লোকাল বাসের মরণ রেস এবং দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার ময়নাতদন্ত

শুক্রবার, জুন ১৪, ২০১৩

রাশেদ মেহেদী ::

Rased Mehdiলোকাল বাসের ‘মরণ রেস’ আমাদের সবারই খুব চেনা দৃশ্য। একই রুটের যে বাস আগে শেষ গন্তব্যে পৌঁছবে সেই ফিরতি ট্রিপের সিরিয়াল পাবে আগে। এ কারনে একই রুটের বাসের মধ্যে প্রায়ই ভয়াবহ ‘মরণ রেস’ দেখা যায় এবং অনেক সময়ই এই রেসের পরিণতি হয় মর্মান্তিক দূর্ঘটনা। আমাদের সংবাদ মাধ্যম বিশেষ করে টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে ‘ব্রেকিং নিউজকে’ কেন্দ্র করে লোকাল বাসের ট্রিপ ধরার মতই মরণ রেস চলছে। ‘এক সেকেন্ড আগে হলেও ব্রেকিংটা আমরাই দেব’ এই মানসিকতা সাংবাদিকতার সংসবেদনশীলতার উপরে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, কর্তব্যরত সাংবাদিককেও অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলছে। প্রায়ই যাচ্ছে ভুল ব্রেকিং। হয়ত সংশোধন করে নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ভুল ব্রেকিংটা যদি এক মিনিটও চলে তা মুহুর্তে লক্ষ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট।

আবার এক টিভি চ্যানেল কিংবা অনলাইন মাধ্যমে কোন ব্রেকিং গেলে ওই মরণ রেসের কারনেই যাচাই-বাছাই না করেই সেই ব্রেকিং অন্যান্য টিভি চ্যানেল, অনলাইন মাধ্যমেও দ্রুত চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২৬ এপ্রিল শুক্রবার সকালে শ্রমিক বিক্ষোভের চলাকালে একটি টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং দেওয়া হল ‘রাজধানী ও আশে পাশের এলাকায় তীব্র শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে, সংঘর্ষে গুলশানে পাঁচ শ্রমিক নিহত’। এই ব্রেকিং চলেছে তিন থেকে চার মিনিট। তার পরই ব্রেকিং পরিবর্তণ করে লেখা হল,‘গুলশানে বাস চাপায় বিক্ষোভরত পাঁচ শ্রমিক আহত, তিন জনের অবস্থা আশংকাজনক’। খুব সহজেই বোঝা যায়, দু’টি সংবাদের তথ্যের মধ্যে যেমন বিস্তর তফাৎ আছে, এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও দু’রকমের হবে এটাই স্বাভাবিক। যে কোন নতুন তথ্য পাওয়ার পর মাঠের যে রিপোর্টার কাজ পাঠিয়েছেন কিংবা যিনি প্রাথমিক তথ্য সরবরাহ করছেন সেটা সংবাদ আকারে প্রচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী দায়িত্বশীল ভূমিকা দরকার ডেস্ক এডিটরের।

প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর ডেস্ক এডিটর সেটা ক্রস চেক করবেন দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সূত্র থেকে,সম্ভব হলে প্রাথমিক যে সূত্র থেকে মাঠের রিপোর্টার তথ্য পেয়েছেন সে সূত্রটাও একবার যাচাই করে নেওয়া ভাল। এর জন্য খুব বেশী সময় দরকার তাও কিন্তু নয়। কিংবা সময় যদি কিছুটা লাগেও, সঠিক তথ্য জানানোর নৈতিক দায় থেকেই সময়টা নেওয়া উচিত। যদি তথ্যটি অন্য কোন সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব নাও হয়, তখন সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে অন্তত: প্রাথমিক তথ্য দিয়ে বলা যেতে পারে, ‘এটা প্রাথমিক ভাবে জানা গেলেও কোন দায়িত্বশীল সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’ গলদটা এখানেই। টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে এই ডেস্ক এডিটরের জায়গাটাই এখন সবচেয়ে বেশী দুর্বল। ডেস্ক এডিটর হিসেবে যারা কাজ করছেন তাদের বেশীরভাগেরই মাঠে রিপোর্টিং এর একদিনেরও অভিজ্ঞতা নেই, সংবাদের গুরুত্ব বিচারের ক্ষমতা অর্জন করতে যে নূন্যতম অভিজ্ঞতার প্রয়োজন তাও নেই।

মাঠের রিপোর্টারদের তথ্য যাচাই করার জন্য তাদের যে সোর্সের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকা দরকার সেটা যখন একেবারেই কোন ডেস্ক এডিটরের থাকে না, তখন তার সামনে রিপোর্টারের দেওয়া তথ্য চোখ বন্ধ করে স্ক্রলে ব্রেকিং হিসেবে চালানো ছাড়াও উপায় থাকে না। তার উপরে মাথার উপরে খড়গ আছে, যতি আর এক চ্যানেল আগে ব্রেকিং স্ক্রল দিয়ে দেয় তাহলে তো চিফ নিউজ এডিটর, হেড অব নিউজ কিংবা তারও উপরের উপরওয়ালাদের ভৎসর্না হজম করতে হবে অন্ধ-বধিরের মত। এ কারনে এই ডেস্ক এডিটরদের কাছে যে কোন উপায়ে একটা সংবাদ সবার আগে ‘অন এয়ার’ করাটাই বড় কৃতিত্বের ব্যাপার’। ঠিক-বেঠিকের বিষয় নিয়ে তারা খুব বেশী চিন্তিত হন না, কিংবা চিন্তিত হওয়ার মত প্রজ্ঞা অর্জন করেছেন এমন ডেস্ক এডিটরের সংখ্যা হাতে গোনা। সংবাদ মাধ্যমের যারা কর্ণধার তারা সাংবাদিকতার দায়ীত্বশীলতা এবং সংববেদনশীলতার জায়গাটিকে খেলো করে তুলেছেন ডেস্ক এডিটর ( অ্যাসিটেন্ট নিউজ এডিটর, জয়েন্ট নিউজ এডিটর এমনকি নিউজ এডিটর) পদে অবাধে দায়িত্বহীন নিয়োগের মাধ্যমে।

সাধারনত রিপোর্টিংএ যারা খুব বেশী দুর্বল তাদেরই পুনর্বাসন করা হচ্ছে ডেস্কে বসিয়ে, মালিকপক্ষ থেকে পোষ্য কোটায় যে নিয়োগ হয় তারও বেশীরভাগকেই শুরুতেই বসিয়ে দেওয়া হয় ডেস্কে। কিন্তু একবারও ভাবা হচ্ছে না, যিনি বা যারা রিপোর্টারদের তথ্য প্রচার করার গুরু দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অবশ্যই রিপোর্টারদের চেয়েও বেশী যোগ্যতা থাকা দরকার। এই যোগ্যতার মাপকাঠি হওয়া উচিত প্রথমে অভিজ্ঞতার বিচারে। ডেস্কে নূন্যতম নিউজ রুম এডিটর হতে হলেও কমপক্ষে পাঁচ বছরের প্রত্যক্ষ রিপোর্টিং এর অভিজ্ঞতা থাকা উচিত। কারন চিফ নিউজ এডিটর কিংবা হেড অব নিউজ সার্বক্ষণিকভাবে সংবাদ প্রচার মনিটর করেন না, করার কথাও নয়। সার্বক্ষণিক সংবাদ প্রচারের বিষয়টি মনিটর করেন ডেস্ক এডিটরররা। তারাই থাকেন চালকের আসনে, অথচ সেই জায়গাটিই এই মুহুর্তে সংবাদ মাধ্যমে সবচেয়ে দুর্বল। এ দুর্বলতা থেকে নতুন অনেক সংবাদপত্রও মুক্ত নয়। ভুল তথ্য, দায়িত্বহীন তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমের প্রধান আভ্যন্তরীণ গলদ এটাই।

এবার আসি রিপোর্টিং প্রসঙ্গে। আমি নিজেও রিপোর্টার। একেবারে ফুল টাইম মাঠের রিপোর্টার। সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন দু’টো মাধ্যমেই মোটামুটি লম্বা সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা যখন রিপোর্টিংএ শুরু করি আরও প্রায় চৌদ্দ বছর আগে তখন সিনিয়র রিপোর্টার ও বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে আমরা যাদের চিনতাম, তারা বেশীরভাগই ছিলেন মধ্যবয়সী। শুধু বয়স বলে নয়, একেক জন দশ-বার বছর পার করে সিনিয়র রিপোর্টার হয়েছেন, পনর-বিশ বছর পর বিশেষ সংবাদদাতা হয়েছেন। প্রত্যেককের সাংবাদিকতায় একটা প্রতিষ্ঠিত, স্বনামধন্য অবস্থান ছিল। ওয়েজ বোর্ড অনুসারে বিশেষ সংবাদদাতার পদটি রিপোর্টিং এর সর্বোচ্চ পদ এবং এর পদ বিন্যাসে ‘এ গ্রেডের’। পত্রিকার সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকও এ গ্রেডের, তবে তারা বিশেষ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকেন । তাহলে বোঝা যায় বিশেষ সংবাদদাতা পদটি কতটা মর্যাদা সম্পন্ন। কিন্তু দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো নিয়োগের ক্ষেত্রেও ‘মরণ রেস’ দিতে গিয়ে বিশেষ সংবাদদাতার মর্যাদাসম্পন্ন পদটিকে হাস্যকর, খেলো, গুরুত্বহীন করে তুলেছেন। আমি অনেককেই চিনি যারা এই মাত্র দুই-তিন বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেস পাশ করে প্রথমে শিক্ষানবীশ রিপোর্টার, প্রতিষ্ঠান বদল করে ছয় মাসের মাথায় স্টাফ রিপোর্টার, এক বছরের মাথায় সিনিয়র রিপোর্টার, দুই বছর পার হওয়ার আগে বিশেষ সংবাদদাতা হয়েছেন।

নতুন একেকটা চ্যানেল আসছে, আর ধুমছে প্রমোশন দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি একটিও বিশেষ রিপোর্ট না করে বিশেষ সংবাদদাতা হয়েছেন এমনও চোখের সামনেই আছে। সর্বনিম্ন শিক্ষানবীশ রিপোর্টারের পদ থেকে মাত্র দুই বছরে বিশেষ সংবাদদাতার সর্বোচ্চ পদে যখন কেউ চলে যায় তখন বুঝতে হবে তিনি অনন্য ব্যক্তিত্বদের কেউ। সমস্যা হচ্ছে এই গণহারে যখন অনন্য ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়, তখন আসলে ‘অনন্য’ শব্দটা বিশেষত্ব হারিয়ে ‘সাধারন’ শব্দে পরিণত হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এখন টেলিভিশনগুলোতে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বিশেষ করে গত দুই বছরে সিনিয়র রিপোর্টার আর বিশেষ সংবাদদাতার পদগুলো অতি সাধারন হয়ে গেছে। দু’একটি ক্ষেত্রে এই ‘সাধারন’ সংক্রমণটি সংবাদপত্রেও দেখা যাচ্ছে। শিক্ষানবীশ রিপোর্টারের সঙ্গে বিশেষ সংবাদাতার অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞায় খুব বেশী তফাৎ পাওয়া যায় না।

এ কারনেই বিধ্বস্ত ভবন থেকে উদ্ধার করার পর মুমূর্ষু,প্রায় অচেতন ব্যক্তির মুখের সামনে রিপোর্টার মাইক্রেফোন দিয়ে বলেন ‘আপনার অনুভূতি কি বলুন’। যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে দায়িত্বশীল পদে যান না বলেই দায়িত্বশীল পদে থাকা বিপুল তারকা খ্যাতি সম্পন্ন রিপোর্টরারও জীবনবাজী রেখে উদ্ধারকর্মীদের অসংখ্য হতাহতদের উদ্ধার, স্বজনের বুকফাটা আর্তনাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘লাইভ’ দেওয়ার সময় ‘বিধ্বস্ত ভবনের ভেতর উদ্ধারকর্মীরা মালামাল চুরি করতে পারে’ এমন সম্ভাবনার কথাও দর্শকদের গুরুত্বের সঙ্গে মনে করিয়ে দেন! সাংবাদিকতার নামে এই প্রহসনের দায় আমাদের শ্রদ্ধেয় মুরুব্বীরা সহ আমার মত অতি নগণ্য সংবাদ কর্মীর কাঁধেও এসে পড়ে, বেদনাদায়ক হলেও তা বহন করতে বাধ্য হচ্ছি আমরা সবাই।

দু’টো অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০০৫ সালে বাইপাইলে স্পেকট্রাম ভবন ধ্বসের সময় আমার কর্মস্থল ছিল দৈনিক জনকন্ঠ। ভবন ধ্বসের ঘটনা ঘটেছিল ভোর রাতে। সকাল বেলায় চিফ রিপোর্টারের নির্দেশে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হলাম। তখনও ভবনের ভেতর থেকে গোঙ্গানি, মৃদু চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ভাঙ্গা দেওয়ালের ভেতর থেকে একটি হাত বেশ নাড়াচাড়া করছিল। অনেকক্ষণ হাতটি নড়েছিল। এক সময় নিথর হয়ে ঝুলে গেল। আমার ভেতরেও যেন সবকিছু ঠান্ডা হয়ে গেল। এত মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ততক্ষণে সবাই জেনে গেছে এই ভবনটির মালিক শাহরিয়ার তখনকার সরকারি দল বিএনপি’র এক এমপি’র জামাই। নতুন দায়িত্বে আসা বানিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী(আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন) সকালেই এসেছিলেন। তিনি আমাদের প্রশ্নের জবাবে বলে গেলেন, মালিকের কোন দোষ আমরা এখনও দেখছি না, কারন মনে হচ্ছে বয়লার বিস্ফোরনে ভবনটি ধ্বসে গেছে। ব্যস, আর যায় কোথায়। তখন যে কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ছিল সেগুলোর খবর এবং পরের দিন জনকন্ঠ ছাড়া অন্যসব পত্রিকায় খবর এল,‘বয়লার বিস্ফোরনে স্পেকট্রাম ভবন বিধ্বস্ত’।

প্রথম আলো সরাসরি বয়লার বিস্ফোরন না বললেও ধারনা করা হচ্ছে বয়লার বিস্ফোরন এমন একটি সতর্ক শিরোনাম করল। আমি শেষ মুহুর্তে কথা বলেছিলাম সেখানে উদ্ধার তৎপরতায় আসা ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একজন সেনা কর্মকর্তা এবং রাজউকের তাৎক্ষণিক পরিদর্শনে আসা রাজউকের একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে। তারা দু’জনেই বলেছিলেন, ভবন পড়েছে ‘স্লাইচ’ হয়ে। এখানে কোন বিস্ফোরনের চিহ্ন নেই, বিভিন্ন তলার ছাদগুলো একটার উপর একটা পড়েছে চাঁই এর মত। পাইলিং কিংবা ভূগর্ভস্থ ভিত্তি নির্মাণে দুর্বলতাই প্রাথমিকভাবে ধ্বসে পড়ার কারন মনে করা হচ্ছে। আমি তাদের বক্তব্য দিয়ে রিপোর্ট করলাম ‘নির্মাণ ত্রুটির জন্য ধ্বসে পড়ল স্পেকট্রাম ভবন’। পরের দিন প্রচন্ড চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লাম সব সহকর্মীদের, সবার বিরুদ্ধে আমি একা। সবাই বানিজ্যমন্ত্রী এবং পুলিশ প্রশাসনকে উদ্ধৃত করে বয়লার বিস্ফোরনের কথা উল্লেখ করেছে।

একজন সহকর্মী বিধ্বস্ত স্পেকট্রামের সামনে দাঁড়িয়েই চ্যালেঞ্জ করলেন। চ্যালেঞ্জের জবাব পাওয়া গেল, আরও একদিন পর। ট্যাজেডি’র তৃতীয় দিনে বয়লার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হল। বয়লারের পেছন থেকে জীবিত একজন শ্রমিকও উদ্ধার পেলেন। তখন সবাই ফলোআপ লেখা শুরু করল,‘মালিকপক্ষ দায় এড়ানোর জন্য বয়লার বিস্ফোরনের গুজব ছড়িয়েছেন’। ২০১০ সালে নিমতলীর ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় আবারও সেই একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি গতে হল। তখন আমার কর্মস্থল একুশে টেলিভিশন। রাতেই খবর এল নিমতলীতে বিয়ে বাড়িতে ভয়াবহ আগুন। আমার কর্মস্থল সহ সবগুলো টিভিতে খবর এল বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরনে স্মরণকালের ভয়াবহ আগুন। পরের দিন পত্রিকাগুলোতেও একই শিরোনাম। পরের দিন খুব ভোরেই চলে গেলাম ঘটনাস্থলে। ভবনের ভেতরে ঢুকলাম বেশ কিছুক্ষণ পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ করে। ভবনের ভেতর শ্যুটিং শেষ করে বাইরে আসতেই দেখা মিলল ডিপিডিসি’র এর দু’জন মাঠ কর্মীর সঙ্গে। তারা ট্রান্সফরমার পরীক্ষা করতে এসেছেন অনেকটা গোপনে। তাদের সঙ্গে তিন চারজন ফায়ার সার্ভিস কর্মীও ছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাই জানালেন, সঙ্গের দু’জন ডিপিডিসি’র লোক। তারা আমাকে দেখালেন সিঁড়ির মুখে একটি বিধ্বস্ত গ্যাসের চুলা। আসলে এই অস্থায়ী চুলায় বিয়ে বাড়ির রান্না হচ্ছিল। এখান থেকেই কোনভাবে আগুন ছড়িয়ে গেছে চুলার দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া কেমিক্যাল গুদামে। যে ট্রান্সফরামার বিস্ফোরনের কথা বলা হচ্ছে তার ফিউজ কেটে যাওয়া ছাড়া বাদ বাকী সবকিছু ঠিক আছে, বিস্ফোরনের প্রশ্নই ওঠে না। বিষয়টি নিয়ে ফায়ার সার্ভিস এবং ডিপিডিসি’র দায়িত্বশীল সঙ্গেও আলাপ করলেন, তারও মাঠ কর্মীদের মতকেই সমর্থন করলেন, আর নিশ্চিত করে দিলেন, ট্রান্সফরামার বিস্ফোরনের ঘটনা ঘটেনি। সকালেই তথ্যটি অফিসে জানিয়ে স্ক্রল দিতে বললাম। দেওয়া হল না। দুপুরের পর অফিসে গিয়ে প্যাকেজ নিয়ে বসেও সেই বিপত্তি। সিএনই, ডিএনই কেউই রিস্ক নিতে রাজী না।

কারন প্রথম আলোতে ট্রান্সফরামার বিস্ফোরনের কথা এসেছে, এটিনএন বাংলা, চ্যানেল আই তখনও ট্রান্সফরমার বিস্ফোরনের স্ক্রল দিচ্ছে, এর বিপরীতে তারা আমার অনুসন্ধান গ্রহন করতে চাইলেন না। আমিও নাছোড়বান্দা। শেষ পর্যন্ত এমন একটা শর্ত হল, ‘যদি আমার দেওয়ার চুলার আগুনের তথ্য’ ভুল হয় তাহলে আমার চাকরি যাবে। এই শর্তে রাজী হওয়ার পর প্যাকেজ গেল আমার লেখা হুবহু স্ক্রিপ্টে। আবার সহকর্মীদের সঙ্গে যুদ্ধ। অবশ্য পরের দিন সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিস প্রেস ব্রিফিং করে আগুন লাগার কারন হিসেবে চুলার আগুন এবং কেমিক্যাল কারখানার কথা বলল। যে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরামার বিস্ফোরনের কথা বলা হয়েছিলম, সেটি কার্যকর আছে এবং সেটি ব্যবহার করেই এলাকায় জরুরী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, এমন কথাও তারা বললেন। অফিসে সিএনই এবং প্ল্যানিং এডিটর বললেন, আজই চেয়ারম্যানের কাছে তোমার বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করব। প্রস্তাব করা হয়েছিল কি’না জানি না। এরপর আরও প্রায় ছয় মাস একুশে টিভিতে ছিলাম, বেতন বাড়েনি।

একুশে টিভি’র প্রসঙ্গ দিয়েই শেষ করছি। নাদিয়া শারমীনের নাম এখণ সবাই জানেন। পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে ধর্মান্ধ, উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন হেফাজত ইসলামের বর্বর কর্মীদের হাতে নির্মমভাবে প্রহারের শিকার হয়েছিল শুধুমাত্র একজন নারী হওয়ার কারনে। তার উপর হামলার এই খবর সব টেলিভিশন, পত্রিকা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে। গুরুত্ব দেয়নি শুধু একটি টেলিভিশন, সেটি একুশে টেলিভিশন। একুশে টিভিতে ঘটনার দিনই আলাদা কোন প্যাকেজ যায়নি, হেফাজতের সমাবেশের একটা রিপোর্টে কোনরকমে দেখানো হয়েছে। আমাকে একুশে টিভির একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, প্যাকেজ বানানো হয়েছিল, কিন্তু একুশে’র সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রচার করা হয়নি। কারন একুশে টিভি এখন পূর্বের নৈতিক অবস্থান পরিবর্তণ করে উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থক। অতএব হেফাজতের নৈতিক মিত্র হওয়ার কারনে নাদিয়ার উপর হেফাজতের খবর এবং ফুটেজ বেমালুম হাওয়া করে দিয়েছে একুশে টিভি কর্তৃপক্ষ!

এই ঘটনা কিন্তু এবারই প্রথম নয়। এর আগে আরও অনেক টেলিভিশনের রিপোর্টাররা মার খেয়েছেন ওই সব টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংবাদ সংগ্রহ করতে যেয়ে। যেমন বসুন্ধরা সিটির ভেতরে, ডুমনিতে আশিয়ান সিটির খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে একাধিক টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা মার খেয়েছেন। কিন্তু কোন প্রতিকার হয়নি। বরং বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলা হয়েছে, প্লিজ, আপনাদের ওখানে আর এভাবে রিপোর্টার পাঠানো হবে না। দুভার্গ্য এটাও, টেলিভিশন সাংবাদিকরা অনেক বেশী ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, কিন্তু সেই ঝুঁকির দায়িত্বও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষ নিতে চায় না, পাশ কাটিয়ে যায় নানা হিসেব-নিকেষে। এই নিরাপত্তাহীনতার ভেতরেই চলছে আমাদের দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা!

লেখক: সাংবাদিক
সূত্র: rasedmehdi.blogspot.com