সাংবাদিকের অলিগলি

শুক্রবার, ০৭/০৬/২০১৩ @ ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ

হেমায়েত উদ্দিন হিমু ::

Himu-রোমাঞ্চকর, ভিন্নধর্মী এক পেশার নাম সাংবাদিকতা। সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে মানুষের কাছে গ্রহণীয় করার জন্য ফুলে-ফলে সাজায় যে কর্মী তার নাম সাংবাদিক। দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকি। আর্থিক নিশ্চয়তাও কম। তবুও সাংবাদিকের লাইন বড় হচ্ছে। কী মধু এ পেশায়? সাংবাদিকতাকে কেউ ‘নেশাদ্রব্য’, আবার কেউ ‘প্রেমরোগ’ এর সঙ্গে তুলনা করেন। একবার নেশা ধরলে ছাড়া যেমন কঠিন, তেমনি প্রেমে পড়লে তা থেকে বের হওয়াও সহজ নয়। নামিদামি রাজনীতিকের সফরসঙ্গী, মন্ত্রী-এমপি বা আমলাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলা, আর দশজন থেকে অন্য চোখে দেখা, আলাদা খাতির-যত্ন, বিনা বাধায় নানা জায়গায় প্রবেশের সুযোগ- নিজেকে কী আর ধরে রাখা যায়! পাশের মানুষটির চেয়ে একটু ‘বড়’ ভাবাই যায়।

সাংবাদিকের কাজ কী? কোন পথে সে চলবে? এমন প্রশ্ন করা হলে সবার জবাব হবে- সাংবাদিক হচ্ছে সমাজরক্ষক। সব অসঙ্গতি, ভুল-ভ্রান্তি প্রচার মাধ্যমে তুলে ধরে কর্তৃপক্ষের ‘চোখে আঙ্গুল দিয়ে’ দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তার। সত্যের সন্ধানে সে থাকবে নির্ভীক। সব সময় সে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অসহায়, অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কথাগুলো শুনতে ভালই লাগে। আজকাল অনেকেই চেনাজানা পথটি হারিয়ে ফেলেছে। মূল পথ থেকে অলিগলি করে করে কেউ কেউ এখন ‘নিষিদ্ধ গলিতে’ পথ মাড়াতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছে। সমাজ, দেশ নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অনেক লোক রয়েছে। এ নিয়ে সাংবাদিকরা মাথা না ঘামালে মহাভারত কি অশুদ্ধ হয়ে যাবে? তাই আজ সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ। পেশাদার সাংবাদিক আর অপেশাদার সাংবাদিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। একদল সত্যের পক্ষে, আরেকদল ‘যা খুশি তাই’ করার পক্ষে। একদল চাচ্ছেন- পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে, অন্যদলের ‘চিন্তাভাবনার সময়’ নেই। দিনদিন বিভক্তি বাড়ছে। লেজুড়বৃত্তি করতে না পারলে অনেকের ‘ঘুম’ হয় না।

সাংবাদিকদের প্রকারভেদ ঘটছে। তাদেরকে কখনো ‘সাংঘাতিক’; কখনো ‘হলুদ সাংবাদিক’, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড সাংবাদিক’ ‘চাঁদাবাজ সাংবাদিক’, ‘সন্ত্রাসী সাংবাদিক’; আবার কখনো ‘এমনি এমনি সাংবাদিক’, ‘কাঁচিওয়ালা সাংবাদিক’,‘ সিন্ডিকেট সাংবাদিক’, ‘ফ্লুইড মারা সাংবাদিক’, ‘বিজ্ঞাপন সাংবাদিক’, ‘রাজনৈতিক সাংবাদিক’ ‘গলাবাজ সাংবাদিক’ ‘ভাড়াটে সাংবাদিক’ ‘দালাল সাংবাদিক’ ‘ঠিকাদার সাংবাদিক’ প্রভৃতি নামে ডাকা হয়। বিভিন্ন বিশেষণে ভূষিত করা হলেও তারা ‘সাংবাদিক’- এটাই বড় কথা। এ নিয়ে কারো খারাপ লাগা বা মনে সামান্য দুঃখবোধও জাগে না।

আজকাল অনেক সংবাদপত্র মানুষের আস্থা হারিয়েছে। আসলে ওগুলোকে পত্রিকা বলা হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় ঐ সব ‘খবরের কাগজ’। যা এখন ‘হলুদপত্র’ নামে পরিচিত। ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ এসব পত্রিকার প্রচার নেই। মানুষের কাছে পৌছে না। অন্যদিকে, দুর্নীতির এক অন্ধজগতে বসবাস করছে সাংবাদিক ‘নামধারী’ কিছু লোক। তারা সাংবাদিকতার পরিচয় ভাঙ্গিয়ে ‘সমাজের বারোটা বাজিয়ে’ যাচ্ছে। এদেরকে বলা হয় ‘হলুদ সাংবাদিক’। এদের সংখ্যা বাড়ছেই।

আগে সাংবাদিকদের মানুষ শ্রদ্ধা করতো, ভালবাসতো, আপনজন হিসেবে জানতো। এখন তাদেরকে ‘ভয়’ পায়, না ঠেকলে কাছে আসতে চায় না। ‘চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তিনজন সাংবাদিক আটক’- এ ধরনের খবরও আজকাল ছাপা হচ্ছে। আগের দিনে শুধু দারোগারা ‘মফস্বল’ যেতেন। এখন সাংবাদিকরাও যান। কোন বিষয় ভালভাবে জানার জন্য, কোন জায়গায় যাওয়াটা দোষের নয়। কিন্তু তদন্তের নামে যখন তেল দেয়া ভাত, মুরগির রান, বড় মাছের পেটি, সাথে মিষ্টান্নের আয়োজন হয়; আবার যাবার বেলা নগদ টাকা, ক্ষেতের লাউ, কুমড়ো, বেগুন, কলা, কচু’র প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় এবং সাংবাদিক তা বগলে করে বাড়িতে নিয়েও আসেন, তখনই প্রশ্ন দেখা দেয়। এজন্যই হয়তো কেউ কেউ সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ এর বদলে ‘সাংঘাতিক’ সম্মোধন করে।

এমন অনেক সাংবাদিক আছেন- যাদের কাগজ-কলম কিনতে হয় না, বছরে একটি নিউজ লিখতেও হয় না। মিডিয়ার সঙ্গে কোন যোগাযোগের দরকার নেই। তবে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয়পত্র আছে, সাংবাদিক তালিকায় তাদের নাম আছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংবাদিক হিসেবে দাওয়াত করা হয়, আর কি চাই? এরা হচ্ছেন- এমনি এমনি সাংবাদিক।

কিছুকিছু পত্রিকা আছে যার সাংবাদিকদের লেখালেখির কোন কাজ নেই। একটি কাঁচি থাকলেই যথেষ্ট। পুরানো পত্রিকা থেকে দু-চারটি ‘সংবাদ’ (নিউজ ভ্যালু থাকার দরকার নেই) কাঁচি দিয়ে কেঁটে কম্পোজম্যান/কম্পিউটারম্যানের কাছে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত তার কর্ম। এ জন্য তাকে দিনে সর্বোচ্চ ঘন্টাখানেক সময় দিলেই চলে। তবুও সহকর্মীদের কাছে গিয়ে কপালের ঘাম মুছতে, মুছতে বলে- সারাদিন কি কষ্টটাই না করলাম, সম্পাদক বুঝলো না (অনেক পত্রিকায় সম্পাদক সাহেব নিজেও এ কাজটি করে থাকেন)। এদের নাম- কাঁচিওয়ালা সাংবাদিক।

কিছু সাংবাদিক আছেন- সারাদিন ঘুরে বেড়ান, নিউজের কাছেও যান না, বিকালে সহকর্মীদের কাছে এসে বলেন- কি আছে দেও! তারপর সেই বন্ধুর নিউজের কপি থেকে স্বাক্ষরের স্থানটি ফ্লুইড দিয়ে মুছে, সেখানে নিজের স্বাক্ষর দেয়া এবং পরে ফ্যাক্সে পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেয়া, এই তার সারা দিনের কাজ। এদেরকে বলা হয়- ফ্লুইড সাংবাদিক। যদিও আজকাল ফ্লুইডের ব্যবহার কমে গেছে। আবার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মতো সাংবাদিকদেরও সিন্ডিকেট আছে। সবার পক্ষ হয়ে একজন সাংবাদিক নিউজ লেখেন, ঐ নিউজের বেশ কয়েকটি কপি করা হয়, এরপর সে বিভিন্ন সাংবাদিকের ঠিকানায় ইমেইলে অথবা ফ্যাক্সযোগে তা পাঠিয়ে দেন। অন্য সাংবাদিকের খোঁজখবর নেয়ারও দরকার হয় না। শুধু মিডিয়ায় পাঠিয়ে দেয়াই তার কাজ। অনেক সময় তাও করতে হয় না। আগের ব্যক্তিই সব কাজ করে দেন। জোটবদ্ধ এই সাংবাদিকদের নাম দেয়া হয়েছে- সিন্ডিকেট সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন পত্রিকার প্রাণ। এ ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজ্ঞাপন আর সাংবাদিকতা যখন এক হয়ে যায় তখনই বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা থাকে। অনেক সাংবাদিক আছেন যাদের নিউজ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। সারাদিন সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপনী অফিসে ধর্ণা দেয়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পান-সিগারেট খাওয়ানো, মাঝে মাঝে ‘হলুদ খাম’ (সরাসরি দিলেও ক্ষতি নেই) ধরিয়ে দেয়া, বিজ্ঞাপনের কাগজটি নিয়ে এসে পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেয়া, ঠিকমতো পৌঁছল কিনা মোবাইলে তার সংবাদ নেয়া, পরে বিজ্ঞাপনের বিল আদায় করা এবং পার্সেন্টিজ নেয়া- এই তার কাজ। এ ধরনের সাংবাদিকরা একটি পত্রিকার সাংবাদিক নন। কারো কারো চার-পাঁচটি পত্রিকার পরিচয় পত্রও রয়েছে। কোনটা বাংলা দৈনিকের, কোনটা ইংরেজি দৈনিকের (‘ই’ না জানলেও ইংরেজি পত্রিকার সাংবাদিক), যখন যেটায় সুবিধা মেলে। এর নামও ‘সাংবাদিকতা’ এবং তাদেরকে বলা হয় বিজ্ঞাপন সাংবাদিক।

কেউ কেউ সাংবাদিকতায় নাম লিখিয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য। নামের আগে সাংবাদিক থাকলে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগটা সহজেই মিলে যায়। কোন কোন রাজনীতিক দলে নিজের প্রধান্য বজায় রাখার জন্য দলীয় পত্রিকা থেকে কার্ড সংগ্রহ করেন। দলের স্বার্থে নিজে নিউজ লেখেন, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং এক সময় সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন। সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে কেউ থানায়, ডিসি অফিস, এসপি অফিস, ইউএনও অফিস, ভূমি অফিস ও আদালত পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে রীতিমতো ‘দালালি’ করেন বলেও শোনা যায়।

রোগি দেখে ডাক্তার পয়সার বিনিময়ে ব্যবস্থাপত্র দেন, অর্থ নিয়ে আইনজীবীরা মক্কেলকে বুদ্ধি পরামর্শ দেন ও তার পক্ষে মামলা লড়েন। তা হলে সাংবাদিকরা আর বসে থাকবেন কেন? ঐ দুটি পেশা আর সাংবাদিকতা যে এক নয় তা অনেকে ভুলে যান। সমস্যায় পড়া সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের কাছে আজকাল ‘মক্কেল’ বলে গন্য হচ্ছে এবং ঐ সব সাংবাদিকরা ‘তা ধরার’ জন্যও ওৎ পেতে থাকেন। সাংবাদিকের কাছ থেকে শুধু বুদ্ধি নিতেও টাকা লাগে। নিজের নিউজ লেখার জন্য টাকা, পত্রিকায় ছাপানোর জন্য টাকা, অন্য পত্রিকায় সংবাদ উঠনোর জন্য টাকা, আরও কত কি!

সাংবাদিকরা দুর্নীতি বিরুদ্ধে কথা বলেন, পত্রিকায় রিপোর্টও পাঠান। কিন্তু নিজের দিকে তাকান না। নিজের স্বার্থে দুর্নীতিকে সহায়তা করেন, কোন কোন সময় অন্যকে পথ দেখিয়ে দেন। খুন-খারাবি, বড় ধরনের মারামারি, পারিবারিক সমস্যা, দুর্ণাম বিষয়ক ঘটনা হলে অনেক সাংবাদিকের পোয়াবারো। রিপোর্ট করা থেকে নিবৃত্ত করার জন্য নিলামের মতো দর ওঠে। বনিবনা হলে সব মাটি। আর টাকা দেয়া না হলে খেয়াল খুশি মতো নিউজ ছাপা হবে, প্রয়োজনে সিরিজ নিউজ, নিউজ আইটেম না হলেও নিউজ। টাকায় নাকি ভিটামিন আছে, তাই টাকা নিতে ঐ সাংবাদিকদের কোন লজ্জা নেই। আগে শোনা গেছে- বাদী-বিবাদী দু’ পক্ষ থেকেই দারোগারা টাকা খান, কোন কোন আইনজীবীরও এ ‘গুনটি’ আছে। এখন কোন কোন সাংবাদিকও বিষয়টি রপ্ত করে ফেলেছে।

আমাদের দেশে ‘ভাল’ সাংবাদিকের অভাব নেই। তারা সমাজের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেন, দেশের কথা ভাবেন, নিজের দায়বদ্ধতা, পেশার মান-সম্মান সব দিক তার নজরে থাকে। কিন্তু কে ভাল, কে মন্দ তা বিচার করার সময় সাধারণ মানুষতো পায় না। তারা সবাইকে এক পাল্লায় মাপেন। এ জন্যই আজকাল অনেকে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে চান না। অনেকটা গোপনে কাজ করতে চান।

সাংবাদিকতার মতো একটি মহান পেশার এই চিত্র কারো কাম্য হতে পারে না। সচেতন মহল অবশ্যই চান- এ পেশা থেকে সব ‘আবর্জনা’ দূর হোক, নতুন সমাজ গড়তে সাংবাদিকের কলম আরও শক্তিশালী হোক, পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি পাক, বন্ধু হিসেবে সব সময় সাংবাদিক থাকবে সাধারণ মানুষের পাশে, সে সোজা পথে চলবে, ওই সব ‘অলিগলিতে’ পা দেয়ার চিন্তাও তার মাথায় আসবে না। আসলে সাংবাদিকতার এ ‘খন্ডচিত্র’ স্থায়ী হতে পারে না। মেঘের পরেই সূর্য। সাংবাদিকতার সূর্যালোকে আলোকিত হোক এ দেশের প্রতিটি জনপদ।

(নিজে সাংবাদিক হয়ে এ ধরনের লেখা লিখতে চাইনি। তবুও লিখলাম… অনেক, অনেক কষ্ট…। সাংবাদিক সমাজের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী)

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী