেনা সদস্যদের ঘি পাঠাতে হচ্ছে এবং এই যখন পরিস্থিতি, তখন সেখানকার একটি সংবাদ চিত্র মানবিক বোধের চরম অবক্ষয়ের আরেকটি চিত্র তুলে ধরলো। ভারতীয় এক সংবাদকর্মী এমনই এক ‘বিতর্কিত’ ঘটনার জন্ম দিলেন, যা বিশ্বের সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

দেরাদুন ভিত্তিক টিভি চ্যানেল ‘নিউজ এক্সপ্রেস’ এর সাংবাদিক নারায়ন পারগাইন। ওই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অসহায় মানুষগুলোর খবর জানাতে গিয়ে নিজেই খবরে পরিণত হয়েছেন। এক রোগা শীর্ণ মধ্যবয়স্ক মানুষের কাঁধে চড়ে ওই সাংবাদিক ঘুরেছেন বন্যা কবলিত এলাকা। বুক সমান পানি ঠেলে এই ‘হৃষ্টপুষ্ট’ সাংবাদিককে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ওই ব্যক্তি। আর তার কাঁধে চড়ে ক্যামেরায় মানুষের দুর্দশার কথা বর্ণনা করছেন ওই সাংবাদিক। ক্যামেরাম্যান নানা এঙ্গেলে সেই দৃশ্য ভিডিও করে যাচ্ছেন। একজন দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের কাঁধে চড়ে তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বর্ণনা করার মতো ‘হাস্যকর’ এবং ‘অমানবিক’ দৃশ্যটিই প্রচার করেছে ওই টিভি চ্যানেল।

এ খবরটি সম্প্রচার হওয়ার পরপরই শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। সামাজিক গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায়ই এ নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল সমালোচনা যা সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বেই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যম ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’ এ সংবাদটি শিরোনাম করে ‘ভারতীয় টিভি রিপোর্টার বন্যাকবলিত এলাকার রিপোর্ট করেছেন একজন মানুষের কাঁধে চড়ে’। এই টিভি রিপোর্টের ভিডিও চিত্রটিও প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে।

নিজের বিতর্ক এড়াতে সাংবাদিক নারায়ণ পারগাইন বলেছেন, আমি নিজ ইচ্ছায় এইভাবে খবরটি পরিবেশন করিনি। বন্যার পানিতে পা ভিজিয়ে খবর সংগ্রহ বা পরিবেশনেও আমার কোনো আপত্তি ছিলো না। কিন্তু ওই লোকটির জোরাজুরির কারণেই আমি তার কাঁধে চড়ে খবর পরিবেশন করেছি। অর্থাৎ যত দোষ নন্দ ঘোষ।

নারায়ণ বলেন, গ্রামের হতদরিদ্র ওই লোকটির বাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তার অনুরোধে তিনি তার বাড়ির ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় চিত্রটি টেলিভিশন খবরে প্রচার করেছেন। তারপরই ওই লোক তাকে কাঁধে করে বন্যার পানিতে ঘুরানোর প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, বিনিময়ে তিনি ওই লোকটিকে ৫০ রুপি দিয়েছেন।

দুর্গত মানুষের কাঁধে চড়ে দুর্গত এলাকার খবর পরিবেশন করাকে তিনি নিজে কিভাবে দেখছেন এই প্রশ্নের উত্তরে ‘টেলিগ্রাফ’ কে তিনি বলেন, উত্তরাখন্ডের বন্যার্ত পরিস্থিতিতে এইভাবে খবর পরিবেশন করাটা ঠিক হয়নি। এ নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করছে। কিন্তু আমি শুধু খবরই পরিবেশন করিনি, ওদের সহায়তাও করেছি।

তবে নারায়ণের দুর্গত লোকটির কাঁধে চড়ে রির্পোটিং করার দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিউজলন্ড্রি ডটকমে পোস্ট করার পর দর্শকরা ১১ হাজার ৬শ’ বার তা দেখেছে।

নারায়ণ এও বলেন, আসলে আমি ওই লোকটির ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটি সর্বপ্রথম পরিদর্শন করি আর তারপর একটি নদী পার হতে গেলে সে আমাকে কাঁধে নেয়ার প্রস্তাব দেয়। তিনি এজন্যে তার ক্যামেরাম্যানকে এধরনের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার জন্যে দোষারোপ করেন। এমনকি ক্যামেরার ফ্রেম সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় লোকটির কাঁধে চড়ে তার পুরো ছবিটি সম্প্রচার হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ ঘটনাটি তার পেশাগত জীবনের বিরুদ্ধে ‘স্যাবোটাজ’ বলেও উল্লেখ করেন নারায়ণ।

নারায়ণ বলেন, হ্যা আমি ভুল করেছি, কিন্তু ক্যামেরায় ভুল এ্যাঙ্গেল ও শট নিয়ে ক্যামেরাম্যান যা করেছে তা অগ্রহণযোগ্য। ‘ল্যান্ড অব গডস’ নামে পরিচিত উত্তরাখন্ডের ওই তীর্থস্থানে বিধ্বংসী বন্যায় বেশ কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে অগণিত মানুষ।