সংবাদপত্রের দায় ও সাংবাদিকের স্বাধীনতা

বৃহস্পতিবার, ০৬/০৬/২০১৩ @ ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

জামাল উদ্দীন ::

jamal uddinসংবাদপত্র কেন প্রকাশিত হয়? সাংবাদিকতার দুই দশক পার করার পরও প্রশ্নটি প্রায়ই মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। যখন কেউ সাংবাদিকতা পেশায় নবিস আসেন, তার কাছে জানতে চাই কেন সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়। প্রশ্নটি শুনে দু-একজন উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেও যেন থেমে যান। আবার এমনও পেয়েছি যাদের কাছে উত্তরটি জানা নেই। কিংবা সাংবাদিকতার ছাত্র যে, তার কাছে এমন প্রশ্নটি অবান্তর মনে হতে পারে। তাহলে প্রশ্নটির উদ্ভব হলো কেন? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি। উত্তর মেলানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মেলে না। বরং আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। কেন সাংবাদিকতা পেশায় এলাম?

হয়তো এ দুটো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আরো কিছু প্রশ্ন এসে যাবে। কিন্তু কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। বাকস্বাধীনতা প্রসঙ্গ এলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে বড় করে ফুটে ওঠে। একটি জাতির অগ্রসর হওয়ার পেছনে, তার ভুলত্রুটি শুধরে দেয়ার জন্য এবং পরমতসহিষ্ণুতা অর্জনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে সংবাদপত্র। মুক্তবুদ্ধি চর্চারও অনন্য ক্ষেত্র সংবাদপত্র। সমাজকে কলুষমুক্ত করতে সংবাদপত্রের ভূমিকার কথা বলাই বাহুল্য। সে কারণেই বোধ করি সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পণ বলা হতো একসময়। এখন এমনটি বলতে কমই শুনি। বরং হামেশাই নানাভাবে রোষানলে পড়তে হয় সংবাদকর্মীদের। এখন সংবাদপত্র আর সংবাদকর্মী দুটোকে আলাদা করে দেখতে চান অনেকেই। কিন্তু দুটোকে আলাদা করে দেখতে দেখতে শেষেরটার স্বকীয়তা আর থাকছে না। সে কারণেই বলতে শুনি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নাকি সাংবাদিকের স্বাধীনতা। আমাদের দেশে কী এখন স্বাধীন সাংবাদিকতা আছে? এমন প্রশ্ন শুনতে হয়, বিভিন্ন মহল থেকে।

বিশেষত এমন সব মহল থেকে যখন কথাগুলো শুনি, বিরুদ্ধাচরণ বলব না; যাদের অপকর্ম সমাজকে জানানোই সাংবাদিকের কাজ, তারা যখন কথা বলে তখন মনে হয়_ হচ্ছে না, কিছুই হচ্ছে না। কোনো হতাশা নয়, বরং এটাই সত্য যে সাংবাদিকরা আর স্বাধীন নেই। তাহলে কি সংবাদপত্র স্বাধীন? সংবাদপত্র স্বাধীনতা ভোগ করছে এমন কথা না বললে অত্যুক্তি হবে। কারণ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানেই তো মালিকের স্বাধীনতা। মালিকের নীতি-আদর্শের (!) বাইরে গিয়ে সংবাদপত্র প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে মালিকের স্বাধীনতা থাকলেই কি সংবাদপত্র স্বাধীন, এ কথা বলা যাবে? মোটেই না। মালিকের আদর্শপুষ্ট কিংবা স্বার্থপ্রভাবিত সংবাদপত্র কখনো স্বাধীন সংবাদপত্র হতে পারে না। সেই সংবাদপত্র জনগণের মুখপত্র হতে পারে না। বড়জোর কোনো গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারে সহায়ক হতে পারে মাত্র।

তাহলে শুরুতে যে বললাম, দেশের অগ্রযাত্রার জন্য স্বাধীন সংবাদপত্র প্রয়োজন। এর সঙ্গে সাংবাদিকের স্বাধীনতাও জরুরি। একজন স্বাধীনচেতা সাংবাদিক, যিনি কোনো পক্ষভুক্ত নন; তার জন্য প্রয়োজন ও রকম একটি সংবাদপত্র, সেখানে পেশাদারিত্ব চলবে। মালিকের হস্তক্ষেপ নয়। আমাদের সমাজবাস্তবতায় এটা কি কল্পনাবিলাস? আজকাল সংবাদপত্রের মালিকরাই সম্পাদক হচ্ছেন। সারা জীবন পেশায় কাটিয়ে দিয়ে তিনি একজন পুঁজির মালিকের অধীনস্থ হয়ে গেলেন। হয়তো ওই পুঁজির মালিকের বিরুদ্ধেই সাংবাদিক হিসেবে সংগ্রাম করার কথা। এখন তা না করে ওই মালিকের স্বার্থ নিশ্চিত করতেই কাজ করতে হচ্ছে। তাহলে নতুন নতুন সংবাদপত্র বের হলে আমরা যে খুশি হই, বলি অন্তত কিছু লোক কাজ করে খেতে পারবে। কিন্তু তাতে কী স্বাধীন সাংবাদিকতা হবে? এভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে আসছে।

কেউ হয়তো বলবেন, সংবাদপত্র তো সমাজের বাইরের কিছু নয়। সমাজব্যবস্থার উন্নতি না ঘটলে, সামগ্রিকভাবে আমরা একটি নীতিবান গোষ্ঠীর সমাজ গড়তে না পারলে স্বাধীন সাংবাদিকতার আশা করা হবে দুরাশা মাত্র। কিন্তু সমাজ গড়বে কে? সমাজ পরিবর্তনের জন্যই তো সাংবাদিকতা কিংবা সংবাদপত্র। এখানেই আসে গণতন্ত্রের কথা। সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুক্তমতের চর্চা করা যায়। অন্য সময় তা সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক সরকারের সমালোচক-অভিভাবক হচ্ছে সংবাদপত্র। সমাজ ও জাতি গঠনে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে এর যাত্রাকালেও কম কথা হয়নি। ১৯২০ সালে আধুনিক সাংবাদিকতার উদ্ভবকাল থেকে সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। তবে গণতন্ত্র চর্চা ও এর উৎকর্ষ সাধনে সংবাদমাধ্যমের জরুরি ভূমিকার বিষয়টি সবিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে ‘ফোর্থ স্টেট’ আখ্যা দেয়া হয়েছিল কেন? ১৭৮৭ সালে ব্রিটিশ সংসদে দার্শনিক এডমুন্ড বার্ক এই আখ্যা দেন। তখন যুক্তরাজ্যে যাজক, জমিদার ও জনগণ_ এ তিন শ্রেণির সামাজিক মর্যাদার পরে চতুর্থ আসনে সংবাদমাধ্যমকে বসানো হয়। একে বাদ দিয়ে গণতন্ত্র পরিপূর্ণ হয় না বলেই এমন গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কালক্রমে দেশে দেশে সংবাদমাধ্যমের ওই স্বীকৃতি উচ্চারিত হয়েছে বড় করে। কিন্তু আসলেই কি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে গণমাধ্যমকে ওই ‘যাজক ও জমিদার’রা সমান মর্যাদা দিয়েছিল? বরং কখনো কখনো প্রতিপক্ষ ভেবে শায়েস্তা করার মানস তৈরি হয়েছিল তাদের মনে। জনগণের সঙ্গে ওই শ্রেণির সংযোগ সাধনের চেষ্টা করাই তো সাংবাদিকের কাজ।

কিন্তু হাল আমলে এমনটি হয়েছে যে ভালোটুকু করা যাবে। মন্দটুকু নিয়ে বেশি ‘বাড়াবাড়ি’ না করাই উত্তম। কথা হচ্ছে- সাংবাদিকরা কী আসলেই বাড়াবাড়ি করেন? তার কাজ তো বাড়াবাড়ি করা নয়। যা ঘটে তাই তুলে ধরা। যাজকদের সিদ্ধান্ত সাধারণের দুয়ারে পেঁৗছে দেয়া। তাদের কুকীর্তি থাকলে তা-ও। হয়তো সে কারণেই যত বিপত্তি। সে কারণেই কি তাহলে সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্তা হয়ে উঠছে এমন এক গোষ্ঠী, যারা অাঁতাত করে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে চায়। যাদের লক্ষ্যই হচ্ছে স্বার্থ রক্ষা করা। নিজের এবং নিজস্ব গোষ্ঠীর। সে অর্থে যদি প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি, তাহলে দেখি সংবাদপত্র প্রকাশের লক্ষ্যই হচ্ছে লাভবান হওয়া। আর্থিক লাভ, সামাজিক প্রভাব, সেও প্রকারান্তরে লাভ।

মুনাফার জন্য সংবাদপত্র কিংবা সাংবাদিকের সেবা (ব্যবহার) করা। যদিও অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমের মালিকই তার প্রতিষ্ঠানকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। যদি লোকসানই হয়, তাহলে এমন ব্যবসায় কেন করেন? এ প্রশ্ন সাধারনত উঠতেই পারে। সাধারণ বাণিজ্যের সংজ্ঞায় এর যোগফল মেলানো যায় না। আর এমনটিই যদি হয় মুখ্য,তাহলে দায়বদ্ধতার বিষয়টি আর থাকে না, থাকতে পারে না। সমাজের দর্পণ যদি সমাজ পরিবর্তন না করে কলুষই করল, তবে তারা দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিছক বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়।
‘ফ্রি প্রেস’-এর ধারণাটি তাই আজ অনালোচিত থেকে যাচ্ছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকের স্বাধীনতা কথাটির গূঢ়ার্থ আর কেউ ভাবছে না। অ্যালবার্ট কামুজ যথাযথই বলেছেন, “A free press can, of course, be good or bad, but, most certainly without freedom, the press will never be anything but bad.”

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক
সৌজন্যে- যায়যায়দিন।