নীতিমালা: সম্পাদক পরিষদ উদ্যোগ নিন

শনিবার, ২২/০৬/২০১৩ @ ৩:৫২ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ::

jahangirদৈনিক আমার দেশ ও এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নৈতিকতা নিয়ে গণমাধ্যমে নানা আলোচনা হচ্ছে। আমাদের সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা, দলীয় আনুগত্য, পেশাদারি, সম্পাদকের প্রাক-যোগ্যতা, গণমাধ্যমের রাজনৈতিক ভূমিকা ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় এসেছে। এই আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে একটি সর্বজনমান্য নীতিমালা তৈরি করতে চাই। ইউরোপ-আমেরিকায় প্রণীত সাংবাদিকতা নীতিমালার মূল শর্তগুলো রেখেই আমরা আমাদের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করব। এই নীতিমালা প্রণয়নে সরকারকে যুক্ত করার প্রয়োজন নেই।

গণমাধ্যমকে সরকার অনুদান বা ভর্তুকি দেয় না। এটা প্রায় শতভাগ বেসরকারি খাতের বিষয়। দেশের প্রচলিত আইন সামনে রেখে এই নীতিমালা তৈরি করা যায়। শুধু প্রয়োজন পরিকল্পিত আলোচনা, মতবিনিময় ও মতামত জরিপ। নবগঠিত ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর উদ্যোগে এই আলোচনা চক্রের আয়োজন করা যায়। পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশেও এ ধরনের আচরণবিধি রয়েছে, যা সাংবাদিকেরাই প্রণয়ন করেছেন। সেসব বিধিগুলোও আমরা পর্যালোচনা করতে পারি।

আর সমালোচনা বা বিতর্ক নয়, এবার আচরণবিধি প্রণয়নে আমরা যদি মনোযোগ দিই, তাহলে তা বড় কাজ হবে। ‘সম্পাদক পরিষদকে’ এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমরা আবেদন জানাই।

২.
প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার কথা প্রায়ই আলোচনা হয়। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি এ ব্যাপারে কখনো উদ্যোগ নেয় না। প্রেস কাউন্সিলকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সুপারিশ তথ্য মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে আজ অনেক বছর। কোনো তথ্যমন্ত্রী সেই কাগজ মনে হয় পড়েও দেখেননি। প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার জন্য রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সম্পাদকের ফোরাম কেউ সোচ্চার নয়। বর্তমানে যে প্রেস কাউন্সিল রয়েছে তা দিয়ে বড় কোনো কাজ সম্ভব নয়। দেশে সুষ্ঠু সাংবাদিকতা, সাংবাদিকদের নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটি শক্তিশালী প্রেস কাউন্সিল প্রয়োজন। সরকার আমার দেশ পত্রিকা নিয়ে যত সক্রিয় তার ২৫ ভাগ সক্রিয়তাও যদি প্রেস কাউন্সিলের ব্যাপারে দেখাত, তাহলে এ দেশের সাংবাদিকতার একটা বড় উপকার হতো।

সাংবাদিক মশিউল আলম তাঁর এক সাম্প্রতিক লেখায় (১২ জুন) লিখেছেন, ‘সম্প্রতি গঠিত ‘সম্পাদক পরিষদ’ এ অবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে। যুক্তরাজ্যের ‘এডিটরস কোড’-এর মতো একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করে প্রেস কাউন্সিলের সঙ্গে যৌথভাবে সংবাদমাধ্যমের আচরণ নিয়ন্ত্রণের একটা কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।’ আমরা তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করি।

৩.
১৫ জন সম্পাদক সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও দুটি টিভি চ্যানেল খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের এই বিবৃতি আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য হলো, আমার দেশ পত্রিকা ও মাহমুদুর রহমান দেশে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়েছেন। কাবা শরিফের জাল ছবি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি। এসব অভিযোগ খুবই গুরুতর। কোনো সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। পত্রিকা ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা হতেই পারে।

১৫ জন সম্পাদক তাঁদের বিবৃতিতে এসব অভিযোগকে লঘু করে দেখেননি। তাঁরা শুধু সম্পাদকের মুক্তি দাবি করেছেন এবং সাংবাদিকদের রুটি-রুজির স্বার্থে আমার দেশ প্রকাশনা ও দুটি টিভি চ্যানেল খুলে দেওয়ার আবেদন করেছেন। তাঁরা আরও বলেছেন, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করার পদ্ধতিটি ঠিক হয়নি। টিভি চ্যানেল দুটি বন্ধ করার পদ্ধতিটিও ঠিক হয়নি। অভিযোগ প্রমাণের আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়া, টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া—এগুলো খুব নিকৃষ্ট কৌশল। বিএনপির আমলেও আমরা এসব ঘৃণ্য কৌশল দেখেছি। দুই বড় দলই আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

‘দিগন্ত টিভি’ ও ‘ইসলামিক টিভি’ কেন গত ৬ মে ভোররাতে আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তার কোনো সুষ্ঠু ব্যাখ্যা সরকার এখনো দেয়নি। তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাদের কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। তাদের উত্তর সন্তোষজনক হলে টিভি চ্যানেল দুটি খুলে দেওয়া হবে। এখনো খুলে দেওয়া হয়নি।

সরকার বা সরকার-সমর্থক কোনো ব্যক্তি আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে প্রেস কাউন্সিলে একটি মামলা করতে পারত। সেই মামলায় আমার দেশ ও এর সম্পাদক দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে ক্ষমা চাইতে হতো। তখন সরকার চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও দিতে পারত শাস্তির জন্য। বিষয়টি যেহেতু সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে ঘিরে, সেহেতু তাদের নিজস্ব ‘কোর্টে’ প্রথম বিচার হওয়া উচিত ছিল। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, ‘প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালী নয়।’ খুব খাঁটি কথা। কিন্তু এ জন্য তো আমার দেশ পত্রিকা বা মাহমুদুর রহমান দায়ী নন। দায়ী তথ্যমন্ত্রী। বারবার বলা সত্ত্বেও তিনি ও তথ্য মন্ত্রণালয় প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী করছে না কেন? প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালী হলে এবং তাদের কিছু বিচারিক ক্ষমতা, শাস্তিদানের ক্ষমতা দিলে আজ পরিস্থিতি এত জটিল হতো না।

গত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে আমার দেশ-এর ভূমিকা নিয়ে অনেকে সমালোচনামুখর। ওই সময়ে যদি আমার দেশ সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাবিরোধী কোনো কিছু করে থাকে, তাহলে প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে পত্রিকার ও সম্পাদকের বিচার হতে পারে। বিচারের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী প্রমাণ করতে হবে। কোনো সভা-সমাবেশ থেকে কারও বিরুদ্ধে কোনো রায় দিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নয়।
আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদককে গ্রেপ্তার করার একটা কারণ সরকার দেখিয়েছে। কিন্তু পত্রিকা ছাপানোর প্রেস বা পুরো পত্রিকাটি কী দোষ করেছে? পত্রিকার অন্য সাংবাদিকেরাই বা কী দোষ করেছেন? তাঁদের কেন বেকার হতে হবে? পত্রিকার সাংবাদিকেরা তো ‘মাহমুদুর রহমানের’ নামে লেখা কলামগুলোও লেখেননি। তাঁদের কী দোষ? মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার না করেও সরকার মামলা পরিচালনা করতে পারত।

মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে তারপর তাঁকে জেলে দেওয়া যেত। তিনি তো দাগি আসামি নন। একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক।

আমার দেশ পত্রিকার প্রেসে তালা লাগিয়ে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করাও সরকারের একটা দমনমূলক পদক্ষেপ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাতও বলা যায়। পত্রিকার ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়া মানে পত্রিকাটির প্রকাশনাই বন্ধ করে দেওয়া। পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে বিকল্প প্রেসেও সরকার পত্রিকা ছাপাতে দিচ্ছে না। এর পরও তথ্যমন্ত্রী ও সরকার-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বলতে থাকবেন, ‘এ দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে।’
সাম্প্রদায়িক উসকানি ও অন্যান্য অভিযোগে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হলেও এটা স্পষ্ট যে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক শক্ত অবস্থান না নিলে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হতো না। সাম্প্রদায়িক উসকানি ও কাবা শরিফের জাল ছবি প্রকাশের ঘটনা একটা উপলক্ষ মাত্র। অবশ্য সত্যের খাতিরে স্বীকার করতে হবে, মাহমুদুর রহমান কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকের স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করেছেন। সাংবাদিকতার লেখালেখি ও রাজনৈতিক কর্মীর লেখালেখির মধ্যে একটা পার্থক্য রাখতে হয়। রাজনৈতিক কর্মী হতে চাইলে সম্পাদকের দায়িত্ব না নেওয়াই শ্রেয়।

কোনো কোনো সমালোচক মাহমুদুর রহমানকে ‘বাই চান্স সম্পাদক’ বলে কটূক্তি করে থাকেন। একজন বিচারপতি এই বিশেষণ প্রথম ব্যবহার করেছেন। মাহমুদুর রহমানকে ‘বাই চান্স সম্পাদক’ বলার কারণ দেখি না। সরকার সংবাদপত্র সম্পাদকের জন্য কোনো যোগ্যতার মাপকাঠি বা নীতিমালা নির্ধারণ করেনি। যদিও এ ব্যাপারে সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতাদের প্রস্তাব ছিল। আতাউর রহমান কমিশনের সুপারিশ ছিল। কোনো সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। যদি ‘সম্পাদকের’ যোগ্যতা বা অযোগ্যতার বিষয়গুলো পত্রিকার ডিক্লারেশনের নীতিমালায় লিখিত থাকত, তাহলে এই সমালোচনা যুক্তিযুক্ত হতো। তা ছাড়া, শুধু সম্পাদক পদ কেন, বাংলাদেশে অনেক পদ-পদবিই তো ‘বাই চান্সে’ পাওয়া। চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, এ রকম ‘বাই চান্স’ পদাধিকারী ব্যক্তি অনেককেই দেখবেন। কঠোর পরিশ্রম করে, নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভায়, পেশার বা সংগঠনের নিচের ধাপ থেকে ক্রমান্বয়ে সর্বোচ্চ ধাপে উত্তীর্ণ হওয়া লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে বেশি নেই। শুধু মাহমুদুর রহমানকে একা দোষী করছেন কেন?

৪.
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়। গণমাধ্যমকেও স্বাধীনতা ব্যবহার করতে হলে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয়। তার অর্থ এই নয় যে, সরকারের বা অন্যদের নানা নিন্দনীয় কাজের নিন্দা করা যাবে না। নিন্দাযোগ্য কাজের নিন্দা করাও দায়িত্বশীলতা। সাংবাদিকতা পেশা এমন একটি পেশা, যা সব মহলের কাছে প্রিয় থাকতে দেয় না। মাহমুদুর রহমান বিভিন্ন ইস্যুতে একটি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

আমরা তাঁর সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হতে পারি। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর পাশে অবশ্যই দাঁড়াব। ১৫ জন সম্পাদক যুক্ত বিবৃতির মাধ্যমে সেই সহমর্মিতাই প্রকাশ করেছেন। আমরা প্রত্যাশা করব, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। আইনে দোষী সার্বস্ত হলে তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। সম্পাদক আইনের ঊর্ধ্বে নন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সীমারেখা ও এর দায়িত্ববোধের প্রকৃতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া উচিত। আমাদের ধারণা, সংবাদপত্রসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিক সমাজ, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে চিন্তার ভিন্নতা রয়েছে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী, সেটাও জানা দরকার।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়ন ও মিডিয়াকর্মী।

সর্বশেষ