মাউথ জার্নালিস্টে সিলেট সয়লাব

শুক্রবার, ০৭/০৬/২০১৩ @ ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ম. আনফর আলী ::

yellowএক সময় সাংবাদিক পরিচয়ে সমাজে অনেক সম্মান পাওয়া যেতো। বর্তমানে এই পরিচয়ে মোটেই কোন সম্মান পাওয়া যায় না, বরং মনে হয় অনেকেই একটু তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং ঘৃণার চোখেই দেখেন। এর কারণ, আগের সাংবাদিকরা নিজের পেশাগত ইজ্জত বহাল রেখে চলতেন বলে তাঁরা ছিলেন ‘সম্মানিত’। বর্তমানে দলে দলে, পথে পথে হালি হালি গন্ডায় গন্ডায় সাংবাদিক এবং তারা খুবই পাওয়ারফুল, যা তাদের কথাবার্তায়ই ফুটে ওঠে তাই বলা যায় তারা এখন ‘চম্মানিত’। গত দুই দশকে শত শত সাংবাদিক ভূমিষ্ট হয়েছেন। এদের মধ্যে ‘মাউথ জার্নালিস্ট’এর সংখ্যাই বেশি। ছয়মাসে, নয়মাসেও যারা দু’লাইন লিখেনা বা লিখতে পারেনা, তাদেরকে ‘মাউথ জার্নালিস্ট’ বলাই শ্রেয়। অর্থাৎ লেখালেখি করতে পারুক আর না পারুক এসব মাউথ জার্নালিস্টরা কথাবার্তায়তো পটু।

এদের কেউ কেউ অত্যন্ত দাপটের সাথে এমনভাবে কথাবার্তা বলে এবং নিজের পরিচয় তুলে ধরে বুঝাতে চায় যে, তাদের কথায়ই দেশ চলে। অনেক পুলিশ সদস্যদের সাথে এসব মাউথ জার্নালিস্টদের ভালো সম্পর্কও রয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় দানকারী এসব মাউথ জার্নালিস্টরা দিন-রাত এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায় এবং কথায় কথায় সর্বাগ্রে নিজের পরিচয় ও মতার বিষয়টি তুলে ধরে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদেরকে নিয়ে লোকজন কি বল্লো, মন্তব্য করলো সেদিকে মাউথ জার্নালিস্টদের খেয়াল নেই। বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে মানুষের মনে ভিন্ন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। আর হওয়াটাও স্বাভাবিক। কারণ, এজন্য দায়ি ঐসব মাউথ জার্নালিস্ট গোষ্ঠী। আশ্চর্যের বিষয়, এরা কোন কোন পত্র- পত্রিকায়ও স্থান পায়! একজন দায়িত্বশীল প্রকৃত সাংবাদিককে নজর রাখতে হয় তার অধীনে যারা কাজ করে তাদের চলাফেরা, কথাবার্তা, ভাব-ভঙ্গি, নীতি, নৈতিকতা এবং পেশাগত দায়িত্বশীলতার প্রতি। এসব জানা না থাকলে তাকে শিখাতে এবং বুঝাতে হয়। কিন্তু পরিচয়পত্র প্রদানকারী তথাকতিথ পত্র-পত্রিকা পরিচয়পত্র বহনকারীর ব্যাপারে কোন রকম যাছাই-বাছাই বা খোঁজ-খবর করার দরকার মনে করেনা।

আগে পত্র-পত্রিকা এবং সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল কম। কিন্তু সাংবাদিকদের সম্মান ছিল বেশি। আমি যখন এ পেশা’র সাথে জড়িত হই ১৯৮২ সালে, তখন সিলেটে ছিল হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকা। সিলেটের প্রাচীন পত্রিকা সাপ্তাহিক যুগভেরী, সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার, সাপ্তাহিক দেশবার্তা প্রভৃতি। সিলেট সমাচারে ‘মুন্সি জাবান উল্লাহর জবানবন্দি’ নিয়মিত পড়তাম এবং কল্পনায় আবিস্কার করলাম এই কলাম লেখক আর কেউ নয় আ. ফ. ম. সাঈদ। তখন সাঈদ সাহেবের সাথে আমার পরিচয় নেই। তাঁকে আমি সাংবাদিক হিসেবে চিনতাম, তবে নাম জানতাম না, মনে করতাম এই লোকটিই মুন্সি জবান উল্লাহ। আমার ভুল ভেঙ্গে দিলেন সাংবাদিক সন্টু দা, যিনি বর্তমানে সাপ্তাহিক সিলেট প্রান্থ’র বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

সন্টু দা’র মাধ্যমেই আ. ফ. ম. সাঈদ সাহেবের সাথে আমার পরিচয় ঘটে এবং পরবর্তীতে সু-সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা আজও বহাল আছে এবং আশাকরি আজীবন থাকবে। তখন সিলেট থেকে কোন দৈনিক পত্রিকা বেরুতো না। সে সময় ঢাকা’র সাপ্তাহিক, পাকি ও মাসিক ম্যাগাজিনগুলো বাজার দখল করেছিল এবং তার পাঠকও সৃষ্টি করেছিল। সিলেটের অনেক প্রবীন ও নামি-দামী সাংবাদিকরাও ঢাকা’র ম্যাগাজিনে লিখতেন। তখন ম্যাগাজিনের খুবই দাপট ছিল। তারপর মুহাম্মদ ফয়জুর রহমানের সম্পাদনায় দৈনিক সিলেটের ডাক ও আব্দুল ওয়াহেদ খান-এর সম্পাদনায় দৈনিক জালালাবাদ বের হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই একে একে নতুন নতুন পত্র-পত্রিকা বের করার প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং বেরুতে থাকে। সেই সাথে ডেলিভারি হতে থাকে আনাড়ি এবং মাউথ জার্নালিস্টদের।

গান-বাজনার ব্যাপারে বলা হয় সেটা হচ্ছে ‘গুরুমূখী বিদ্যা’। সাংবাদিকতার বেলায়ও তেমনি হতে পারে। কারণ, পড়ালেখা জানলেই লেখক হওয়া যায় না, গলা থাকলেই গান গাওয়া যায় না, দু’একটি সভায় বক্তব্য দিলেই নেতা হওয়া যায় না। গান গাইতে যেমন গলা তৈরী করতে হয়, তেমনি লেখালেখি’র ব্যাপারেও অনেক কলা-কৌশল শিখতে হয়। সেই সাথে শিখতে হয় দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, সত্যবাদিতা, কর্তব্যপরায়নতা, নিরপেতা ইত্যাদি। গুরুজনরা বলেন, ভালো লেখক হতে হলে ভালো পাঠক হতে হয়। অর্থাৎ লেখালেখি’র চাইতে পড়াপড়ি করতে হয় বেশি। কিন্তু সেই পড়ার অভ্যাস ক’জনের আছে, বা ক’জনেইবা পড়ছে? বরং ‘লেখালেখি’ আর ‘পড়াপড়ি’র চাইতে মুখে বলা-বলিটাকেই বর্তমান সময়ের সাংবাদিক সাহেবরা বেশি পছন্দ করেন। আর এদেরকেই বলা হয় ‘মাউথ জার্নালিস্ট’।

বর্তমানে সিলেটে সাংবাদিকদের সংখ্যা কতো তা কেউ-ই বলতে পারবেন না। দিন দিন নতুন নতুন পত্রিকা আর নয়া নয়া সাংবাদিক আত্মপ্রকাশ করছে। ‘সাংবাদিক’ বলতে পারেনা, বলে ‘সম্বাদিক’ এ রকম ব্যক্তিও দাপটের সাথে সাংবাদিকতার পরিচয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাংবাকিতার ‘সা’ও জানেনা সে রকম লোকরাও সাংবাকিতা পেশায় নবাগতদের প্রশিণ দিচ্ছে। ‘খাঁটি গরুর দুধ’ আর ‘গরুর খাঁটি দুধ’, ‘ট্রাকভর্তি গম উদাও’ আর ‘গমভর্তি ট্রাক উদাও’-কে তারা একই অর্থে ব্যবহার করার পদ্ধতি শিখাচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন নতুন সাংবাদিক সাহেবরা পুলিশী মেজাজে মাঠে নামছে এবং সবকিছুর আগে নিজের পরিচয় তুলে ধরাটাকেই বড় মনে করছে। সংবাদ কিভাবে সংগ্রহ করতে হয় এবং কিভাবে সংবাদ লেখতে হয় সেটার ধার ধারছেনা কেউই।

এসব কারণে প্রকৃতভাবে পেশাগত সাংবাদিকরা তাঁদের মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানিতে পড়েছেন বলা যায়। কেননা, সাধারণ মানুষতো আর সে বিচারে যান না যে, কে প্রকৃত ‘সাংবাদিক’ আর কে মাউথ জর্নালিস্ট অর্থাৎ ‘মুখসাংবাদিক’। তাঁরা গণহারেই সকল সাংবাদিক পরিচয়ধারীদের দেখে থাকেন। আমি গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখি’র সাথে জড়িত থেকেও প্রকৃত এবং যোগ্য সাংবাদিক হতে পারিনি। এজন্য নিজেই নিজেকে অতি নগন্য এবং নালায়েক বলে মনে করি। আমার এই লেখা কোন সাংবাদিককে ছোট করার জন্য বা কোন ব্যক্তির উদ্দেশ্যে নয়। সাংবাদিকদের বলা হয় ‘সমাজের বিবেক’। তা-ই যদি হয় তাহলে ঘন্টায় ঘন্টায় ডেলিভারি হওয়া সাংবাদিক নামধারীদের কারণে পেশাদার এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মানের হানি হবে কেন? এটাই জিজ্ঞাসা সিলেটের প্রকৃত সাংবাদিক এবং সচেতন মহলের।

লেখক: সংবাদকর্মী।