পুরনো বাংলা সিনেমা পত্রিকা

বুধবার, ১২/০৬/২০১৩ @ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

old filmচলচ্চিত্র জগতের গ্ল্যামারের পেছনে শুধু চলচ্চিত্র নয় রয়েছে চলচ্চিত্র সম্পর্কীত বিভিন্ন পত্রপত্রিকার অবদান। আজকের ইণ্টারনেট জগতের পড়ুয়াদের অনেকেই ৫০ বা ৬০ দশকের কথা জানবেন না। তাঁদের অনেকেরই জন্ম হয়েছে তার পরে। সেই সময়ে উল্টোরথ, সিনেমা জগত্, প্রসাদ, জলসা ইত্যাদি সিনেমা পত্রিকায় বাংলা চিত্রজগতের সংবাদ, তারকাদের ঘরোয়া খবর – পাতার পর পাতা ছবি দিয়ে প্রকাশিত হত।

চলচ্চিত্র-সাংবাদিকরা সত্য-অসত্যের মালমশলা মিশিয়ে বেশ আকর্ষণীয় করে স্টুডিওর এক স্বপ্ন- ময় আবহাওয়া ফুটিয়ে তুলতেন। পাঠক-পাঠিকারার সংখ্যা কম ছিলো না। পত্রিকা বেরোনো মাত্র তাঁদের প্রিয় তারকাদের খুঁটিনাটি খবরগুলো তাঁরা প্রায় মুখস্থ করে ফেলতেন। উন্নাসিকরাও দুয়েকবার লুকিয়ে পাতা উল্টোতেন। এগুলির শারদীয়া সংখ্যা বেরোতো। পত্রিকাগুলির পাতার বা প্রিণ্টের মান নিয়ে কিছু না বলাই ভালো। কিন্তু বড় বড় সাহিত্যিকরাও গল্প উপন্যাস দিয়ে তাদের সম্বৃদ্ধ করতেন।

কেন পত্রিকাগুলি দীর্ঘস্থায়ী হল না – সেটা বাঙালীদের ব্যবসা-কুশলতা – না অন্য কোনো গভীরতর কারণ রয়েছে – সেগুলি বিজনেস এনালিষ্ট বা সমাজবিজ্ঞানীরা স্থির করে বলতে পারবেন। এর অনেক আগেও আরও বহু বাংলা সিনেমা পত্রিকার (বলা বাহুল্য সবগুলি উল্টোরথ-জলসা জাতীয় পত্রিকা নয়) জন্ম হয়েছিলো এবং মৃত্যুও – এটুকুই আমরা জানি। নিচে তাদের কতগুলির ও সেই প্রসঙ্গে আর কয়েকটি পত্রিকার কথা সংক্ষেপে বলা হল।

বাংলায় সিনেমা পত্রিকার প্রথম চল হল বোধহয় ১৯২০ সালে। নলিনীকান্ত সরকার, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, শচ্চিদানন্দ সেনগুপ্ত, অরুণ সিংহ এবং লেখক ও চলচ্চিত্রকার দীনেশ রঞ্জন দাসের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বিজলী’। এর আগেও অবশ্য চলচ্চিত্রের কথা পত্র পত্রিকায় স্থান পেয়েছে। ১৯১৩ সালে জলধর সেন ও অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের ভারতবর্ষের প্রথম সংখ্যাতেই ছিল প্রমথনাথ ভট্টাচার্যের লেখা ‘বায়োস্কোপ’। ফিল্ম তৈরী করার টেকনিক নিয়ে নরেন্দ্র দেবের লেখা ‘ছায়ায় মায়ায় বিচিত্র রহস্য’ (যা পরে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়) – সেটিও এই ভারতবর্ষেই প্রথম বেরিয়েছিলো।

১৯২২ সালে হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ আরম্ভ করলেন বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘বসুমতী’। সাহিত্যই ছিলো এতে প্রধান – কিন্তু তার ফাঁকে ফাঁকে কিছু ফিল্ম বিষয়ক আলোচনা স্থান পেতো।

১৯২৩ সালে প্রকাশিত হল দ্বিতীয় (যদি ‘বিজলী’ প্রথম হয়) সিনেমা সাপ্তাহিক ‘সচিত্র শিশির’। এর সম্পাদক ছিলেন বিজয়রত্ন মজুমদার। ঐ একই বছর ১৮৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতী পত্রিকায় বাংলা সিনেমার ইতিহাসের উপর একটি ধারাবাহিক লেখা প্রকাশিত হয়। সিনেমার সঙ্গে যোগ নেই, কিন্তু বাংলা কাব্য-সাহিত্য জগতের একটি বড় ঘটনা ঘটে ঐ একই বছরে। প্রকাশিত হল বিখ্যাত কল্লোল (বাংলা কবিতার কল্লোল যুগ যার নাম থেকে এসেছে) পত্রিকা দীনেশ দাসের সম্পাদনায়।

১৯২৯ সালে বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (অবশ্যই দুর্গেশনন্দিনী-আনন্দমঠে-এর বঙ্কিম নন) ‘দীপালী’ বলে একটি মাসিক পত্রিকা বার করেন। পুরো সিনেমা পত্রিকা না হলেও, এতে মূলতঃ সিনেমার খবরই থাকতো।

১৯৩০ সালে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় সাপ্তাহিক ‘বায়োস্কোপ’ পত্রিকা শুরু করলেন। এতে শুধু বাংলা নয় – হলিউড ও বোম্বে সিনেমার খবরও অনেক থাকতো।

১৯৩১ সালে জন্ম নিল আরও দুটি সিনেমা পত্রিকা। অবিনাশ চন্দ্র ঘোষালের সম্পাদনায় বাংলা সাপ্তাহিক ‘বাতায়ন’ এবং বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় (পথের পাঁচালীর বিভূতি নন) সম্পাদিত ‘চিত্রলেখা’। পত্র-পত্রিকার ইতিহাসে এই বছরটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে এই সিনেমা পত্রিকা দুটির জন্য নয়। এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারণ এই বছরই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত বিখ্যাত সাহিত্য ত্রৈমসিক ‘পরিচয়’-এর জন্ম হয়।

১৯৩২ সালে অবনী বসু শুরু করলেন মাসিক ‘চিত্রপঞ্জী’ যেখানে অন্যান্য লেখার সঙ্গে সে যুগের চলচ্চিত্রকারদের সুচিন্তিত প্রবন্ধ ছাপা হত।

১৯৩৪ সালে শুরু হল জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ সম্পাদিত সিনেমা সাপ্তাহিক ‘রূপরেখা’। প্রসঙ্গতঃ আরেকটি পত্রিকা ঐ একই বছরে চালু হয়েছিল – যা আজও চলছে। সেটি হল আনন্দগোষ্ঠীর ‘দেশ’ পত্রিকা।

১৯৩৫ সালে কোনো অবশ্য সিনেমা পত্রিকা জন্ম নেয় নি, কিন্তু বছরটাকে বাদ দিতে পারছি না, কারণ ঐ বছরই প্রথম প্রকাশিত হল বাংলা কাব্যজগতের আরেকটি রত্ন বুদ্ধদেব বসু ও সমর সেন সম্পাদিত ‘কবিতা’।

১৯৩৭ সালে জগজীবন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সিনেমা সাপ্তাহিক ‘খেয়ালী’ প্রকাশ শুরু করলেন।

১৯৪৩ সালে কালীশ মুখোপাধ্যায় শুরু করলেন মোটামুটি উচ্চমানের একটি সিনেমা মাসিক পত্রিকা ‘রূপমঞ্চ’। এতে সে সময়কার চলচ্চিত্র, নাটক ইত্যাদির মননশীল সমালোচনা থাকতো। সাধারণভাবে চলচ্চিত্রকলা সম্পর্কে পাঠকদের অবহিত করা ছিল এই পত্রিকার অন্যতম উদ্দেশ্য।

১৯৪৭ সালে শুরু হল ‘রূপাঞ্জলী’ – শুধাংশু বসুর সম্পদনায়।

১৯৪৮ সালে গৌর চট্টোপাধ্যায় সিনেমা মাসিক ‘চিত্রবাণী’ শুরু করলেন। রূপমঞ্চের মত চিত্রবাণীও সে-যুগের বোদ্ধা পড়ুয়াদের তৃপ্তির কারণ হয়েছিল।

সহায়িকা:
Asish Rajadhaksya and Paul Willeman, Enclycopedia of Indian Cinema (London: British Film Institute and Oxford University Press, 1994)