সাংবাদিকতা, নাকি সাংবাদিকতা নামে চুরি করা?

মঙ্গলবার, ১৮/০৬/২০১৩ @ ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ

হিমেল চাকমা :

newspaper_onlineবাংলাদেশে তথা সারা বিশ্বে অনলাইন জনপ্রিয় হয়ে উঠার খবর বের হয়েছে দীর্ঘদিন হল। এই কথা নাকি কোন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নাকি জাতীয় সংসদে বলেছে। জরিপ হয়েছে। এই জরিপও নাকি বলছে মন্ত্রীর কথা সত্য। এই নিয়ে অনলাইন সম্পাদকরা বেশ খুশি। আমি দেখেছি অনলাইনগুলোতে ঢালাওভাবে প্রতিবেদনও চাপা হয়েছে। কিন্তু আমি এদের মধ্যে লজ্জার শুন্যতা আছে বলে মনে করি। আমি সরাসরি বলব এরা অনলাইন ডটকম চোর সম্পাদক।

সব সম্পাদককে বলছি না। যারা চোর তাদের চোর সম্পাদক বলছি। দেশে হাতে গুনা দুয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন আছে। যারা সংবাদপত্রের নীতিমালা অনুসরণ করে। এসব সম্পাদকদের আমি স্যালুট করছি। আর যারা একটি কম্পিউটার ও একটি ইন্টারনেটের লাইন নিয়ে চুরি করতে ব্যস্ত তাদের চোর সম্পাদক বলছি।

বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলছি একটু পরে। সব মিলিয়ে এই ভুইফোর অনলাইনের উপদ্রপের কারণে আমি দেশের অনলাইন জগৎ অন্ধকার দেখি। আমি এতবড় সাংবাদিক নই। সাংবাদিক ও সম্পাদক হওয়ার যোগ্যতা আমার হয়নি। একটা প্রবাদ আছে “নিজের আন্ডাজ নাকি পাগলেও বুঝে’’ তবে আমার এই অনুভব অন্যরা করে কিনা জানি না।

সত্য যে সাংবাদিক হওয়ার চেষ্টা করি সম্পাদক হওয়ার জন্য চেষ্টা এখন করি না। কারণ আমি বুঝি আমার আন্ডাজ। আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশে সম্পাদকের ভিড়ে সাংবাদিক অভাব দেখা দিচ্ছে। কারণ সব সাংবাদিকরা এখন সম্পাদক হয়ে গেছে। কেউ এই টুয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদক। কেউবা ঐ টুয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদক। কত কি। আবার দেখি ইন্টারন্যাশনাল টুয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদকও আছেন অনেকে!

বিভিন্ন কর্মশালা, সভা সেমিনারে দেখি অনেকেই নিজের পরিচয়ে বলে, আমি এই টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক, আমি ঐ টুয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদক। হায়রে জগৎ। এরা পরিচয় দেয়, আমি লজ্জাবোধ করি। সম্পাদক হতে কি পরিমাণ শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে তা হয়তো আমার মত এসব সম্পাদকেরাও জানে না।

মনে হচ্ছে আগামীতে বাংলাদেশ অনলাইন পত্রিকার দেশ হবে। জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম, বাজারে, রাস্তা-ঘাট, ঘরে ভিতরে অনলাইন সম্পাদক সমিতি গড়ে উঠবে? দেশ ডিজিটাল হবে। গড়ে উঠুক সম্পাদক সমিতি। এতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু চোর সম্পাদক সমিতি হলে আমার আপত্তি আছে। কারণ একটি টেবিল, একটি কম্পিউটার ও একটি ইন্টারনেটের লাইন নিয়ে চুরি করতে ব্যস্ত থেকে সম্পাদক হওয়া যায় না। প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট অনেক কিছু।

লেখালেখি করার সুবাদে অনেক কর্মশালায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অপরিচিত জনের সাথে পরিচয় হয়। বেশ ভাল লাগে। কিন্তু এই ভাল লাগাটি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় না। হয় না এই কারণে, যখন তারা বলে “ভাই আমি এই টুয়েন্টিফোর ডটকমে সম্পাদনা করি। আপনার জেলার কোন নিউজ থাকলে আমারে সিসি দিয়েন। এই কথা বললে আমার মাথার তাপমাত্রা ১৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়। এখন দেখি এই সম্পাদকের সংখ্যা কমছে না বাড়ছে। এতে আমি সংখ্যাগুরু থেকে সংখ্যালঘুতে পরিনত হচ্ছি। চিন্তা করছি আমিও একটি …টুয়েন্টিফোর ডটকম বের করব। এতে আমিও ওদের মত সম্পাদক হব। সবাই যখন সিসি দিতে আমারে রিকুয়েস্ট করে। তখন আমিও করব!

আর অনেককে দেখি নাম শুনে পরিচিত বন্ধুর কাছ থেকে আমার মুঠোফোন নম্বরটি নিয়ে সিসি দেওয়ার রিকুয়েস্ট করে। এতে তাপমাত্রা তো আরো বেশী বেড়ে যায়। আমি কখনও ঐসব রিকুয়েস্ট রাখিনি। বরং যিনি আমাকে সিসির জন্য রিকুয়েস্ট করেছে তাকে আমি অন্যভাবে নিয়েছি। এমন পর্যায়ে এসে সম্প্রতি কয়েক মাস আগে আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন এক ব্যাক্তি তার সম্পাদনা করা একটি টুয়েন্টিফোর ডটকমের কথা বলল। নিউজ পাঠাতে বলল। মেইল ঠিকানা দিল । যেহেতু তিনি শ্রদ্ধাভাজন সেহেতু গুরুত্বপূর্ণ নিউজগুলো আমি ওদের মেইলে পাঠায়। এভাবে চলে। সত্যি বলতে আসলে সাইটটি বেশ জনপ্রিয়। আমার মনে হয় আপনারা সবাই দিনে যেকোন সময় একটু না একটু এই সাইটটি টাচ করেন। যেহেতু আমি নিয়মিত নিউজ দিই তাই এই কর্তৃপক্ষ বেচে নিয়েছে আমাকে।

বেশ ভালভাবে চলছে। বেতন-ভাতা তো দেয় না। তাছাড়া আমি কোনদিনই খুঁজিইনি। কারণ এমনিতে আমি লেখালিখি করি। তাছাড়া আমি জানি দেশের মিডিয়া হাউজের অবস্থা। দেশে হাতে গুনা দু একটি মিডিয়া ছাড়া বাকীরা বেতন ভাতা দেওয়ার তো দুরের কথা। উল্টো বলে বিজ্ঞাপন কই? এই কথা আমি একবার শুনেছি। ঐ পত্রিকায় দায়িত্বরত এক ভদ্রলোক আমাকে বলে “বিজ্ঞাপন না দেওয়ার কারণে আপনার তিন মাসের বেতন আটকে রাখা হয়েছে। এই মাসে আপনি যদি ২০ হাজার টাকার বিজ্ঞাপন দেন তাহলে আপনার বেতনটি চালু করা হবে। আমি তখন সম্মানী পেতাম ২৯৩০ টাকা। এই কথা শুনার পরই পত্রিকাটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই এবং পরবর্তীতে দিয়েছি। যার অফিস পুরানা পল্টনে। দেশের স্বনামধন্য একটি গ্রুফ এই পত্রিকার মালিক। যেখানে মালিকের পুত্র থেকে সম্পাদক হওয়ার নজির দেখিয়েছে।

যাক মুল কথায় আসি। এই সম্পাদক শ্রদ্ধাভাজন হওয়ার কারণে বেতন ভাতা নিয়ে কিছু বলিও না। চিন্তা চলে অনলাইন নিয়ে। আমার সামনে থেকে টুয়েন্টিফোর সম্পাদনা করা সম্পাদকের কাজের হাফভাব দেখে আমার সন্দেহ হল। সাংবাদিকতা এদের পেশা, হুট করে কপি করাটা এদের নেশা। নেই এদের কোন প্রতিনিধি। নেই অফিস। নেই জনবল। হুট করে কপি করে এরা লাগাই অমুক প্রতিনিধি। অমুক টুয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক। অমুক টুয়েন্টিফোর ডটকম ডেক্স। আমি প্রায়ই দেখি। কিন্তু আমরা তো জানি কার জোর কতটুকু? আমি যদি একাই ইন্টারন্যাশনাল টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক হই তাহলে ‌আমার কতটুকু সত্য হবে?

এইসব দেখে আমার শ্রদ্ধেয় সম্পাদকের সম্পাদনা করা ডটকমের কাজের হাফভাব কেমন যেন আমার সন্দেহ হয়। তা কয়েকদিন আগে প্রমাণিত হল। দিন কয়েক আগে দেখি পত্রিকাটিতে রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি নামে একটি নিউজ চাপা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ চুরি করা। কারণ আমি কোন নিউজই পাঠায়নি। আমার এক পরিচিত সম্পাদক ডাউনলোড করার পর কয়েক মিনিট বাদে আমার শ্রদ্ধেয় সম্পাদকের টুয়েন্টিফোর ডটকমে চলছে। হায়রে ডিজিটাল চোর। আর আমার সামনে সম্পাদক তো চোর। আর যদি চোরে চোরো মাসুতু ভাই নাকি পিসাতু ভাই হয় তাহলে দেশের অবস্থা কি হবে। নেই বিচার বিশ্লেষণ।

পরিশেষে বলব অনলাইন সংবাদপত্রগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা হোক। না হলে ১৬ কোটি মানুষের ২০ কোটি অনলাইন হবে। এতে কারটা সত্য, কারটা মিথ্যা এর মুল্যায়ন জটিল আকার ধারণ করবে। এখনো সময় আছে। না হলে চোর বেড়ে যাবে। চোর বেড়ে গেলে দেশে চোরের উপদ্রব বাড়বে। এতে দেশের বদনাম হবে। দেশের বদনাম হলে আমরাও বদনামের ভাগীদার হব। আমরা এই বদনামের ভাগীদার হলে নতুন প্রজন্ম হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]