৫০ বছর পার করলো চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব

রবিবার, ০৯/০৬/২০১৩ @ ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ

কাজী আবুল মনসুর ::

PM4_9453-2-3অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ৫০ বছর পার করলো চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব। ৬২ সালে এ ক্লাবটির জম্ম। অনেক ত্যাগ তিতীক্ষার পর এক টুকরো জমির উপর চাউনি দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ বট বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। অনেক প্রবীণ সাংবাদিক হারিয়ে গেছে, অনেক প্রবীণ এখনও হাল ধরে আছে। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে এগিয়ে চলছে প্রেস ক্লাব। আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকও। তাদের অনেক লেখা ও ছবি এখনও ইতিহাসের কথা বলে।

২০১৩ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারী রোববার ছিল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জন্য একটি স্মরনীয় দিন। ক্লাবের ৫০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম দেশের কোন প্রধানমন্ত্রীর সাথে পুরো নির্বাহী কমিটির সাক্ষাত। ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রেস ক্লাব নির্বাচনের দেড় মাসের মধ্যে এ ধরনের একটি সুযোগের আশা কেউ না করলেও নির্বাচিত সভাপতি আলী আব্বাসের স্বপ্ন ছিল বরাবরই। সে স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য করেছেন অনেক দৌড়ঝাঁপ। শেষপর্যন্ত অপ্রত্যাশিত সে সাফল্য ধরা দিল। প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমিও বেশ পুলকিত। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে যখন জানলাম ১৭ ফেব্র“য়ারী দুপুর সাড়ে ১২ টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত কমিটির সাথে সাক্ষাত দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

“অনারা বে¹ুইন আইসসুন না”…প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় চামেলিতে ঢুকার মুখে এক সেনা কর্মকর্তার মুখে চট্টগ্রামের ভাষা শুনে বেশ চমকে গেলাম। পরে জানলাম লে.কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ চট্টগ্রামেরই সন্তান। তার একান্ত সহযোগিতায় এই সাক্ষাতকার। তিনি প্রেস ক্লাব কর্মকর্তাদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সময় থাকা অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিলেন।

বেলা ১টায় প্রধানমন্ত্রী হলরুমে এসেই সবার সাথে কুশল বিনিময় করেন। পরিচিত হন কর্মকর্তাদের সাথে। মন দিয়ে শুনেন প্রেস ক্লাবের কর্মকর্তাদের বক্তব্য। সভাপতি আলী আব্বাস প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, আমরা আপনার কাছে কিছু চাইতে আসিনি, এসেছি আপনাকে প্রেস ক্লাবের ৫০ বছর পূর্তিতে প্রধান অতিথি করে নিয়ে যেতে। প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে আসতে রাজী হন। তিনি মে-জুনের যে কোন সময়ে শিডিউল দেবেন বলে জানান।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চট্টগ্রাম হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার। ১৯৬১ সালে স্বাধীনতার কথা শুনেছি আজিজ (এমএ আজিজ) কাকার কাছে । চট্টগ্রামের টাইগার পাস দেখিয়ে তিনি বলতেন এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে। কালুরঘাটে বিশাল মাঠের পাশে বেতারের ছোট্ট বিল্ডিংটি দেখিয়ে বলতেন এখান থেকে দেয়া হবে স্বাধীনতার ঘোষণা। অনেক স্মৃতি বিজড়িত আমার এই চট্টগ্রাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম সফর করেছি। চট্টগ্রামের উন্নয়নে আমি সবসময় আন্তরিক।

আমি এবার যাব চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সুবর্ণ জয়ন্তীতে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বর্তমান কমিটির সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য নুর মোহাম্মদ রফিককে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেন ক্লাব সভাপতি। প্রধানমন্ত্রীকে স্মরন করিয়ে দেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা নুর মোহাম্মদ রফিককে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু ফ্রান্স পাঠিয়েছিলেন। সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদ উল আলম প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আপনি চট্টগ্রামের ৪ জন প্রবীণ সাংবাদিকের জন্য ২ লাখ টাকা করে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়ন প্রসঙ্গ উল্লে¬খ করে বলেন, স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম ছিল অবহেলিত। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটসহ সবধরণের অবকাঠামো উন্নয়ন করেছি। এখনও চট্টগ্রামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। এ জন্যই চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের চেহারা অনেক পাল্টে গেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা বন্দরের স্বীকৃতি পেয়েছে। এই বন্দরে এখন জাহাজকে অলস বসে থাকতে হয় না। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় গিয়ে এক টাকায় চট্টগ্রামের সিএসডি গোডাউন ইপিজেড করার জন্য ইজারা দিয়েছিল। আমি ক্ষমতায় এসে ৬ কোটি টাকা গচ্ছা দিয়ে ইজারা গ্রহীতাদের সঙ্গে সমঝোতায় এসে সেখানে অত্যাধুনিক খাদ্যগুদাম তৈরি করছি। চট্টগ্রামের মতো জায়গায় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এ ধরণের সাইলোর খুবই প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ১৮ দল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের চেষ্টার পাশাপাশি মানুষের রক্ত নিয়ে খেলতে শুরু করেছে। জনতার শক্তির কাছে তাদের মতো অপশক্তি টিকে থাকতে পারবে না। এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে দেশের তরুণসমাজ। জাগ্রত তরুণসমাজের বার্তা দেশের প্রত্যেক মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। এই বাংলায় আর যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই হবে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) ৩৭ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার করে ১১ হাজারকে দণ্ডিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান খুনী, হত্যাকারী আর রাজাকারদের নিয়ে সরকার গঠন করে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দেন।

বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেই বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক লোকটির নাম শান্তি কমিটিতে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র রক্ষা করে আশ্রয় দিয়ে খাবার সরবরাহ করেছিলেন। সারাদেশে এমন নজির অনেক। বঙ্গবন্ধু এ ধরণের লোকজনকে ক্ষমা করে জেল থেকে মুক্ত করেছিলেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী এবং যারা একাত্তরে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগে জড়িত ছিল তাদের ক্ষমা করেননি। তিনি বলেন, দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে আমরা ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে মধ্য আয়ের দেশ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির জনক ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর দেশের ইতিহাস পাল্টে যায়। ক্ষমতায় চলে আসে পরাজিত শক্তি। তারা দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে দেয়। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আমরাই জাতির সামনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরি। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জাতির জনক হত্যাকারীদের বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে ২ জনের রায় হয়েছে। অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের রায়ও ঘোষণা করা হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ সরকারের সময় যেসব নির্বাচন হয়েছে সবগুলোই অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অনেক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীও পরাজিত হয়েছে। আমরা প্রমাণ করেছি, এ সরকারের আমলে সুষ্টু নির্বাচন সম্ভব। বিরোধীদল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবির নামে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।

প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের আগামী সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার সম্মতি প্রদান করে বলেন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণসমাজের চলমান আন্দোলনেও একাত্ম হয়েছে এই প্রেস ক্লাব। আশা করছি ভবিষ্যতেও তাদের প্রগতির ধারা অব্যাহত থাকবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি আলহাজ আলী আব্বাস, সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ উল আলম, সিনিয়র সহ সভাপতি রাশেদ রউফ ও সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মহসীন কাজী, অর্থ সম্পাদক শুকলাল দাশ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রূপম চক্রবর্তী, ক্রীড়া সম্পাদক নজরুল ইসলাম, গ্রন্থাগার সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সমাজেসেবা ও আপ্যায়ন সম্পাদক আইয়ুব আলী, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আলমগীর সবুজ ও কার্যকরী সদস্য এজেডএম হায়দার, মনজুর কাদের মনজু, নূর মোহাম্মদ রফিক এবং আজীবন দাতা সদস্য আ জ ম নাছির উদ্দিন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদসহ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষাত শেষে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি তোলার জন্য সাংবাদিকরা আবদার করলে তিনি তা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের ছেলে ফটো সাংবাদিক সুমনসহ বেশ কয়েকজন এগিয়ে আসেন ছবি তুলতে। যারা প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর পাশে ছবি তোলেন তাদের তোলা শেষ হলে দুরের জনকে কাছে এসে ছবি তুলতে বলেন। বেশ কিছু ছবি তোলার পর তিনি হল ত্যাগ করেন। সাংবাদিকরাও রওয়ানা হন নিজ গন্তব্যে।

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম