সাগর-রুনি: এবার অনুসন্ধানে নামবেন সাংবাদিকরা

রবিবার, ১০/০২/২০১৩ @ ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

প্রেস বার্তা ডেস্ক:
Sagor-runi-3বহুল আলোচিত সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উন্মোচনে সরকারের ‘নাটকীয়তা’ দেখে আর অপেক্ষা নয়, সাংবাদিকরাই খুনের রহস্য উন্মোচনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে মাঠে নামবেন। শনিবার সাগর-রুনি স্মরণে আলোচনা সভায় সাংবাদিকরা একথা বলেন।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে ইউনিটির সহায়তায় সভার আয়োজন করে সাগর-রুনির পরিবার। এতে সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ, সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির, মেহেরুন রুনির মা নুরুন নাহার মির্জাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম সম্পাদকসহ বিশিষ্ট সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিআরইউ সভাপতি শাহেদ চৌধুরী।

রাজধানীর তোপখানা সড়কে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সোমবার বেলা ১১টায় সাংবাদিক মহাসমাবেশ হবে। গত বছরের এই দিনে রাজধানীর রাজাবাজারে ভাড়া বাসা থেকে সাগর-রুনির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এই হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবিতে সাংবাদিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রাজপথে নামে। চলমান আন্দোলনের এক বছরের মাথায় বৃহৎ কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছে সাংবাদিক সমাজ। যোগ হয়েছে স্বাধীনতার পর সব সাংবাদিক হত্যার বিচার, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার দাবি।

শনিবারের সভায় বক্তব্য দেন সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা, সমকাল সম্পাদক গোলাম সরওয়ার, এটিএন নিউজের সিইও আবেদ খান, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বৈশাখী টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ডিআরইউ’র সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু, সাংবাদিক শাহ আলমগীর, জহিরুল আলম, সোহরাব হোসেন, কাশেম হুমায়ুন, রাশেদ আহম্মেদ, শেখ মামুন, শফিক শাহীন, মাইনুল আলম, শাহনাজ বেগম, মোজাম্মেল হক প্রমুখ।

এবিএম মূসা বলেন, “আমি অনেকগুলো অপ্রিয় সত্য কথা বলে ফেলি। এজন্য অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। সাগর-রুনি নিয়ে তিনটি মহল থেকে নাটক হচ্ছে। এগুলো হলো- তদন্তকারী সংস্থা, সরকার এবং সাংবাদিক সমাজ।”

তিনি বলেন, “সাগর-রুনি হত্যার পেছনে সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল। সাগরের লেখা ‘আমি সেই কর্নেলকে খুঁজছি’ বইটি লাইনে লাইনে পড়লে এই হত্যা রহস্য সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যাবে।”

“সাংবাদিকদের কাছে আমার তিনটি প্রস্তাব। সব পত্রিকায় প্রতিদিন সাগর-রুনির ছবি ছাপতে হবে, শাহবাগের মতো পল্টন মোড়ে গণদাবি তুলে সেটাকে সাগর-রুনি স্কয়ারে পরিণত করুন, সাগর-রুনির সন্তান মেঘের জন্য সাংবাদিকদের নিজেদের তহবিল গঠন করুন। যাদের সম্ভব হয় আমার দাবিগুলো রাখার চেষ্টা করবেন।”, বলেন তিনি।

অন্তত একদিনের জন্য হলেও রাজধানীর পল্টন মোড়ে অবস্থান নিয়ে সাগর-রুনির বিচার দাবিতে সব মানুষকে নিয়ে গণজোয়ার সৃষ্টির আহ্বান জানান এই প্রবীণ সাংবাদিক।

এবিএম মূসার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আজ কেন আমাকে এখানে বক্তব্য রাখতে হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেঘকে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ নেননি প্রধানমন্ত্রী। আমি জানতে চাই- সাগর-রুনির বিচার নিয়ে সরকারের এই নাটক আর কতদিন চলবে?”

“আর কোনো মা’কে যেনো সন্তানের বিচারের জন্য এভাবে বক্তব্য দিতে আসতে না হয় সেই দোয়া করব। গোয়েন্দা পুলিশের মতো র‌্যাবও তদন্তে ব্যর্থতা স্বীকার করুক। আমার ছেলেরা (সাংবাদিকরা) আছে। তারা সবাই এই রহস্য উদঘাটন করবে, বিচার আদায় করবে।” বলেন তিনি।

সাগর-রুনির নামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠারও দাবি জানান সাগরের মা।

গোলাম সরওয়ার বলেন, “এই খুনের রহস্য উন্মোচনে আমরা এক পা-ও এগোতে পারিনি। দিনের পর দিন যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবর্তন হলো। এখনো সাংবাদিকদের একই ধরনের কথা শুনতে হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজ আরেকটি জজমিয়া নাটক বরদাশত করবে না।”

তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা এক হয়ে এই হত্যা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকারও এমন অনুসন্ধানী দল আছে।”

“সাগর-রুনি হত্যার বিচারের জন্য শাহবাগের মতো কেন আমরা আরেকটি মঞ্চ তৈরি করতে পারব না।সরকারে কে আছে, কারা আছে সেটি আমাদের বিবেচ্য নয়।” বলেন সরওয়ার।

আবেদ খান বলেন, “আমরা সরকারের আশ্বাসে আর বিশ্বাস খুঁজে পাচ্ছি না। সরকারের র‌্যাব-পুলিশের ওপর আমরা আর দায়িত্ব রাখতে চাই না। তাদের রিপোর্ট পুরো উল্টোদিকে যায়। তদন্তের নামে লুটপাট হয়। সাংবাদিকদের এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিতে হবে এবং এটি খুব সহজেই করা সম্ভব।”

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মেঘের দায়িত্ব নেয়ার পর এক বছর তার কোনো খোঁজই নেননি। রুটিন কর্মসূচি দিয়ে আর বিচার হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মেঘের জন্য সাংবাদিকদের ফান্ড গঠনের ব্যাপারেও পরামর্শ দেন তিনি।

মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, “এই বিচার না হলে আমরা দেশকে সভ্য দেশ বলে যে দাবি করি সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠবে। যতদিন রাষ্ট্র এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না, ততো দিন সভ্যতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”

তিনি বলেন, “সরকার ব্যর্থ হলে এই হত্যার রহস্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। সাংবাদিকরা এক হয়ে সিন্ডিকেট রিপোর্ট প্রকাশের নজির বিশ্বে অনেক আছে। অনুসন্ধান প্রতিবেদকদের নিয়ে টিম গঠন করে এই দায়িত্ব আমরা নিতে পারি।”

শাহেদ চৌধুরী বলেন, “অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে আমি একমত। একইসঙ্গে আমার অনুরোধ-আগামী সোমবার যেন সাগর-রুনি হত্যা নিয়ে সব পত্রিকায় অভিন্ন সম্পাদকীয় ছাপা হয়। অনলাইন পত্রিকা এবং টিভি-রেডিও হাউজেও যেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।”

সাখাওয়াত হোসেন বাদশা বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক প্রহসনমূলক নাটক সাজানো হচ্ছে। এটি আমরা আর দেখতে চাই না। হত্যাকারীর শিকড় যতো গভীরে হোক গ্রেফতার করতে হবে। মহাসমাবেশের আগে সরকার থেকে এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসলে আমরা আরো কঠোর কর্মসূচিতে যাবো। সেটি সরকারের বিপক্ষে চলে গেলেও দায়ভার সরকারের।”

সর্বশেষ