নিউজপ্রিন্টের শুল্কবৃদ্ধি ও সাংবাদিক নেতাদের সাথে তথ্যমন্ত্রীর বৈঠক

সোমবার, জুন ১০, ২০১৩

পুলক ঘটক ::

Pulack-Ghatack১৫ মাস যাবত সাংবাদিক-কর্মচারিদের বেতন না দিয়েও প্রতিষ্ঠান চালানো যায় -এরকম নজির একমাত্র সংবাদপত্রশিল্প ছাড়া দেশের আর কোনো শিল্পে আছে কি না আমার জানা নেই। ঢাকার একটি বৃহৎ সংবাদপত্রে এখন এই চিত্র। কোনও কোনও পত্রিকায় এর চেয়েও বেশিদিন সাংবাদিকদের বিনাবেতনে কাজ করানোর নজির আমরা দেখেছি। এ নিয়ে সাংগঠনিক উচ্চবাচ্চ খুব বেশী না হলেও বাজেটে নিউজপ্রিন্ট আমদানির উপর শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে সংবাদপত্রমালিক ও সম্পাদকদের সংগঠনগুলো। পত্রিকাগুলো প্রথম দিন থেকেই এব্যাপাবে সরব। কারন মালিকের স্বার্থ। গতকাল (রবিবার, ৯ জুন) ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে’র) সাথে তথ্যমন্ত্রীর বৈঠকে জনৈক সাংবাদিক নেতা মালিক বাঁচানোর এ দাবিটি সামনে এনেছিলেন। মালিক বাঁচানোর এ দাবিতে আমিও অনড়। কারন, মালিক না বাঁচলে আমি বাঁচি কি খেয়ে। আমার দাবি বর্তমানে নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে যে ৩% (তিন শতাংশ) শুল্ক দিতে হয় সেটাও উঠিয়ে দেয়া হোক। মালিকরা শুন্য শুল্কে নিউজপ্রিন্ট আমদানির সুযোগ পাক। সাথে সাথে Compliance-এর শর্ত জুড়ে দেয়া হোক।

ইউরোপিয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পের মালিকদের বিনাশুল্পে তাদের দেশগুলোতে পন্য রফতানির সুযোগ দিয়েছে। সাথে জুড়ে দিয়েছে Compliance-এর শর্ত। অর্থাত শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থসেবা, নিরাপত্তা, উন্নত কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে। এই Compliance-এর শর্তগুলো আধুনিক বিশ্বের কর্পোরেট কালচারের প্রারম্ভিক শর্ত। আমাদের দেশের কর্পোরেট কালচারের মানে হচ্ছে এই শর্তগুলো (বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন) অস্বীকার করা।

সে যাই হোক, রাস্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত করা। যেখানে বিদেশীরা ব্যবসার শর্ত হিসেবে Compliance-এর শর্ত জুড়ে দেয় সেখানে রাস্ট্র তার শ্রমজীবি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় Compliance-এর শর্তগুলো কেন জুড়ে দিবে না ?

২০০৭-এ রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত তত্তাবধায়ক সরকারের বাজেটে সংবাদপত্রে সরকারী বিজ্ঞাপনের হার বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর এক জনকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন অর্থ উপদেষ্টা মীর্জা এ.বি. আজিজুল ইসলাম। ঐ সংবাদসম্মেলনে আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম “সরকারী বিজ্ঞাপন প্রদানের সাথে ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের শর্ত তথা Compliance-এর শর্ত জুড়ে দেয়া হবে কি না “ অর্থ উপদেষ্টা শত শত সাংবাদিকের উপস্থিতিতে বলেছিলেন, “এটি একটি যুক্তিসংগত প্রস্তাব।” তিনি বিষয়টি নোট ডাউন করেছিলেন এবং কথা দিয়েছিলেন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরপর তত্তাবধায়ক সরকার সরকারী বিজ্ঞাপন প্রদানের পূর্বশর্ত হিসেবে, তথা মিডিয়া তালিকাভুক্তির অনুসঙ্গ হিসেবে সংস্লিষ্ট পত্রিকায় “ওয়েজ বোর্ড অনুসারে বেতন দেয়া হয়” মর্মে সংস্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক প্রতিনিধির প্রত্যয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রত্যয়ন নেয়ার বাধ্যবাদকতা সংবলিত একটি পরিপত্র জারি করে। বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য পত্রিকাগুলোকে ডিইউজে’র ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। তবে নেতৃত্বের দুর্বলতা কিংবা অন্য কোনো কারণে ওয়েজবোর্ডের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ডিইউজে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।

গতকাল তথ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠককালে আমার বক্তৃতায় আমি বলেছিলাম, মাননীয় মন্ত্রী আপনি গণমাধ্যমের মালিকদের সবধরনের সুযোগসুবিধা দিন। তাদের সুযোগসুবিধা আরও বাড়িয়ে দিন। সাথে সাথে একটি গেজেট নোটিফিকেশন জারী করুন, যাতে এধরণের সুযোগ সুবিধা নেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে মালিকপক্ষ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক ও কর্মচারিদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে বাধ্য হয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যেন সেখানকার সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ডিইউজে ইউনিট কার্যকর থাকে। “সাংবাদিক-কর্মচারিরা তাদের ন্যয্য পাওনা পাচ্ছে” মর্মে ডিইউজের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের ইউনিট প্রধান এবং ডিইউজে’র সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের সনদ ছাড়া মালিক পক্ষ যেন কোনও প্রকার সরকারি সুযোগ-সুবিধা না পায়।

এ প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, “ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার একটি স্বীকৃত আইনগত অধিকার। এটা অস্বীকার করার সুযোগ কারও নেই।” তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে কথা দিয়েছেন। ওয়েজ বোর্ডের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে মালিকদের কিভাবে বাধ্য করা যায় এ বিষয়ে তিনি সরকারের অভ্যন্তরে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন। এখন সাংবাদিক সমাজের, তথা নেতৃবৃন্দের উচিত হবে এ বিষয়ে সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করা।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে গত প্রায় দু’ বছরেও সাংবাদিকদের সমস্যাবলী চিহ্নিত করে কয়েক দফার একটি সুস্পষ্ট দাবীনামা উপস্থাপন করতে পারিনি। কোনও কার্যকর আন্দোলন দূরে থাক !

আরেকটি আশ্চর্যের বিষয় যে, গতকাল দাবিগুলো আলোচিত হলেও কোনও সংবাদপত্রেই তা ভালভাবে আসেনি। অনেক রিপোর্টারকে আ্যাসাইনমেন্ট কভার করতে দেখলাম। তারা মনে হয় মালিকদের দ্বারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, “তথ্যমন্ত্রী কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য দেয় কিনা সেগুলো খেয়াল করার।” সাংবাদিকরা সবার অধিকারের কথা লিখলেও নিজেদের অধিকারের কথা তুলে ধরতে কলম ভোতা করে ফেলেন এটা আমরা আগাগোড়াই দেখছি।

লেখক: সাংবাদিক।
সৌজন্যে- টোটালনিউজবিডি.কম